জৈন্তাপুরে রবিশস্য ও ফলের মিশ্র বাগান গড়তে কাজ করছে কৃষি বিভাগ
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে শীত মৌসুমে রবিশস্য সবজি উৎপাদনে নির্দিষ্ট কিছু ফসলে নিয়মিত বাণিজ্যিক চাষে সফলতা অর্জিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে বরবটি,শিম,সরিষা,নাগামরিচে বাণিজ্যিক সফলতার পর এবার একই জমিতে রবিশস্য সবজি ও ফলের মিশ্র বাগান তৈরীর জন্য কাজ করছে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
সাধারণত আমন মৌসুমের শেষে পতিত জমিগুলোতে রবিশস্য সবজী চাষ করে আসছে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকেরা। এই রবিশস্যের পাশাপাশি একই জমিতে সাথি ফসল হিসেবে মিশ্র ফলের চাষ করতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে কাজ করে যাচ্ছে উপজেলা কৃষি অফিস।
আরও পড়ুন: সাতক্ষীরা আশাশুনি উপজেলায় ৯ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা
বিশেষ করে শীত মৌসুম শেষ হয়ে এলে সবজীর বাজারজাতকরণ শেষ হতে থাকে। এবার বিভিন্ন জাতের সবজীর পাশাপাশি সাথির ফসল হিসেবে তরমুজ, নাগামরিচ ও কুলবরইয়ের চাষ শুরু করেছে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকেরা।
সাধারণত শুকনো মৌসুমে সেচ সুবিধা রয়েছে এমন জমিতে মিশ্র ফল সবজীর চাষের জন্য বেশ উপযোগী। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে মাঠ পর্যায়ে উপ -সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের বিভিন্ন রকম পরামর্শ দিয়ে আসছেন।
আরও পড়ুন: ফুলকপির কেজি ২ টাকা, লোকসান গুনছেন কৃষক
এমনই এক সফল কৃষক উপজেলার ২ নং জৈন্তাপুর ইউনিয়নে বিরাখাই গ্রামের মোহাম্মদ আবদুল্লাহ্। তিনি জৈন্তাপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ নিয়ে ৩৫ বিঘা ধানি জমির একাংশে শুরু করেন রবিশস্য সবজী ও ফলের মিশ্র বাগান।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে তিনি ৬০ শতক জমিতে বলসুন্দরী জাতের বরই চাষ করেছেন। এর পাশাপাশি ২ বিঘা জমিতে ভুট্টা, ৬০ শতক জমিতে টমেটো, ৩৩ শতক জমিতে বেগুন, ৩০ শতক জমিতে কাঁচা মরিচ ও নাগা মরিচ ও ২ একর জমিতে করেছেন তরমুজের চাষ করেছেন।
জৈন্তাপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে ফল বাগান প্রদর্শনী প্রাপ্ত মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, চলতি মৌসুমে অন্যতম সাফল্য হলো বলসুন্দরী বরই চাষ। এ বছর তিনি ২০০ পিছ উন্নত জাতের বরই চারা উপজেলা কৃষি অফিস থেকে সংগ্রহ করে গত সেপ্টেম্বরে রোপন করেন। চার মাসের মধ্য ফলন শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে মাঠে ১৫০ টাকা কেজিদরে বরই বিক্রি শুরু করেছেন। প্রতিদিন গড়ে তিন কেজি বরই ছোট ছোট গাছ থেকে সংগ্রহ করে বিক্রি শুরু করেছেন। এতে তার উৎপাদন ব্যায় ১০ হাজার টাকা। দুই বছর পরে গাছের আকার বৃদ্ধি পেলে প্রতি মৌসুমে কয়েক লক্ষ টাকার বরই বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।
এদিকে একই জমিতে সাথি ফসল হিসেবে গেলো অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ৮০ হাজার টাকা খরচ করে ৬ বিঘা জমিতে আনারকলি জাতের তরমুজ চাষ করেছেন। আগামী ফেব্রুয়ারির শেষভাগে তিনি ৪/৫ লক্ষ টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পারবেন বলে আশাবাদব্যাক্ত করেছেন।
মিশ্র এই ফলের বাগানের পাশাপাশি দেড় বিঘা জমিতে সুপার সাইন আগাম জাতের ভূট্টা তিনি আবাদ করছেন। প্রদর্শনী পাওয়া এই বাগানে কৃষি অফিস থেকে বীজ,সার ও প্রয়োজনীয় কীটনাশক ফ্রীতে পেয়ে তার উৎপাদন ব্যয় মাত্র ৪০০০ হাজার টাকা। তিনি আশা করছেন এ থেকে ৫০-৬০ হাজার টাকার ভুট্টা তিনি বিক্রি করতে সক্ষম হবেন।
পাশাপাশি তাল ও পালকিন জাতের বেগুন ১ বিঘা জমিতে ও কাঁচা ও নাগামরিচ আরো এক বিঘা জমিতে চাষ করেছেন। এছাড়াও মৌসুমের শুরুতে ৪ বিঘা জমিতে মঙ্গলরাজা ও বাহুবলী জাতের টমেটো চাষ করেন তিনি। এতে তার উৎপাদন খরচ এক লাখ টাকার মত। তিনি আশা করছেন মৌসুমেের শেষে ভালো বাজারমূল্য থাকলে সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকার টমেটো বিক্রি করতে পারবেন।
এ বিষয়ে জৈন্তাপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ- সহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন জানান,মোহাম্মদ আবদুল্লার মত যাদের কৃষি জমির পরিমান বেশী তারা আমন চাষের পাশাপাশি রবি মৌসুমে সবজী ও ফলের মিশ্র বাগান করে লাভবান হতে পারবেন। এরই ধারাবাহিকতায় কৃষক আবদুল্লার আবাদি ৩৫ বিঘা ধানি জমির কিছু অংশে মিশ্র ফল ও সবজির বাগান করতে পরামর্শ দেয়া হয়। এতে করে ফল বাগান করতে বরই বীজ, সার ও কীটনাশক কৃষি অফিস থেকে দেয়া হয়। পাশাপাশি মাঠ তদারকির মাধ্যমে বরই চারা রোপন করে চার মাসের মধ্য ফলন শুরু হয়। তিনি বলেন সবজি ও মিশ্র ফলের বাগানে অতিরিক্ত পরিচর্যার প্রয়োজন পড়ে না। বিশেষ করে একই সেচ সুবিধা দিয়ে পুরো বাগানে পানি ও সার প্রয়োগের সুবিধা রয়েছে।
এ বিষয়ে জৈন্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ন দিলদার বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতায় ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার এন্ড ওয়ার্টার ম্যনেজম্যান্ট প্রকল্পের বাস্তবানে মিশ্র ফসল চাষিদের মধ্যে ফল বাগান প্রদর্শনী দেয়া হয়েছে। আধুনিক কৃষি নির্ভর ও স্বল্প উৎপাদন ব্যয় হওয়ায় সবজি মিশ্র ফলের বাগান করতে কৃষক পর্যায়ে উদ্বুদ্ধকরণে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। বিশেষ করে যাদের ধানি জমির পরিমান বেশী সে সমস্ত কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি পদ্ধতিতে চাষ বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিচ্ছে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।





