তীব্র গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ

রমরমা এসির বাজার

Shakil
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১:৫৬ অপরাহ্ন, ১৭ এপ্রিল ২০২৩ | আপডেট: ১:০৬ অপরাহ্ন, ১৭ এপ্রিল ২০২৩
ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকায় ৫৮ বছর পর তাপমাত্রার রেকর্ড গড়েছে। জনজীবন অতিষ্ঠ তীব্র গরমে। গড়ে তাপমাত্রা ঘুরপাক খাচ্ছে ৩৯-৪০ ডিগ্রির মধ্যে। গরম থেকে কিছুটা রক্ষা পেতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি)দোকানে ভিড় করছেন নগরবাসী। সাধ্যের মধ্যে এসি কিনতে ক্রেতারা ঘুরে বেড়াচ্ছেন একাধিক ইলেকট্রনিকসের শো-রুমগুলোতে। বিক্রেতারা বলছেন প্রতিবছর গরমে এসি বিক্রি বাড়ে তবে এটা এবার দ্বিগুণ হয়েছে।

মিরপুরে শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা ফাহমিদা আফরোজ বেশ কয়েকটি শো-রুম ঘুরে সেনপাড়ার একটি শো-রুম থেকে দেড় টনের একটা এসি কিনেছেন। প্রথমে এসি কিস্তিতে কিনবেন চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু ডাউন পেমেন্ট ও কিস্তিতে এসির মূল্য বেশি পড়বে ভেবে এককালীন টাকা পরিশোধে করে তিনি এসিটি ক্রয় করেছেন।

আরও পড়ুন: রোববার থেকে নতুন সূচিতে ব্যাংক লেনদেন, সময় কমল এক ঘণ্টা

তিনি বলেন, পাঁচতলা বাসার টপ ফ্লোরে বসবাস করি, বাচ্চারা এ গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। দিনের বেলা সূর্যের তাপে বাসায় থাকা যায় না এবং  রাতেও ঘুমাতে পারি না। কোনভাবেই গরম সহ্য করতে না পেরে দু’দিন বিভিন্ন কোম্পানির শো-রুম ঘুরে সূলভ মূল্যে একটি দেড় টন এসি কিনলাম। ভেবেছিলাম কিস্তিতে এসি ক্রয় করবো কিন্তু এতে করে আমাকে প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার বেশি গুণতে হবে তাই কষ্ট করে হলেও নগদেই কিনে নিলাম।

এদিকে গরমের কারণে এ বছর এসি বিক্রি দ্বিগুণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন শেওড়াপাড়ার ওয়ালটন প্লাজায় কর্মরত মো. আমিনুর রহমান। তিনি বলেন, প্রতিবছরই এ সময় এসি বিক্রি বেড়ে যায়, তবে কয়েকদিনের তীব্র গরমে প্রচুর এসি বিক্রি হচ্ছে। সারাদিনই আমরা এসি বিক্রিতে ব্যস্ত সময় পার করছি। তবে এসির দাম ক্রেতাদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে।

আরও পড়ুন: মালয়েশিয়া থেকে ৩৪ হাজার টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ

প্রতিনিয়ত যেভাবে গরম বাড়ছে তাতে ফ্যানের বাতাসে স্বাভাবিক থাকা সম্ভব হচ্ছে না। তাই কিস্তিতে আজই একটি এসি কিনবো বলে জানালেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, কিস্তি সুবিধা থাকায় আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এ গরমে এসি কিনতে সাহস করছেন। এছাড়া বিদ্যুৎ বিলের ভয়ে আগে কখনো এসি কিনতে সাহস করিনি। তবে কোম্পানিগুলো বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ইনভার্টার এসি বাজারে আনায় আমার মতো অনেকেই এসি কিনছেন।

তবে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেভাবে তাপমাত্রা বাড়ছে আগামীতে দেশে এসির চাহিদা কয়েকগুণ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন গত কয়েকদিনে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এসি বিক্রি। বিক্রি ভালো হওয়ায় বিক্রেতাদের মধ্যেও স্বস্তি ফিরেছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর এসির চাহিদা ২০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে এসি বিক্রির নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন।

এই শিল্পখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বাসাবাড়ির জন্য গত বছর ৪ লাখ এসি বিক্রি হয়েছিল।  এই বছর তা বেড়ে ৫ লাখে দাঁড়াবে।

আবাসিক ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রতি বছর গড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার এসি বিক্রি হয়।

মার্চ থেকে তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় এপ্রিল, মে এবং জুন মাস এসি বিক্রি হয় সবচেয়ে বেশি।  বছরের ৯০ শতাংশ বিক্রি হয় এই সময়ের মধ্যে।

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং কম বিদ্যুৎ খরচ হয় বলে বর্তমানে মোট বিক্রির ৬৫ শতাংশই ইনভার্টার এসি। মাত্র তিন বছর আগেও ঘটনা ঠিক উল্টো ছিল বলে জানান তিনি।

ইনভার্টারসহ এসির চাহিদার কারণে আগামী কয়েক বছরে বাজার থেকে নন ইনভার্টার এসিগুলো বিলুপ্ত হবে বলেও মনে করেন তিনি।

ট্রান্সকম ডিজিটালের হেড অব বিজনেস রিতেশ রঞ্জন বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মার্চের মাঝামাঝি থেকে এয়ার কন্ডিশনার বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসির চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এর বাজারও দ্রুত বাড়ছে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০২৩ সাল থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে এসির বাজার ২৫ শতাংশ কম্পাউন্ড অ্যানুয়াল গ্রোথ রেট (সিএজিআর) বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আমরা গত বছরের তুলনায় এ বছর ৩০ শতাংশ বেশি বিক্রির আশা করছি।

ওয়ালটন এয়ার কন্ডিশনারের সিইও তানভীর রহমান বলেন, তাপপ্রবাহ চলমান থাকায় এসির চাহিদা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেড়েছে। শনিবার ওয়ালটন একদিনে রেকর্ড সংখ্যক এয়ার কন্ডিশনার বিক্রি করেছে যা প্রমাণ করে যে বর্তমান পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টায় এসির চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে।

অন্যদিকে, চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এসি ক্রয় করেও ফিটিংস এ কিছুটা বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে গ্রাহকদের। চাহিদা বাড়ার কারণে এসি নির্ধারিত সময়ে ডেলিভারি দিতে পারছেন না শো-রুমগুলো। হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কিছুটা সমস্যা হচ্ছে বলে জানালেন মিরপুরের মনিপুরের বেগম রোকেয়া সরণীতে অবস্থিত গ্রীন এয়ার শো-রুমের এক সেলস কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আমাদের এখানে ২৫ জন ইলেকট্রিশিয়ান কাজ করছেন অর্ডার বেশি থাকায় কিছুটা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে, তারপরও নির্ধারিত সময়েই ডেলিভারির চেষ্টা করছি।

একটি এসি ফিটিংস করতে দুইজন লোক লাগে। সকাল থেকে শুরু করে সারাদিনে ৩ থেকে ৪টি এসি ফিটিংস করা যায়। ২৫ জন লোক কাজ করেও কুলাতে পারছে না। অথচ মাসখানেক আগেও কোনো কোনো দিন একটি ফিটিংসের কাজ হতো না বলে জানালেন একই প্রতিষ্ঠানের ইলেকট্রিশিয়ান (এসি মিস্ত্রী) মো. হৃদয়। তিনি বলেন, প্রায় ৮ বছর ধরে এ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছি, প্রতি বছর গরমে কাজ বেড়ে যায় কিন্তু এ বছর কাজের এতটাই চাপ যে দম ফেলার সময় পাচ্ছি না।