সিলিন্ডার আছে গ্যাস নাই!
- গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে ব্যবসায়ীদের ‘ইঁদুর-বিড়াল খেলা’
- এলপিজি আমদানি কমেছে দেড় লাখ টন, দ্বিগুণ দামেও সিলিন্ডার পাচ্ছেন না ভোক্তা
টানা দুই সপ্তাহ ধরে এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে দেশজুড়ে চলছে ভয়াবহ সংকট। অনেকেই বলছেন, সিলিন্ডার আছে,গ্যাস নেই। তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার যেন চোরাই পণ্য হয়ে গেছে। সংকটের দোহাই দিয়ে সিলিন্ডার ব্যবসায়ীদের মধ্যে চলছে ইঁদুর-বিড়াল খেলা। প্রকাশ্যে দোকানে দেখা না মিললেও মুঠোফোনে দাম ঠিক করে অজানা স্থান থেকে ঠিকই সিলিন্ডার হাজির করছেন ব্যবসায়ীরা। খুচরা দোকানী থেকে অনেকেই ১২ লিটারের ১২৫৩ টাকার গ্যাস ক্রয় করছেন ২৮০০ থেকে ৩২০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দাম দিয়ে।
এরআগে গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে সংকট তৈরি হয়। এর মধ্যেই বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়-বিক্রির ক্ষেত্রে কমিশন বৃদ্ধি, বিইআরসির একতরফা দাম ঘোষণা বন্ধ করাসহ ছয় দফা দাবিতে এলপিজি ব্যবসায়ীদের ডাকা ধর্মঘট। এমন প্রেক্ষাপটে জ্বালানী খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি’র সঙ্গে বৈঠকের পর ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছেন এলপিজি ব্যবসায়ীরা। তবে,এলপিজি সংকট ও দাম আগের তুলনায় বেড়েছে দুই থেকে তিন গুন বেশি। এ যেন লিসিণ্ডার গ্যাসে তুগলকি কাণ্ড চলছে। মাস শেষে বেতন সুবিধা নিচ্ছে, প্রশাসন ও লোক আছে, দেখার যেন কেউই নেই।
আরও পড়ুন: চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের রাজস্ব আয় ও উদ্বৃত্তে বড় প্রবৃদ্ধি
সরেজমিনে বাজারের খুচরা দোকানগুলোতে দেখা যায়, শুধু খালি সিলিন্ডার রয়েছে, বলা হচ্ছে গ্যাস নেই। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, গ্রাহকরা বারবার এসে বিরক্ত করছেন। তাই দোকান বন্ধ রাখা হচ্ছে। তবে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে একই সিলিন্ডার দ্বিগুণ দামে মিলছে। মুঠোফোনে একজন ব্যবসায়ী বলেন, আমার কাছে গ্যাস নেই, তবে দেখতে পারি। বেশি দরকার হলে দেয়া যাবে। দাম বেশি পড়বে। সকালে একটি সিলিন্ডার ২৮০০ টাকায় বিক্রি করেছি। বিকেলে একই সিলিন্ডার ৩২০০ টাকায় বিক্রি করেছি।
এদিকে বাজারে এক বা দুটি নয়, ভ্যান ভর্তি গ্যাস আসছে। তারপরও ব্যবসায়ীরা ইঁদুর-বিড়াল খেলায় মেতেছেন সরবরাহকারীর গোডাউনেও। টঙ্গির নতুন বাজারের একটি গোডাউনে দেখা গেছে ভর্তি সিলিন্ডার, বেচা-বিক্রি চলছে। তবে কৌশলে ভেতরে ঢুকলে দেখা মেলে গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডারের। এবার সংকট নয় ডেমারেজের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ানোর দাবি সরবরাহকারীর। তিনি জানান, একটা গাড়ি গেলে ১০-১২ দিন বসে থাকতে হয়। সম্প্রতি একটি গাড়ির জন্য প্রায় ৬০ হাজার টাকা ডেমারেজ দিতে হয়েছে। এভাবেই নিত্যপ্রয়োজনীয় সিলিন্ডার গ্যাস দেশে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বিক্রি করা হচ্ছে। গ্রাহকরা বলছেন, দোকানে গ্যাস নেই বললেও ফোন করলে ২৫০০০, ২৮০০ বা ৩২০০ টাকায় গ্যাস পাওয়া যায়। মূলত দোকান ভর্তি খালি সিলিন্ডার, কিন্তু বেশি টাকা দিলে ঠিক দোকানের সামনে থেকেই গ্যাস মেলে।
আরও পড়ুন: ইতিহাসে সর্বোচ্চ, দেশের বাজারে সোনার দাম বাড়াল বাজুস
সরেজমিনে দেখা গেছে, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার গ্যাস নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করলে খুচরা ব্যবসায়ীর লাভ হয় মাত্র ৫০ টাকা। প্রতিদিন ২০০ সিলিন্ডার বিক্রি করলে লাভ হয় ১০ হাজার টাকা। কিন্তু সংকট ধরে বিক্রি করলে প্রতিটি সিলিন্ডারে এখন ১৫০০ থেকে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হচ্ছে। এতে লাভ দাঁড়ায় দুই থেকে তিন লাখ টাকা। সারাদেশের ৪ কোটি গ্রাহকের ওপর হিসাব করলে সিন্ডিকেটের লাভ প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। তবে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের তথ্যমতে,এটি একটি বড় সিন্ডিকেটের কাজ। ঢাকা বিভাগের উপ-পরিচালক বিকাশ চন্দ্র দাস জানান, কিছু অসৎ ব্যবসায়ী মজুত গড়ে তুলেছে। যারা বেশি টাকা দিচ্ছে, তারাই গ্যাস পাচ্ছে।
এলপিজি আমদানি নিয়ে পিআইডির তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে ১ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি গ্যাস আমদানি করা হয়েছিল। তখন কোনো সংকট দেখা যায়নি। কিন্তু পরের মাসে আরও ২২ হাজার মেট্রিক টন বেশি আমদানি হলেও কৃত্রিম সংকট শুরু হয়।
আমদানি কমেছে দেড় লাখ টন, দ্বিগুণ দামেও মিলছে না গ্যাস: দেশে প্রতিবছর ১০ শতাংশের বেশি হারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) চাহিদা বাড়ে। তাই বাজারে সরবরাহ বাড়াতে হয়। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে আমদানি বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ ৩৬ হাজার টন। আর আগের বছরের তুলনায় গত বছর আমদানি কমেছে প্রায় দেড় লাখ টন। বছরের শেষ তিন মাসে আমদানি কমার হার ছিল বেশি। এতে এলপিজির বাজারে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। গত তিন বছরে দেশে এলপিজি আমদানির এমন চিত্র দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সংস্থাটির দায়িত্বশীল সূত্রমতে, ২০২৩ সালে এলপিজি আমদানি হয় ১২ লাখ ৭৫ হাজার টন। ২০২৪ সালে আসে ১৬ লাখ ১০ হাজার টন। আর গত বছর আসে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টন। আমদানি বাড়ার কথা থাকলেও উল্টো ১০ শতাংশ কমেছে। এতে বছর শেষে যেটুকু মজুত থাকার কথা, তা–ও বাজারে বিক্রি করা হয়ে গেছে। এরপরও বাজারের চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। দ্বিগুণ দামেও সিলিন্ডার পাচ্ছেন না ভোক্তা।
এ বিষয়ে বিইআরসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, এলপিজির এ সংকট আরও আগেই বুঝতে পারার কথা ছিল। প্রতি মাসে আমদানি কমার এসব তথ্য সরকারের কাছে আছে। তাই যারা নিয়মিত আমদানি করে, তাদের আমদানি বাড়ানোর অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল। যথাসময়ে অনুমতি দিলে বর্তমানের এ সংকট তৈরি হতো না।
২০২৪ সালে আসে ১৬ লাখ ১০ হাজার টন। আর গত বছর আসে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টন। আমদানি বাড়ার কথা থাকলেও উল্টো ১০ শতাংশ কমেছে। এতে বছর শেষে যেটুকু মজুত থাকার কথা, তা–ও বাজারে বিক্রি করা হয়ে গেছে। এরপরও বাজারের চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। দ্বিগুণ দামেও সিলিন্ডার পাচ্ছেন না ভোক্তা। তবে চলমান এলপিজিপর সংকটের জন্য সরকারকে দায়ী করেন এলপিজি অপারেটর অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক।
সরেজমিন রাজধানীর উত্তরা এলাকায় খালি সিলিন্ডার নিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরতে দেখা যায় ব্যবসায়ী মাসুদুল হাসানকে। বাসার গলিতে কিংবা আশপাশের এলাকায় অন্তত পাঁচজন খুচরা ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করতে পারেননি তিনি। তিনি বলেন, গত সপ্তাহে গ্যাস কিনেছি আড়াই হাজার টাকায়, এখন তো টাকা দিয়েও গ্যাস পাচ্ছি না। এদিকে কোথাও সিলিন্ডার নাই। একই অবস্থা ওই এলাকার আরেক বাসিন্দা রিয়া আক্তারের। আট জনের পরিবারে রান্নার জন্য এলপিজি সিলিন্ডারই বড় ভরসা তার। তবে তার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, গ্যাসের সংকট থাকায় বাচ্চাদের খাবার আগে তৈরি করছেন তিনি। রিয়া আক্তার জানান, গেল সপ্তাহজুড়েই গ্যাসের তীব্র সংকট থাকায় ভোগান্তিতে দিন কাটছে। ফ্লাট বাসায় লাইন গ্যাস নাই, সিলিন্ডার গ্যাসই ভরসা। সিলিন্ডারে গ্যাস প্রায় শেষ তাই বাচ্চাদের খাবার আগে তৈরি করছি, কখন শেষ হয়ে যায়। সিলিন্ডার গ্যাসের সংকট প্রভাব ফেলেছে অলিগলির রেস্তোরা কিংবা চায়ের দোকানেও। গ্যাস না থাকায় শনিবার সকাল থেকে রেস্তোরা বন্ধ রেখেছেন রামপুরা ডিআইটি রোডের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হাবিব। তিনি বলেন, এক সপ্তাহ জুড়েই গ্যাস নিয়ে সংকটে আছেন তিনি। সিলিন্ডারের আকার ভেদে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকার পর্যন্ত সিলিন্ডার কিনেছন তিনি। ৬ দিন আগে ছোট সিলিন্ডার কিনছি ২ হাজার ৫ শত টাকায়। আজকে আর ফোনই রিসিভ করে না। তবে রাজধানীর ডেমরা-কদমতলী,শ্যামপুর,যাত্রাবাড়ি, ওয়ারী,মতিঝিল, পল্টন, রামপুরা, মগবাজার, কুড়িলসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় সরেজমিন দেখা গেছে, সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বেশিরভাগ দোকানই বন্ধ রয়েছে। রামপুরা এলাকায় মেসার্স রোজি এন্টার প্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার জানান, কোম্পানি থেকে সাপ্লাই নাই তাই আমরা গ্যাস দিতে পারছি না, এর বাইরে আমার কিছু জানা নাই। একইকথা বলছেন যাত্রাবাড়ির আরেক ব্যবসায়ী জাফর মাষ্টার।





