কেন্দ্রীয় সংসদে প্রায় ৬৫ ও হল সংসদে প্রায় ৭৭ শতাংশ ভোট পড়েছে
জকসু নির্বাচনে প্যানেলগুলোর পালটাপালটি অভিযোগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলাকালে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তি সমর্থিত প্যানেলগুলোর মধ্যে পালটাপালটি অভিযোগ উঠেছে। গতকাল মঙ্গলবার ভোট চলাকালীন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সংবাদ সম্মেলন করে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট প্যানেলের প্রার্থীরা। এরইমধ্যে চলছে ভোট গননা। এদিন বিকেল ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ৩৯টি কেন্দ্রে ১৭৮টি বুথের সব কেন্দ্রের ভোট শেষ হওয়া ব্যালট বক্স আনা হয়েছে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে। ভোট গণনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানের এলইডি স্ক্রিনে সরাসরি দেখানো হচ্ছে। ওএমআর মেশিনে ভোট গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করার কথা রয়েছে। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ভোট গননা চলছে।
ভোট গণনার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা এখনই ভোট গণনার কাজ শুরু করব। প্রথমে ব্যালট পেপার ম্যানুয়ালি স্ক্রিনিং করে দেখা হবে। ব্যালটে ক্রস চিহ্ন ছাড়া অন্যচিচহ্ন আছে কিনা। ক্রস ছাড়া অন্য কোনো চিহ্ন কোনো প্রার্থী নামের পাশে থাকলে ওই পদের ভোটটি বাতিল হবে। এর আগে সকাল ৯টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সংসদে প্রায় ৬৫ শতাংশ এবং হল সংসদে প্রায় ৭৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. জুলফিকার মাহমুদ।
আরও পড়ুন: সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ উদযাপনের নতুন নির্দেশনা
ভোটগ্রহণ অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল) সদস্যরা। মঙ্গলবার ভোটগ্রহণ শেষে সংবাদ সম্মেলনে ইউটিএল-এর কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘সকালে ভোটার উপস্থিতি কম ছিল, তবে দুপুরের পর ভোট কেন্দ্রে দীর্ঘ লাইন গড়ে ওঠে। দায়িত্বপ্রাপ্তরা লাইনের শেষ হওয়া পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চালিয়ে যান। আমরা প্রত্যেক কেন্দ্রে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছি। তিনি আরও জানান, শিক্ষকরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। রিটার্নিং ও প্রিজাইডিং কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন সুন্দরভাবে সম্পন্ন করেছেন। কিছু ব্যতিক্রম যেমন প্রোক্টোরিয়াল বডির একজন সদস্যের হুমকি, বা অনেকে অনধিকৃতভাবে প্রবেশ সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের বাইরে হয়েছে। ড. বিল্লাল হোসেন উল্লেখ করেন, সকালের অভিযোগগুলো আমরা নির্বাচন কমিশনারকে জানিয়েছিলাম, তারা তা দ্রুত সমাধান করেছেন। এজন্য কমিশনারকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি শেষ করে বলেন, যারা এ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেছেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে ছিল উৎসবমুখর। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়। শিক্ষার্থীরা জানান, জীবনের প্রথম জকসু নির্বাচনে ভোট দিতে পেরে মহাখুশি তারা। প্রথমবারের নির্বাচন নিয়ে আগে কিছুটা সংশয় থাকলেও সব মিলিয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন শেষ হয়েছে। কথা হয় সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী মায়িশা ফাহমিদা ইসলাম এর সঙ্গে। তিনি বলেন, ভোট দিতে পেরে অনেক ভালো লাগছে। এত এত মানুষের ভিড়ে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যা সত্যিই চমৎকার। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রিফাত বলেন, ভোট সুষ্ঠুভাবে দিতে পেরেছি আলহামদুলিল্লাহ। জীবনের প্রথম ভোটের অনুভূতি অন্য রকম ছিল। আশা রাখছি যে নির্বাচিত হবে সে আমাদের হয়ে কাজ করবে।
আরও পড়ুন: পাঁচটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনেই শীর্ষ পদে শিবির প্রার্থীদের জয়ের কারণ কী?
বিশ্ববিদ্যালয়ের রফিক ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’-এর ভিপি প্রার্থী এ কে এম রাকিব অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনের সময় আমরা দেখতে পাই, একটি নির্দিষ্ট প্যানেলের কয়েকজন ব্যালট নম্বরের টোকেন নিয়ে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করেছে। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। তবে শুরুতে কমিশনের পক্ষ থেকে বিষয়টি অস্বীকার করা হয়।
শিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীদের ওপর ছাত্রদলের সদস্যরা হামলার চেষ্টা করেছেন— এমন অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছে শিবির সমর্থিত প্যানেল। শিবির সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ইংরেজি বিভাগে ছাত্রদল তাদের প্যানেলের পরিচিতি দিচ্ছিল, যা আচরণবিধির লঙ্ঘন। বিষয়টি জানালে তারা আমাদের প্রার্থীদের মারার জন্য চড়াও হয়। দর্শন বিভাগে আমাদের এজেন্টের সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটেছে। তিনি অভিযোগ করেন,প্রথম থেকেই প্রধান ফটকে ধাক্কাধাক্কি হয়েছে। আমাদের স্লিপ বিতরণকারী কর্মীদের হেনস্তা করা হয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদেরও হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে নারী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শিবিরের স্লিপ কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কিত।
নির্বাচনে প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছেন ছাত্রশক্তি সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ জবিয়ান’ প্যানেলের জিএস প্রার্থী ফয়সাল মুরাদ। তিনি বলেন, আমরা কালো টাকা ও পেশিশক্তির বিরুদ্ধে কথা বলেছি। আজ তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। প্রশাসনের জামায়াতপন্থি একটি অংশ শিবিরকে এবং বিএনপিপন্থি অংশ ছাত্রদলকে সহায়তা করছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, নির্বাচনে যে কালি ব্যবহার করা হচ্ছে তা ছড়িয়ে পড়ছে। ভোট শেষে হলেও অনেক ভোটার ক্যাম্পাসে অবস্থান করছে। কঠোর নিরাপত্তার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। ছাত্রঅধিকার ও ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের অনেকেই ক্যাম্পাসের ভেতরে প্রবেশ করছে।
নির্বাচন কমিশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন,পোলিং এজেন্ট পরিবর্তন ইস্যুতে আমাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করা হয়নি। কোনো এজেন্ট কার্ড দেওয়া হয়নি। তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও দুই ঘণ্টা পর আমাদের পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের জকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১৬ হাজার ৪৪৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ৮ হাজার ৪৭৯ জন এবং পুরুষ ভোটার ৮ হাজার ১৭০ জন। কেন্দ্রীয় সংসদ ও হল সংসদ মিলিয়ে মোট প্রার্থী রয়েছেন ১৯০ জন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জকসুর বিভিন্ন পদে মোট ৫৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র সম্পাদক পদে ৪ জন, শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে ৯ জন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে ৫ জন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে ৫ জন, আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক পদে ৪ জন, আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে ৮ জন, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক পদে ৭ জন, ক্রীড়া সম্পাদক পদে ৭ জন, পরিবহন সম্পাদক পদে ৪ জন, সমাজসেবা ও শিক্ষার্থী কল্যাণ সম্পাদক পদে ১০ জন, পাঠাগার ও সেমিনার সম্পাদক পদে ৭ জন এবং ৭টি সদস্য পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন প্রার্থীরা। অন্যদিকে ছাত্রী হল সংসদের ১৩টি পদের বিপরীতে মোট ৮ জন সদস্য পদের প্রার্থীসহ বিভিন্ন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন প্রার্থীরা। এর মধ্যে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে ৩ জন, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ৩ জন, সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে ২ জন, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে ২ জন, সংস্কৃতি সম্পাদক পদে ৪ জন, পাঠাগার সম্পাদক পদে ২ জন, ক্রীড়া সম্পাদক পদে ২ জন, সমাজসেবা ও শিক্ষার্থী কল্যাণ সম্পাদক পদে ৩ জন এবং স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে ৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচন শেষে ভোটকেন্দ্রগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।





