ঈদের আগেই নারী আসন ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন?
রোজার মধ্যভাগেই জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত ৫০ নারী আসনে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একইসঙ্গে প্রয়োজন হলে ঈদুল ফিতরের আগেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যেও সার্বিক প্রস্তুতি গুছিয়ে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।
তিনি বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, “ঈদের আগেই নারী আসনের নির্বাচন শেষ করার পরিকল্পনা করছি। প্রয়োজন হলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও একই সময়সীমার মধ্যে আয়োজনের সক্ষমতা আমাদের আছে।”
আরও পড়ুন: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন: কোন দল কত শতাংশ ভোট পেল?
তবে দুই বা তিনটি আসনের সম্ভাব্য উপনির্বাচনে প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালটে ভোটাধিকার দেওয়া হবে কি না—এই প্রশ্নে কিছু আইনি ও কারিগরি জটিলতা থাকায় তফসিল ঘোষণা বিলম্বিত হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। অন্যদিকে দেশের সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলো ঈদের পর, এমনকি বৈশাখ মাস শেষ হওয়ার পর আয়োজনের দিকে ঝুঁকছে কমিশন।
নারী আসনে কে কত পাচ্ছে
আরও পড়ুন: আদালতের নির্দেশ পেলে ভোট পুনর্গণনা বিবেচনা করবে ইসি
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনের হিসাব ইতোমধ্যে চূড়ান্ত পর্যায়ে। আইন অনুযায়ী, সংসদে কোনো দলের প্রাপ্ত সাধারণ আসনের অনুপাতে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন করা হয়।
সেই হিসেবে—
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পাচ্ছে ৩৫টি (ভগ্নাংশসহ ৩৪.৬৬, পূর্ণসংখ্যায় ৩৫)।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পাচ্ছে ১১টি (১১.৩৩, পূর্ণসংখ্যায় ১১)।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পাচ্ছে ১টি।
স্বতন্ত্রদের ভাগে যাচ্ছে ১টি আসন।
ছোট দলগুলো পৃথকভাবে প্রয়োজনীয় অনুপাত অর্জন করতে না পারলেও জোট গঠন করলে একটি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে বড় দলের হিসাবেও সামান্য হেরফের হতে পারে—এমনকি বিএনপির আসন ৩৬-এ উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
হিসাবের সূত্র:
সাধারণত কোনো দল সংসদে যতটি সাধারণ আসন পায়, সেই সংখ্যা ৫০ দিয়ে গুণ করে ৩০০ দিয়ে ভাগ করলে প্রাপ্ত ফলই সংশ্লিষ্ট দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা নির্ধারণ করে। তবে ভগ্নাংশ ও জোটগত সমীকরণের কারণে চূড়ান্ত সংখ্যায় সামান্য পরিবর্তন হতে পারে।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের সম্ভাবনা:
সংরক্ষিত নারী আসনে সাধারণত দলগুলো তাদের প্রাপ্য আসনের সমসংখ্যক প্রার্থী মনোনয়ন দেয়। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষে যদি প্রতিটি আসনে একক প্রার্থী থাকেন, তাহলে ভোটগ্রহণ ছাড়াই তাঁদের নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। ফলে বাস্তবে ভোটের প্রয়োজন নাও হতে পারে—যদিও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
উপনির্বাচন ও জটিলতা:
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, কোনো সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণার ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়। ত্রয়োদশ সংসদে শেরপুর-৩ আসনে বৈধ প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে নতুন তফসিল হবে। এছাড়া বগুড়ার একটি আসনেও উপনির্বাচন অনিবার্য হয়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারি ২৯৯ আসনে ভোট হলেও আদালতের আদেশে চট্টগ্রাম-২ ও ৪ আসনের ফলাফল স্থগিত রয়েছে। ফলে ২৯৭ আসনের ফল প্রকাশ করেছে ইসি। ইতোমধ্যে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান একটি আসন ছেড়ে দেওয়ায় সংসদে দলটির প্রতিনিধিত্ব সংখ্যায় সামান্য পরিবর্তন এসেছে।
সংস্কার কমিশনের সুপারিশে বড় পরিবর্তনের আভাস
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন চালুর সুপারিশ করেছে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী—
সংসদের মোট আসন ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ৪০০ করা,
নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করা,
এবং এসব আসনে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে সরাসরি নির্বাচন চালু করা।
এছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন রেখে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে ভোটের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে চলতি সংসদ অধিবেশনে এই সুপারিশ পাস হবে কি না—তা এখনো অনিশ্চিত।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও ঈদের আগে?
ইসি সূত্র বলছে, প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতিও সমান্তরালে চলছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, কমিশন ‘সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন’ রেখেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কমিশনার।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ফলাফলে ক্ষমতার ভারসাম্য এককভাবে বড় দলের পক্ষে গেলেও সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনে জোট ও ভগ্নাংশের হিসাব নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নারী প্রতিনিধিত্বের সংখ্যা ও কাঠামো নিয়ে সংস্কার কমিশনের সুপারিশ সামনে এলে সংসদে নতুন বিতর্কের জন্ম নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রোজার মধ্যভাগে নারী আসনের নির্বাচন এবং ঈদের আগেই সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচন—এই দুই ইস্যু মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন এখন নতুন এক ব্যস্ত সময়ের অপেক্ষায়। নির্বাচন কমিশনের তৎপরতা ও দলগুলোর কৌশলই নির্ধারণ করবে—ঈদের আগে কতগুলো বড় সিদ্ধান্তের সাক্ষী হবে দেশ।





