ঘরে ঘরে সর্দি-কাশি জ্বর উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা
ঋতু পরিবর্তন কিংবা আবহাওয়ার বড় কোনো পরিবর্তন ছাড়াই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় হঠাৎ বেড়েছে সর্দি, কাশি ও জ্বরের প্রকোপ। শিশু থেকে বৃদ্ধ, এমনকি গর্ভবতী নারীও আক্রান্ত হচ্ছেন এ ধরনের উপসর্গে। অনেকের ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত জ্বর-সর্দি-কাশির তীব্রতা থাকছে, জ্বর কমে গেলেও থেকে যাচ্ছে শুকনো কাশি ও দুর্বলতা। একসঙ্গে পরিবারের একাধিক সদস্য আক্রান্ত হওয়ায় বাড়ছে উদ্বেগ। এদিকে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও চি-কিৎসাকেন্দ্রগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ।
ডাক্তাররা বলছেন, শরীরকে সুস্থ করতে পর্যাপ্ত ঘুমানো ও বিশ্রাম নেওয়া খুব জরুরি। একইসঙ্গে রোগীদের তরল খাবার হিসেবে কুসুম গরম পানি, লেবু-মধু মি-শ্রিত চা বা স্যুপ বেশি করে খাওয়াতে হবে। তবে হাসপাতালগুলোতে আগত অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নার্স ও চিকিৎসকরা। রোগীর স্বজনদের চোখে-মুখে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ছাপ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, জ্বর-সর্দি-কাশির তীব্রতা থাকছে ৩ থেকে ৭ দিন। জ্বর সেরে গেলেও শুকনো কাশি, দুর্বলতা ভোগাচ্ছে অনেককে। অন্যান্য ইনফ্লুয়েঞ্জার মতোই এ ক্ষেত্রেও একসঙ্গে পরিবারের একাধিক সদস্য জ্বর-সর্দি-কাশিতে ভুগছেন। অনেকের গলাব্যথাও হচ্ছে।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের একগুচ্ছ কর্মসূচি
এক্ষেত্রে বিচলিত হওয়া যাবে না। জ্বর কিংবা ঠান্ডা, গলা খুসখুস মানেই করোনা নয়। জ্বর হলেই আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। দেশে দিন-রাতের তাপমাত্রা বাড়ছে-কমছে। এই রোদ এই বৃষ্টি। এই গরম, এই ঠান্ডা। খেয়ালি এই আবহ-াওয়ার সঙ্গে বাড়ছে সর্দি-কাশি-জ্বরের মতো মৌসুমি রোগ। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহর ও গ্রামে চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোয়ও প্রতিদিন বাড়ছে জ্বর, সর্দি, কাশি, শরীর ব্যথা নিয়ে আসা রোগীর ভিড়। কেউ আবার বাসায় বসে ঘরোয়া চিকিৎসা নিচ্ছেন। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে এ উপসর্গগুলো ব্যাপক হারে দেখা দিচ্ছে। শুধু শিশু নয়, গর্ভবতী মা'সহ সব বয়সিই এতে কাবু হচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীসহ সারা দেশের হাস-পাতালের আউটডোরে বেশির ভাগ শিশুই জ্বর-সর্দি-কাশি নিয়ে আসছে। হাঁচি-কাশির সঙ্গে শরীরে তীব্র ব্যথাও হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কিছু মানুষের করোনা ও ডেঙ্গু ধরা পড়লেও অধিকাংশই ভাইরাল ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসিন্দা আফরোজা বেগম। আড়াই বছরের শিশুসন্তান আয়ানের জ্বর ছিলো টানা পাঁচ দিন। সঙ্গে সর্দি-কাশিও ছিলো। হঠাৎ করেই জ্বর ১০২ ডিগ্রি হয়ে যেত। সাপোজিটরি দিয়েও কমানো সম্ভব হতো না। কিছু খেতে পারতো না। বমিও করতো। এই পাঁচ দিনে ওর ওজন কমেছে এক কেজিরও বেশি। তিনি বলেন, চিকিৎসকের কাছে নেয়ার পর করোনা টেস্ট দেয়া হয়। পরীক্ষা করানোর পর নেগেটিভ আসে। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল, এজিথ্রোমাইসিন ও লেভোসালমিটামল জাতীয় ওষুধ খাওয়ানোর পাশাপাশি নাকে নরসল ড্রপ দিতে হয়েছে। নেবুলাইজেশনও করতে হয়েছে। এখন জ্বর না থাকলেও কাশি রয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: লাগাম টানা যাচ্ছে না হামের, মৃত্যু হাজার ছাড়ালো
আফরোজ জানান, তার ছেলের পর তার মেয়ে ও হাজবেন্ডও সর্দি-কাশি-জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। জ্বর ১০০ এর নিচে নামছে না কারো। কাশিও রয়েছে। চিকিৎসক জানিয়েছেন পাঁচ দিন পর কমবে। শুধু আফরোজাই নয়, তার মতো রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের ঘরে ঘরে সর্দি-কাশি-জ্বরের প্রকোপ চলছে। ঘরে-বাইরে অনেকেই খুকখুক করে কাশছে।
কেউবা নাক টানছে। চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে জ্বর-সর্দি-কাশি, গায়ে-হাতে ব্যথা নিয়ে রোগীরা আসছেন। দুই বছরের শিশু তাবাচ্ছুম ইসলামের চার দিন ধরে প্রচণ্ড জ্বর। কোনোভাবেই জ্বর কমছে না, সঙ্গে আছে সর্দি-কাশি। উপায়ন্তর না দেখে শেষমেশ গত শনিবার রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়।
তাবাচ্ছুম ইসলামের মা সাজেদা বেগম বলেন, গত রাত থেকে জ্বর ও কাশির তীব্রতা এতটাই বেড়েছিল যে, বাসার সবাই ভয় পেয়ে গেছি। ওষুধ খাওয়ানোর পরও কমছিল না। তাই কোনোরকমে টেনশনে রাত পার করে ভোরেই হাসপাতালে নিয়ে এসে ভর্তি করি।
তিনি বলেন, বাসায় আমার বড় ছেলেরও সর্দি-জ্বর এবং কাশি চার-পাঁচ দিন ধরে। কিন্তু এখন একটু ভালো। বাসায় রেখেই ওষুধ খাওয়াচ্ছি। আমারও জ্বরের সঙ্গে এক ধরনের বিরক্তিকর শুকনা কাশি রয়েছে। আমার গোড়ান এলাকার বাসার আশপাশের অনেক ফ্যামিলির মধ্যেই একই অবস্থা। সবারই সর্দি-জ্বর এবং কাশি। মনে হয় অসুখের মৌসুম চলছে। দেশে কয়েক দিন ধরে মানুষের মধ্যে হাঁচি, কাশি ও সর্দি-জ্বরের মতো উপসর্গ বেশি দেখা যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বারে আসা রোগীদের বেশিরভাগই সর্দি, কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত। পাশাপাশি করোনার সংক্রমণের হারও বেড়েছে। হাসপাতালের বহির্বিভাগে সর্দি-জ্বরের কারণে চার বছরের শিশু আবদুল্লাহকে নিয়ে এসেছেন তার বাবা আজিজুল।
তিনি জানান, তার স্ত্রীসহ পরিবারের চারজন সর্দি-জ্বরের সঙ্গে শরীরে প্রচণ্ড ব্যথায় ভুগছেন। বিশেষ করে কাশি ভোগাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। সর্দি ও জ্বর সেরে যাওয়ার পর শরীর ভীষণ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। ঠিকমতো খেতে পারছেন না তারা। তবে রোগীদের স্বজনরা বলছেন, একসঙ্গে পরিবারের একাধিক সদস্য জ্বর-সর্দি-কাশিতে ভুগছে। তিন থেকে সাত দিন জ্বর-সর্দি-কাশির তীব্রতা থাকছে। জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে শিশু ও বয়স্কের সংখ্যা বেশি। আক্রান্তরা প্রথমে এলাকার ফার্মেসিগুলো থেকে ওষুধ কিনে সেবন করলেও অনেকেই তাতে সুস্থ হচ্ছে না। ফলে এসব রোগী ছুটছে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের চেম্বারে। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগীর ভিড় বেড়েছে কয়েকগুণ। চিকিৎসকদের রুম থেকে শুরু করে কোথাও পা ফেলার জায়গায় নেই। অনেক শিশু রোগীর ঠাঁই হয়েছে হাসপাতালের মেঝেতেই। অনেকে আবার ভেতরে জায়গা না পেয়ে পাশের বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নার্স ও চিকিৎসকরাও। রোগীর স্বজনদের চোখে-মুখে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার ছাপ।
ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মোঃ জিয়াউল ইসলাম বলেছেন, এখন শিশুদের মধ্যেও জ্বর, সর্দি-কাশির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সাধারণ জ্বর এবং ডেঙ্গুজ্বর দুটিই শিশুদের জন্য খারাপ। যেহেতু তিনদিনের মধ্যে ডেঙ্গু শনাক্ত করা যায়। তাই শিশুদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষাটা করালেই হয়। ডেঙ্গু না হলে দুশ্চিন্তার কারণ নেই। এখন মৌসুমি জ্বরের প্রকোপ লক্ষণীয়। এ ক্ষেত্রে বাসায় চিকিৎসা নিলে শিশুরা সুস্থ হয়ে উঠবে। তবে ডেঙ্গু হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক মো. কামরুজ্জামান বলেন, শিশুদের সর্দি-জ্বর এবং শ্বাসজনিত মৌসুমি রোগবালাই থেকে বাঁচতে বাড়তি সতর্কতা ও সচেতনতা বাড়ানোসহ গরম কাপড় পরানো, ঘরের ফ্যান, দরজা-জানালা বন্ধ ও ঠাণ্ডা পানি খাওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে। আর ঠান্ডা লাগলে শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে নজর রাখতে হবে। বেশি করে পুষ্টিকর খাবার, ফলমূল ও কুসুম গরম পানি খেতে হবে। একই সঙ্গে বাইরে গেলে ধূলাবালি এড়িয়ে চলতে হবে।
তিনি বলেন, ঠাণ্ডাজনিত রোগ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। সর্দি লাগলে নাক পরিষ্কার রাখতে হবে শিশুর বুক বেশি দেবে গেলে, ঘন ঘন শ্বাস নিলে ও খিঁচুনি উঠলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া পাড়া-মহল্লার ফার্মেসি থেকে ওষুধ না খাওয়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।
এ বিষয়ে প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, ঋতু বদলের কারণে ও শীতের আমেজ শুরু হওয়ায় বাতাসের তাপমাত্রা কমার সঙ্গে সঙ্গে আর্দ্রতাও কমে যায়, যা আমাদের শ্বাসনালির স্বাভাবিক কর্ম প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করে ভাইরাসের আক্রমণকে সহজ করে। ধূলাবালির পরিমাণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু ও দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো রোগ যেমন হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নেই ও কিডনি রোগ রয়েছে যাদের তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। এ সময় তাদের ভাইরাস জ্বর, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক সংক্রমণের কারণে ফুসফুসের নানা রোগ হয়ে থাকে। তাই তাদের বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।





