সারাদেশে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে প্রাণঘাতী ভাইরাস, আক্রান্ত হলেই মৃত্যু ঝুঁকি

Any Akter
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১:০৪ অপরাহ্ন, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৪:৩৬ অপরাহ্ন, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

শীত মৌসুম শুরু হতেই দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাস। আক্রান্ত হলে মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত বেশি এমন উদ্বেগজনক তথ্য জানিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। সংস্থাটির সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৫ জেলাতেই নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।

আইইডিসিআর জানায়, গত বছর (২০২৫) শনাক্ত হওয়া চারটি নিপাহ কেসের সবকটিতেই মৃত্যু হয়েছে, অর্থাৎ মৃত্যুহার ১০০ শতাংশ। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো দেশে একটি ‘অ-মৌসুমি নিপাহ কেস’ শনাক্ত হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা আরও বেশি উদ্বিগ্ন। বুধবার (৭ জানুয়ারি) দুপুরে আইইডিসিআরের মিলনায়তনে ‘নিপাহ ভাইরাসের বিস্তার ও ঝুঁকি বিষয়ে মতবিনিময়’ শীর্ষক সভায় উপস্থাপিত প্রবন্ধে এসব তথ্য জানান সংস্থাটির বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা।

আরও পড়ুন: নিপাহ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে, হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ

উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নওগাঁ, ভোলা, রাজবাড়ী ও নীলফামারী এই চার জেলায় চারজন নিপাহ রোগী শনাক্ত হন এবং প্রত্যেকেই মৃত্যুবরণ করেন। নওগাঁর ৮ বছরের এক শিশুর ঘটনা ছিল দেশের প্রথম অ-মৌসুমি নিপাহ সংক্রমণ, যা শীতকাল ছাড়াই আগস্ট মাসে শনাক্ত হয়। ওই শিশুর সংক্রমণের উৎস ছিল বাদুড়ের আধা-খাওয়া ফল—যেমন কালোজাম, খেজুর ও আম। এটিকে নিপাহ সংক্রমণের একটি নতুন ও অত্যন্ত উদ্বেগজনক পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্তদের গড় মৃত্যুহার প্রায় ৭২ শতাংশ। তবে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শনাক্ত হওয়া কেসগুলোতে মৃত্যুহার শতভাগ। এখনো এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়নি।

আরও পড়ুন: দেশের ৩৫ জেলায় নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ

নিপাহ ভাইরাসের প্রধান বাহক ফলখেকো বাদুড়। বাদুড়ের লালা বা প্রস্রাবের মাধ্যমে খেজুরের কাঁচা রস দূষিত হয় এবং তা পান করলে মানুষ সংক্রমিত হয়। এ ছাড়া নেশাজাতীয় পানীয় ‘তাড়ি’ও সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ উৎস। সম্প্রতি এক গবেষণায় একজন মায়ের বুকের দুধে নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা বিশেষজ্ঞদের আরও সতর্ক করেছে।

নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সাধারণত ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে জ্বর, মাথাব্যথা, গলা ব্যথা, পেশীতে ব্যথা, ঘুমঘুম ভাব, বমি, ঝিমুনি ও অচেতনতার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। পরবর্তীতে মস্তিষ্কে প্রদাহ ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা দেখা দেয়, যা রোগীকে দ্রুত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

আইইডিসিআরের উপস্থাপিত প্রবন্ধে বলা হয়, ঐতিহাসিকভাবে খেজুরের কাঁচা রসকে নিপাহ সংক্রমণের প্রধান উৎস মনে করা হলেও সাম্প্রতিক তথ্য প্রমাণ করছে, বাদুড়ের লালা বা মূত্রে দূষিত যে কোনো আধা-খাওয়া ফল সরাসরি খাওয়ার মাধ্যমেও সংক্রমণ ঘটতে পারে এবং তা সারা বছরই সম্ভব। এ ছাড়া প্রায় ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে মানুষ থেকে মানুষে নিপাহ সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা স্বাস্থ্যকর্মী ও রোগীর পরিবারের সদস্যদের জন্য উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করছে।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন বলেন, ‘২০২৫ সালের অ-মৌসুমি নিপাহ কেস এবং নতুন সংক্রমণ পথ আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। নিপাহ এখন শুধু শীতকাল বা খেজুরের রসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি সারা বছরের বহুমুখী সংক্রমণের হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেজুরের কাঁচা রস কোনো অবস্থাতেই পান করা উচিত নয়। কারণ মশারি দিয়ে খেজুর গাছ ঢেকে রাখার পদ্ধতি শতভাগ নিরাপদ নয়। খেজুরের রসের নিরাপদ বিকল্প হিসেবে গুড় ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলমূল ভালোভাবে ধুয়ে খেতে হবে, বিশেষ করে টমেটো, পেয়ারা ও বরই জাতীয় ফল। গাছের নিচে পড়ে থাকা, ফাটা বা বাদুড়ের আধা-খাওয়া ফল এড়িয়ে চলতে হবে। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। নিপাহ ভাইরাস যেহেতু অত্যন্ত প্রাণঘাতী এবং এর কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা বা ভ্যাকসিন নেই, তাই সচেতনতা ও প্রতিরোধই একমাত্র উপায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।