মানবিক চিকিৎসক তৈরিতে মেডিসিন ক্লাবের গুরুত্ব তুলে ধরলেন রফিকুল ইসলাম
দেশের বর্তমান ডেঙ্গু ও হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ এবং সরকারি স্বাস্থ্য কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণে মেডিসিন ক্লাবের সদস্যদের আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন অধ্যাপক ডা. মোঃ রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, চিকিৎসাশিক্ষার্থীদের একাডেমিক জ্ঞান, মানবিক মূল্যবোধ ও স্বেচ্ছাসেবার মানসিকতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব।
গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজে অনুষ্ঠিত ২৭তম মেডিসিন ক্লাব কেন্দ্রীয় বার্ষিক সম্মেলন ২০২৬-এর উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমিম।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে একদিনে ১০ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৯৪৩
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন চিকিৎসাশিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জনস্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে দক্ষ চিকিৎসক তৈরির পাশাপাশি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ, মানবিক ও সেবাপরায়ণ চিকিৎসক গড়ে তোলা জরুরি। এ ক্ষেত্রে মেডিসিন ক্লাবের মতো ছাত্রসংগঠনগুলো চিকিৎসাশিক্ষার্থীদের নেতৃত্বের বিকাশ এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ অতিথি অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমিম তাঁর বক্তব্যে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সরকারি স্বাস্থ্য কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ডেঙ্গু ও হামের মতো সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় জনগণের সচেতনতা, সময়মতো স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ এবং টিকাদান কার্যক্রমের গুরুত্ব অপরিসীম। চিকিৎসাশিক্ষার্থীরা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক স্বাস্থ্যতথ্য প্রচার এবং কমিউনিটিভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে এসব উদ্যোগকে আরও কার্যকর করতে পারেন।
আরও পড়ুন: ডেঙ্গুতে আরও ৯ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৯৫৪
অধ্যাপক ডা. মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞান কেবল রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসচেতনতা সৃষ্টি, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং স্বাস্থ্যসেবাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে সেবার সুযোগ পৌঁছে দেওয়াও চিকিৎসকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই বৃহত্তর মানবসেবার দর্শনকে ধারণ করেই মেডিসিন ক্লাব দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাশিক্ষার্থীদের একাডেমিক বিকাশের পাশাপাশি সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে আসছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে অধ্যাপক ডা. মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। মেডিসিন ক্লাবের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজভিত্তিক শাখা নিজ নিজ ক্যাম্পাস, আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারে। পাশাপাশি ডেঙ্গুর বিপৎসংকেত, সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ ওষুধ ব্যবহারের বিপদ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে।
হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় তিনি শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, টিকাদান সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা, অভিভাবকদের সঠিক তথ্য জানানো এবং টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুদের পরিবারকে টিকাদান কেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে মেডিসিন ক্লাবের সদস্যরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা EPI-এর সঙ্গে সমন্বয় করে স্কুল, মাদ্রাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্থানীয় সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।
স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়নে মেডিসিন ক্লাবের সম্ভাবনা তুলে ধরে অধ্যাপক ডা. মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, তামাক নিয়ন্ত্রণ, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্যসেবায় সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সংগঠনটির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে। কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করলে একদিকে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়বে, অন্যদিকে চিকিৎসাশিক্ষার্থীরাও দেশের বাস্তব স্বাস্থ্যসমস্যা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতের চিকিৎসকদের শুধু ক্লিনিক্যাল জ্ঞান অর্জন করলেই চলবে না; নেতৃত্ব, গবেষণা, দলগত কাজ, ব্যবস্থাপনা, পেশাগত নৈতিকতা এবং রোগীর প্রতি মানবিক আচরণের ক্ষেত্রেও দক্ষ হতে হবে। মেডিসিন ক্লাবের সেমিনার, বৈজ্ঞানিক আলোচনা, গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম এবং সামাজিক সেবামূলক উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের এসব গুণ বিকাশে সহায়তা করতে পারে।
মেডিসিন ক্লাবের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম আরও গতিশীল করার জন্য পরিকল্পিত কর্মসূচি, কেন্দ্রীয় ও শাখা পর্যায়ে সমন্বয়, শিক্ষক ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধান এবং কার্যক্রমের নিয়মিত মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, স্বেচ্ছায় রক্তদান নেটওয়ার্ক, কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষা, সরকারি টিকাদান কর্মসূচির সহযোগিতা এবং আন্তমেডিকেল কলেজ গবেষণা উদ্যোগকে শক্তিশালী করা গেলে সংগঠনটির সামাজিক অবদান আরও বিস্তৃত হবে।
অধ্যাপক ডা. মোঃ রফিকুল ইসলাম আশাবাদ ব্যক্ত করেন, মেডিসিন ক্লাবের সদস্যরা নিজেদের জ্ঞান, তারুণ্য, মানবিকতা ও স্বেচ্ছাসেবার মানসিকতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন। চিকিৎসাশিক্ষা ও মানবসেবার মধ্যে শক্তিশালী সেতুবন্ধন গড়ে তোলার মাধ্যমে একটি দক্ষ, মানবিক ও দায়িত্বশীল চিকিৎসকসমাজ গঠনে মেডিসিন ক্লাব গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।





