স্পেনে ট্রেন দুর্ঘটনা: নিহত বেড়ে ৬৮, আহত ৮০

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ৯:০০ পূর্বাহ্ন, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৯:০০ পূর্বাহ্ন, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

স্পেনের মধ্যাঞ্চলে দুটি দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৬৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় ৮০ জন। আহতদের মধ্যে প্রায় ৫০ জনের অবস্থা গুরুতর এবং ১৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক সরকারের প্রধান এমিলিয়ানো গার্সিয়া-পাখে।

বুধবার ভোরে রাজধানী মাদ্রিদের দক্ষিণে তোলেদো প্রদেশের উর্দা এলাকার কাছে উচ্চগতির রেলপথে এ দুর্ঘটনা ঘটে। মাদ্রিদ থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সেভিলের সঙ্গে সংযোগকারী রেললাইনে চলার সময় একটি ট্রেন সামনে থেমে থাকা আরেকটি ট্রেনের পেছনে ধাক্কা দেয়। এতে দুটি বগি লাইনচ্যুত হয়।

আরও পড়ুন: শান্তি আলোচনার আশায় কমল তেলের দাম

আঞ্চলিক সরকারের মুখপাত্র এস্তের পাদিয়া স্পেনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম টিভিইকে জানান, ট্রেন দুটি একই দিকে চলছিল। এ সময় একটি ট্রেন অন্যটির পেছনে ধাক্কা দিলে বগি লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটে।

দুর্ঘটনায় স্পেনের রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা রেনফের মাদ্রিদ-সেভিলগামী এভিই দ্রুতগতির ট্রেন এবং বেসরকারি রেল সংস্থা ইরিও পরিচালিত আরেকটি ট্রেন জড়িত ছিল।

আরও পড়ুন: ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা

স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনিকা গার্সিয়া জানিয়েছেন, আহতদের আশপাশের কয়েকটি হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। গুরুতর আহতদের কয়েকজনকে বাঁচানো কঠিন হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন আঞ্চলিক সরকারের প্রধান।

তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা

দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ২৯ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন।

তিনি বলেন, স্পেন শোকাহত। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা হবে। কোনো অবহেলা থাকলে তা প্রকাশ করা হবে এবং ব্যবস্থাগত ত্রুটি পাওয়া গেলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

একই বছরে দুটি ট্রেন দুর্ঘটনার ঘটনা স্পেনের মতো দেশের জন্য গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে আগের দুর্ঘটনার সঙ্গে এবারের দুর্ঘটনার কারণের কোনো সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে হচ্ছে না বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

দুর্ঘটনাস্থলে সামরিক জরুরি সহায়তা ইউনিটের ২০০ জনের বেশি সদস্য উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন। আহতদের সহায়তায় স্থানীয় প্রশাসন খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করেছে।

নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন

স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, সংকেত ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেওয়ার পরও একটি ট্রেনকে স্বাভাবিকভাবে চলাচল চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রায় ৬৩ কিলোমিটার রেলপথজুড়ে এলজেডবি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। এতে ছয়টি ট্রেনের চলাচল প্রভাবিত হয়, যদিও সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত নয় বলে জানান তিনি।

ব্যবস্থাটি অচল হয়ে যাওয়ার পর নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব আতচা নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকেই রেনফের ট্রেনটিকে স্বাভাবিকভাবে যাত্রা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল।

পুয়েন্তে বলেন, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পুনরায় সচল না হওয়া অবস্থায় ট্রেন চলাচল শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের ছিল। পুরো পরিস্থিতিকে তিনি ব্যাখ্যাতীত বলে উল্লেখ করেন।

তবে দুর্ঘটনার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ত্রুটির সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক এবং দায় নির্ধারণের বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

উদ্ধারকাজ চলছে, বন্ধ মাদ্রিদ-আন্দালুসিয়া রেল চলাচল

আঞ্চলিক সরকারের মুখপাত্রের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় রেনফের ট্রেনে ৩৯৭ জন এবং ইরিওর ট্রেনে ১৪৭ জন যাত্রী ছিলেন। সংবাদমাধ্যম এল পাইসের বরাতে জরুরি সেবাকর্মীরা জানিয়েছেন, ইরিওর ট্রেনের দুটি বগি রেললাইনের পাশের ঢাল বেয়ে নিচে পড়ে যায়।

দুর্ঘটনাস্থলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে লাইনচ্যুত বগির ধ্বংসাবশেষ ঢালের ওপর ছড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় লোকজন সেখানে কাজ করছিলেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী গার্সিয়া জানিয়েছেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দুটি বগি থেকে জীবিতদের উদ্ধার এবং মরদেহ উদ্ধারে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, সংঘর্ষটি ছিল উচ্চগতির, তাই বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রেল অবকাঠামো পরিচালনাকারী সংস্থা এডিআইএফ মাদ্রিদ থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্দালুসিয়া অঞ্চলের মধ্যে দ্রুতগতির ট্রেন চলাচল স্থগিত করেছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সিভিল গার্ডের একটি বিশেষ তদন্ত দলও ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে।

শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছেন বিশ্বনেতারা

মাদ্রিদের মেয়র হোসে লুইস মার্তিনেজ-আলমেইদা জানিয়েছেন, উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য রাজধানী থেকেও জরুরি চিকিৎসা দল ও দমকলকর্মী পাঠানো হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী সানচেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন। উদ্ধারকাজ চলাকালে তিনি পরিবহনমন্ত্রী পুয়েন্তে ও আঞ্চলিক সরকারের প্রধান গার্সিয়া-পাখের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন বলেও জানান।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, ইউরোপ আজ স্পেনের সঙ্গে শোক ভাগ করে নিচ্ছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁও স্পেনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। নিহতদের পরিবার, আহত ব্যক্তি এবং উদ্ধারকর্মীদের কথা উল্লেখ করে তিনি সমবেদনা জানান।

সূত্র: আলজাজিরা