খেলাধুলা শৃঙ্খলা, আনুগত্য ও দেশপ্রেম শেখায়: কাদের গনি চৌধুরী
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, খেলাধুলা মানুষকে শারীরিক ও মানসিক শক্তি জোগায়। পাশাপাশি শৃঙ্খলা, আনুগত্য এবং দেশপ্রেম শেখায়।
খেলাধুলার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন’, ‘ক্রীড়াই শক্তি, ক্রীড়াই বল’—এই চিরন্তন বাক্যগুলো আমাদের খেলাধুলার গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়। অথচ জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টিকে আমরা বরাবরই উপেক্ষা করে আসছি। স্বাস্থ্য ভালো থাকলে মনও ভালো থাকে। সুস্থ দেহ ও মন কাজের প্রতি আগ্রহ এবং কাজের গতি বাড়ায়। আর দেহ ও মনকে সুস্থ রাখার জন্য প্রয়োজন খেলাধুলা। খেলাধুলার মাধ্যমে একজন মানুষ শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা লাভের পাশাপাশি ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও নেতৃত্বের গুণ অর্জন করে।
আরও পড়ুন: সাংবাদিক আলী মাহমুদের রহস্যজনক মৃত্যু
আজ সোমবার দুপুরে হোটেল ইম্পেরিয়াল মিলনায়তনে বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম মহসিনের সভাপতিত্বে ও খোকন শিকদারের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন সিনিয়র সাংবাদিক এবিএম রফিকুর রহমান, মশিউর রহমান সুমন, সজল ইসলাম, শাহাদাত হোসেন প্রমুখ।
আরও পড়ুন: রোটারি ভোকেশনাল এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড পেলেন সাংবাদিক সুবর্ণা হামিদ
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, শিশুর বিকাশের মূলে রয়েছে খেলাধুলা। খেলাধুলা শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশসহ বিভিন্ন উপায়ে শিখতে এবং বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। খেলাধুলা শিশুর সৃজনশীলতা ও কল্পনা বিকাশেও সহায়তা করে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এখন আর শিশুদের খেলার মাঠে খুব একটা দেখা যায় না। সকালে সূর্যের মুখ দেখা যেতে না যেতেই ছেলেমেয়েরা একগাদা বই কাঁধে নিয়ে অথবা কোচিং সেন্টারের দিকে ছোটে। সারা দিন ক্লাস শেষে তারপর ঘরে ফেরা। অনেকের কপালে এই সৌভাগ্যটুকুও জোটে না। স্কুল শেষে অনেক ছেলেমেয়েই প্রাইভেট বা কোচিংয়ের দিকে ছোটে।
তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের শিশুদের একটা বড় অংশই পড়াশোনার চাপে পিষ্ট হয়ে খেলার মাঠে যাওয়ার সুযোগ পায় না। অনেকে খেলাধুলাকে পাশ কাটিয়েই চলে। ভাবটা এমন যে, খেলাধুলা করে হবেটা কী! তার চেয়ে বরং মোবাইলে একটু গেম খেলা কিংবা একটু টেলিভিশন দেখাও ভালো! এভাবে স্মার্টফোন এবং আকাশসংস্কৃতি আমাদের আগামী প্রজন্মকে গ্রাস করে ফেলেছে।
নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণ করে কাদের গনি চৌধুরী বলেন, আমরা স্কুল থেকে ফিরে এসে বাড়িতে বই রেখে সামান্য কিছু মুখে দিয়েই খেলার মাঠে ছুটে যেতাম। ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডিসহ অনেক খেলাই চলত সমানতালে। কই, পরীক্ষার সময় তো কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেখিনি! বরং যেসব ছেলেমেয়ে খেলাবিমুখ ছিল, দিনদিন তাদেরই পিছিয়ে পড়তে দেখেছি। ছোটবেলায় প্রতিটা স্কুল-কলেজে মহা ধুমধামের সঙ্গে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। যে স্কুল বা কলেজে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো, তার আশপাশের এলাকায় একটা সাজ সাজ রব পড়ে যেত। মানুষ দলে দলে ছেলেমেয়েদের খেলাধুলা দেখতে ছুটে আসত। এখন গ্রামাঞ্চলের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আয়োজন করা হলেও শহরের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এসব প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় না। হবে কীভাবে? স্কুলগুলোতে তো খেলার মাঠই নেই! নির্মম সত্য হলো, ধীরে ধীরে দেশে খেলার জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে। অথচ উচিত ছিল জনসংখ্যা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অনুপাতে খেলার মাঠের সংখ্যা বাড়ানো। কিন্তু তা হয়নি। গ্রামাঞ্চলে কম হলেও কিছু কিছু খেলার মাঠ আছে। কিন্তু শহরের অবস্থা একেবারেই বেহাল। অপরিকল্পিত নগরায়ন শহরের বুকের এক চিলতে খেলার মাঠকেও গিলে খেয়েছে। খেলাধুলার সামান্য জায়গাও অবশিষ্ট নেই। তাহলে কীভাবে আমাদের দেশ থেকে তৈরি হবে একজন পেলে, ম্যারাডোনা, রোনাল্ডো, নেইমার, মেসি কিংবা ব্রায়ান লারার মতো সেরা খেলোয়াড়!
সাংবাদিকদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, একসময় মানুষ বলত, খেলার মাঠ দিন দিন কমে যাচ্ছে। আর এখন বলা যায়, খেলার মাঠ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিটি খালি জায়গা এখন দালানকোঠায় রূপান্তরিত হচ্ছে। খালি কোনো জায়গা নেই, যেখানে বাচ্চারা একটু খেলবে এবং দৌড়াবে। পক্ষান্তরে আমাদের জনসংখ্যাও বাড়ছে। এতে করে শিশুর সংখ্যাও বেড়ে চলছে। ভবিষ্যতে এই শিশুরা মাঠ কোথায় পাবে, সেটাও বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন তরুণ ছেলেরাও খেলার জন্য মাঠ খুঁজে পায় না। মাঠ আছে শুধু জাতীয় পর্যায়ের খেলার জন্য। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে খেলার জন্য তৈরি হতে যে আগে ছোট মাঠে খেলতে হয়, সেটা আমরা অনেকেই ভুলে গেছি। নতুন নতুন স্টেডিয়াম হচ্ছে। কিন্তু এদিকে শিশু, তরুণ, যুবকরা খেলার জন্য কোনো মাঠ পায় না। ছোট ছোট খালি জায়গায় এখন ছেলেমেয়েরা ক্রিকেট-ফুটবল খেলে। শিশুদের, তরুণদের ভেতর খেলাধুলার ইচ্ছা এবং আগ্রহ বর্তমান সময়ে হত্যা করা হচ্ছে। আমরাই এর জন্য দায়ী। এর ফলে তরুণ এবং যুবকরা হয়ে উঠবে ফেসবুক ও মাদকনির্ভর। কারণ খেলাধুলা করতে না পারলে বিকেলের অবসর সময় তারা নানাভাবে নিজেদের জড়িয়ে ফেলতে পারে, যার মধ্যে মাদকাসক্তি অন্যতম। খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ সবারই কমবেশি রয়েছে; কিন্তু মূল বিষয় হচ্ছে—খেলতে সবাই পারছে না।
তরুণরা কীভাবে খেলাধুলা করে—ছোট্ট গলির ভেতর তারা ক্রিকেট-ফুটবল খেলে। দেখতে একদিকে কষ্ট লাগলেও একদিকে খেলার প্রতি তরুণ সমাজের আগ্রহ দেখে ভালো লাগে। বর্তমানে ছক্কা মারার মতো কোনো মাঠ নেই। এখন সব স্থানে শর্টপিচ নামক খেলাধুলা হয়। অন্যদিকে জোরে শট করে গোল দেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। এখন ফুটবল খেলা হয় মিনিবারে, যেখানে গোলকিপার বলতে কিছু নেই। সবাই পা দিয়ে বল লাথি দেয়। বলা যায়, মাঠস্বল্পতার কারণে খেলার ধরন পর্যন্ত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে।
যদি সত্যিকারের খেলা খেলতে হয়, তবে স্টেডিয়ামে যেতে হবে। কিন্তু স্টেডিয়াম তো জাতীয় দলের জন্য, সাধারণ মানুষের জন্য নয়। তাছাড়া একসময় ছক্কা মারার মতো মাঠ আমাদের দেশে সত্যিই হারিয়ে যাবে। থাকবে শুধু স্টেডিয়ামগুলো। স্কুল থাকবে, মাঠ থাকবে না, শিক্ষার্থীরা খেলতে পারবে না—এটা কি ভাবা যায়? মাঠের অভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় খেলাধুলার চর্চা নেই, নেই সাংস্কৃতিক পরিবেশ। এ দিকে নজর দেওয়ার যেন কারও সময় নেই। শিক্ষার পাশাপাশি এই চর্চাগুলো নিশ্চিত না করলে জাতি শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।
তিনি সরকারকে এ বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বছরে দুই-চারটি টুর্নামেন্ট আয়োজন রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় ছাড়া কিছু নয়। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শারীরিক শিক্ষার প্রশিক্ষিত শিক্ষক থাকলেও বিষয়টি অবহেলিত, বিশেষ করে কলেজ পর্যায়ে। তাই কলেজ পর্যায়ে শারীরিক শিক্ষা বিষয়টি চালু করা এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের প্রভাষক পদে উন্নীত করা উচিত।
বর্তমান প্রজন্মের মোবাইল ফোন আসক্তিতে তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন উল্লেখ করে বলেন, আমাদের দেশের স্কুল ও কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা এখন মাঠে যেতে চায় না। তারা স্ক্রিনেই সময় কাটায় বেশি, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এর ফলে ভবিষ্যতে একটি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ জাতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সত্যি কথা বলতে কি, ইন্টারনেটের এ যুগে আমরা স্মার্টফোনে গেম খেলতে খেলতে সত্যিকারের খেলা প্রায় ভুলে গেছি। আমাদের সন্তানেরা অনেক খেলা সম্পর্কে জানেও না। খেলাধুলা শুধু ছোটদের জন্যই নয়, বড়দের জন্যও সমান প্রয়োজন। তাই ছোট বাচ্চাদের খেলার উপকারিতা শেখাতে গিয়ে নিজের ব্যাপারটাও ভুলে যাবেন না। ঘর ও কাজের মাঝে প্রতিদিন ৩০ মিনিট সময় বের করুন খেলার জন্য, পরিবারের সবাইকে উদ্বুদ্ধ করুন। আর অবশ্যই একে বাধ্যবাধকতা না মনে করে খেলাকে শখ হিসেবে গ্রহণ করুন। পরিবারের সঙ্গে খেললে পারিবারিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে, সেই সঙ্গে সময়টাও আনন্দে কাটবে।





