পিএসসির প্রশ্ন ফাঁস । চাকুরী কনফার্মের জন্য বসতো বিশেষ বোর্ড
প্রশাসনে আবেদ আলী ক্যাডার কারা
বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রশ্নপত্র ফাঁস করে বিশেষ বোর্ডের মাধ্যমে বিসিএস ও অন্যান্য নিয়োগ পরীক্ষায় চাকুরী কনফার্ম করতো আবেদালিচক্র। এতে প্রশাসনের প্রতিটি ক্যাডার ও বিভাগে গড়ে উঠেছে আবেদ আলী ক্যাডার। সিআইডির অভিযানে ও তদন্তে আবেদ আলী চক্রের গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই নড়েচড়ে বসেছে জনপ্রশান ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা। ১৯৯৮ সনে চাকরিতে যোগদান করলেও মূলত ২০০৫ সালের পর থেকে প্রশ্ন পাস চক্রে জড়িয়ে পড়ে গাড়ি চালক আবেদ আলী। ২০১৪ সালে চাকুরী চুত্ব হলেও পিএসসির ভিতরে প্রশ্ন ফাঁস ও চাকরি দেয়ার চক্রে বাইরে থেকে জড়িত থাকে আবেদানী পরিবার। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রলীগ নেতা আবেদ আলীর ছেলে সিয়ামের মাধ্যমে ছাত্রলীগের একটি অংশের মাধ্যমে চাকুরী প্রত্যাশী সংগ্রহ করত। চাকুরীর নিশ্চয়তা দেওয়া য় ছাত্রলীগের মহানগরের বড় পথ পেয়ে যায় সিয়াম। গাড়ি চালকের চাকরি থেকে আবেদ আলী ২০১৪ সালে চাকরি যুক্ত হলেও পিএসসির নিয়োগ পরীক্ষায় বিশেষ ভূমিকা থাকে। সিআইডি সূত্র জানায় ২৪, ২৫ ও ২৭ তম বিসিএস পরীক্ষায় সফলতার পর আরো সক্রিয় হয়ে ওঠে। ৩৩ তম বিসিএস থেকে ৪১ পর্যন্ত বিসিএস ও নন ক্যাডার প্রতিটি পরীক্ষাতেই তাদের নির্বাচিত প্রার্থী থাকে। এই চক্র কত লোককে চাকরি দিয়েছে তার হিসাব চলছে। গোয়েন্দাদের কাছে আবেদালি ও তার পুত্র বিস্তারিত জবানবন্দী দিয়েছে। সবকিছু স্বীকার করেছে। বর্তমান পুলিশ প্রশাসন ও অন্যান্য ক্যাডারে প্রভাবশালী অনেকেই তাদের মাধ্যমে চাকরি পেয়েছে। তাদের মাধ্যমে চাকরি পাওয়া অনেকেই দেশের নীতি নির্ধারণী পর্যায়েও আছে। তবে এগুলি এখনো গোয়েন্দারা যাচাই-বাছাই করছে।
প্রশ্নফাঁস করার পর বোর্ড বসাতো ফাঁসকারী চক্র। বোর্ডে প্রধানের দায়িত্ব পালন করতেন সৈয়দ আবেদ আলী। তার নেতৃত্বে সিদ্ধান্ত হতো কাকে কোন পদে দেওয়া হবে। টাকার অংকের ওপর নির্ভর করে ফার্স্ট-সেকেন্ডও করাতো পরীক্ষার্থীদের। প্রশ্নফাঁসকারি চক্রের হোতা বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবেক গাড়ি চালক আবেদ আলী আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে এমন তথ্য জানিয়েছে। ধুরন্ধর আবেদ আলী নিজেও পিএসসিতে গাড়িচালকের চাকরি নিয়েছিলেন ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে। তর বাড়ি মাদারীপুরে হলেও তিনি ঠিকানা দিয়েছিলেন সিরাজগঞ্জের। ২০১৪ সালে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে তাকে পিএসসির চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু তার প্রশ্নফাঁসের কারবার থেমে ছিল না। কয়েক কর্মকর্তা হাত করে চলে আসছিল তার প্রশ্নফাঁসের কারবার। সিআইডিতে প্রশ্নফাঁসকারিদের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানিয়েছেন। তারা বলেন, ফাঁস হওয়া প্রশ্নে কারা কোন পদে চাকরি নিয়েছেন তাদের একটি তালিকা তৈরির কাজ চলছে। ওই তালিকা পিএসপি এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে সিআইডি।
আরও পড়ুন: দায়িত্ব ছাড়ার পর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে সমস্যা নেই: উপদেষ্টা রিজওয়ানা
এদিকে রিমান্ডে পিএসসির ডিসপ্যাচ অফিসার খলিলুর রহমান বলেছেন, তিনি ৩৩তম বিসিএস পরীক্ষায় ১০ জন প্রার্থীর কাছে প্রশ্ন ফাঁস করেছেন। এর মধ্যে তিনজন বর্তমানে বিভিন্ন ক্যাডারে চাকরি করছেন। এছাড়াও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও রেলের বিভিন্ন নিয়োগের প্রশ্নফাঁসে তার হাত ছিল। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি এসব কথা বলেন। আদালতে খলিল বলেন, প্রশ্ন পাওয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ছয়জন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এর মধ্যে তিনজন মৌখিক পরীক্ষায় বাদ পড়েন।
আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী ও পুলিশের কাছে ১৬১ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে প্রশ্নফাঁস করা, বিভিন্ন পদে চাকরি পাওয়া অনেকের নাম পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তারা সে অনুযায়ী তালিকাও প্রস্তুত করছে। এই চক্রের আরও কারা জড়িত তাদেরকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে। পিএসসির প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় সিআইডির মামলায় মঙ্গলবার চেয়ারম্যানের সাবেক গাড়ি চালক সৈয়দ আবেদ আলীসহ ৬ জন দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
আরও পড়ুন: লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতে সরকার সব ব্যবস্থা নিয়েছে: প্রেস সচিব
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ জুলাই বাংলাদেশ রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত অভিযোগে সোমবার শেওড়াপাড়ার ওয়াসা রোডের ফ্ল্যাট থেকে সৈয়দ আবেদ আলী ও তার বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান ওরফে সিয়ামকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। পরে একই অভিযোগে পিএসসির ২ উপপরিচালক, এক সহকারী পরিচালকসহ আরও ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাদের বিরুদ্ধে পল্টন থানায় সরকারি কর্ম কমিশন আইনে মামলা করেছেন সিআইডির এক কর্মকর্তা।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, সামান্য গাড়ি চালক হলেও আবেদ আলী ও তার পরিবারের সদস্যদের বিলাসী জীবনযাত্রা ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর। আবেদ আলী অন্তত ৫০ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদের মালিক। ঢাকায় তার একটি ছয়তলা বাড়ি, তিনটি ফ্ল্যাট ও একটি গাড়ি রয়েছে। গ্রামের বাড়িতে ডুপ্লেক্স বাড়ি ও বিপুল পরিমান কৃষিজমি রয়েছে।
আবেদ আলী স্বীকারোক্তিতে জানান, গত বছরের শেষের দিকে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর পদে ৩ হাজার ১০০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের অনেকের কাছে ফাঁস করা প্রশ্ন বিক্রি করেছেন এবং তাদের চাকরিও হয়েছে।
সিআইডির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া পিএসসির উপপরিচালক আবু জাফর এর আগেও বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গোয়েন্দা তথ্যে পিএসসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তার অপকর্মের বিষয়ে অবহিত করায় কয়েকবার পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। উপপরিচালক জাফর ঢাকার মালিবাগে জ্যোতি কোচিং সেন্টার নামে একটি কোচিং সেন্টার চালান। এই কোচিং সেন্টারের আড়ালে প্রশ্নপত্র কেনাবেচার কাজ চলে আসছিল।
এছাড়া পিএসসির সহকারী পরিচালক মো. আলমগীর কবিরের বিরুদ্ধেও অনেক আগ থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ রয়েছে। মিরপুরে তার একটি কোচিং সেন্টার রয়েছে। পিএসসির ডেসপাচ (চিঠিপত্র আদান-প্রদান) শাখার কর্মচারী খলিলুর রহমান ৩৩তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার ভুয়া প্রশ্নপত্র বিক্রি করেন। প্রশ্নপত্র বিক্রির সময় ২০১২ সালে হাতেনাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। ২০১২ সালের ৭ অক্টোবর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত হলেও তাত বলা হয়, ‘অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। পরে তাকে বিভাগীয় মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তখন কার বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে নেয় পিএসসি।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া পিএসসির অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলাম জিজ্ঞাসাবাদে সিআইডির কর্মকর্তাদের বলেছেন, রেলওয়ের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তিনি সংগ্রহ করেছেন উপপরিচালক মো. আবু জাফরের কাছ থেকে। এ জন্য আবু জাফরকে তিনি ২ কোটি টাকা দেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি আরও বলেছেন, পিএসসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কক্ষের ট্রাংক খুলে তিনি বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে সেগুলো টাকার বিনিময়ে ফাঁস করতেন। এর মধ্যে বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার (কোন বিসিএসের, সেটি জানা যায়নি) প্রশ্নপত্রও রয়েছে। এ কাজে পিএসসির সাবেক গাড়িচালক আবেদ আলী বিভিন্ন সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন বলে জানান সাজেদুল।





