নির্বাচনের কয়েক ঘণ্টা আগে ডিসিদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে তোলপাড়
সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ঠিক এমন সময়েই দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) একটি ফাঁস হওয়া গোপন নথি। ওই নথিতে দেশের ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসকদের নাম, বিসিএস ব্যাচ এবং তাঁদের কথিত রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে—যা মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
ফাঁস হওয়া নথিতে প্রজাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ‘বিএনপি’, ‘জামায়াত’ ও ‘এনসিপি (NCP)’—এই তিন রাজনৈতিক ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল ব্যক্তিগত পরিচয় লিপিবদ্ধ করার বিষয় নয়; বরং মাঠ প্রশাসনে পরিকল্পিত রাজনৈতিক বিন্যাসের একটি সুস্পষ্ট আলামত।
আরও পড়ুন: আজ চৈত্র সংক্রান্তি
নথির সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, ৬৪ জেলার মধ্যে ৫২ জেলাতেই জামায়াত ও এনসিপি মতাদর্শের কর্মকর্তাদের জেলা প্রশাসক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিপরীতে বিএনপিপন্থী হিসেবে উল্লেখ রয়েছে মাত্র ১২ জন কর্মকর্তার নাম।
দলীয় পরিচয়ভিত্তিক পরিসংখ্যানে জামায়াত ৩২ জন, এনসিপি (NCP) ২০ জন, বিএনপি ১২ জন।
আরও পড়ুন: তাদের নজিরবিহীন মুক্তিতে রাজনীতির মাঠে নানা কৌতূহল
অনেক কর্মকর্তার নামের পাশে বর্তমান পরিচয়ের পাশাপাশি অতীত রাজনৈতিক অবস্থানের কথাও উল্লেখ রয়েছে—যেমন ‘পূর্বে জামায়াত’ বা ‘পূর্বে বিএনপি’।
বিভাগভিত্তিক জেলা প্রশাসকদের তালিকা:
ঢাকা বিভাগ
১. ঢাকা — মো. রেজাউল করিম (২৭ ব্যাচ) — জামায়াত
২. গাজীপুর — মোহাম্মদ আলম হোসেন (২৭) — জামায়াত
৩. নারায়ণগঞ্জ — মো. রায়হান কবির (২৯) — জামায়াত (পূর্বে বিএনপি)
৪. মুন্সীগঞ্জ — সৈয়দা নুরমহল আশরাফী (২৭) — জামায়াত
৫. নরসিংদী — মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন (২৭) — জামায়াত
৬. মানিকগঞ্জ — নাজমুন আরা সুলতানা (২৮) — বিএনপি
৭. টাঙ্গাইল — শরীফা হক (২৫) — বিএনপি
৮. কিশোরগঞ্জ — মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা (২৭) — জামায়াত (পূর্বে বিএনপি)
৯. ফরিদপুর — কামরুল হাসান মোল্যা (২৫) — এনসিপি (পূর্বে জামায়াত)
১০. রাজবাড়ী — সুলতানা আক্তার (২৭) — এনসিপি (পূর্বে জামায়াত)
১১. গোপালগঞ্জ — আরিফ-উজ-জামান (২৭) — জামায়াত
১২. মাদারীপুর — জাহাঙ্গীর আলম (২৮) — জামায়াত
১৩. শরীয়তপুর — তাহসিনা বেগম (২৫) — জামায়াত
চট্টগ্রাম বিভাগ
১৪. চট্টগ্রাম — জাহিদুল ইসলাম মিঞা (২৫) — বিএনপি
১৫. কক্সবাজার — মো. আ. মান্নান (২৭) — জামায়াত (পূর্বে বিএনপি)
১৬. কুমিল্লা — রেজা হাসান (২৯) — এনসিপি (পূর্বে বিএনপি)
১৭. ব্রাহ্মণবাড়িয়া — শারমিন আক্তার জাহান (২৫) — বিএনপি
১৮. চাঁদপুর — নাজমুল ইসলাম সরকার (২৯) — বিএনপি
১৯. নোয়াখালী — মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম (২৭) — বিএনপি
২০. লক্ষ্মীপুর — এস. এম. মেহেদী হাসান (২৭) — জামায়াত
২১. ফেনী — মনিরা হক (২৭) — জামায়াত
২২. খাগড়াছড়ি — আনোয়ার সাদাত (২৯) — জামায়াত
২৩. রাঙামাটি — নাজমা আশরাফী (২৯) — এনসিপি (পূর্বে সুশীল)
২৪. বান্দরবান — শামীম আরা রিনি (২৭) — বিএনপি
রাজশাহী বিভাগ
২৫. রাজশাহী — আফিয়া আখতার (২৫) — বিএনপি
২৬. বগুড়া — তৌফিকুর রহমান (২৭) — বিএনপি
২৭. পাবনা — ড. শাহেদ মোস্তফা (২৫) — জামায়াত (পূর্বে বিএনপি)
২৮. সিরাজগঞ্জ — আমিনুল ইসলাম (২৭) — এনসিপি (পূর্বে জামায়াত)
২৯. নওগাঁ — সাইফুল ইসলাম (২৯) — এনসিপি (পূর্বে জামায়াত)
৩০. নাটোর — আসমা শাহীন (২৭) — এনসিপি (পূর্বে জামায়াত)
৩১. চাঁপাইনবাবগঞ্জ — শাহাদাত হোসেন মাসুদ (২৮) — জামায়াত
৩২. জয়পুরহাট — আল-মামুন মিয়া (২৮) — এনসিপি (পূর্বে জামায়াত)
খুলনা বিভাগ
৩৩. খুলনা — আ. স. ম. জামশেদ খোন্দকার (২৯) — জামায়াত (পূর্বে বিএনপি)
৩৪. যশোর — মোহাম্মদ আশেক হাসান (২৭) — জামায়াত
৩৫. সাতক্ষীরা — আফরোজা আখতার (২৮) — জামায়াত
৩৬. বাগেরহাট — গোলাম মো. বাতেন (২৮) — এনসিপি (পূর্বে বিএনপি)
৩৭. কুষ্টিয়া — মো. ইকবাল হোসেন (২৯) — জামায়াত
৩৮. ঝিনাইদহ — আব্দুল্লাহ আল মাসউদ (২৭) — বিএনপি
৩৯. চুয়াডাঙ্গা — মোহাম্মদ কামাল হোসেন (২৭) — এনসিপি (পূর্বে সুশীল)
৪০. মেহেরপুর — ড. সৈয়দ এনামুল কবির (২৭) — জামায়াত (পূর্বে বিএনপি)
৪১. নড়াইল — ড. মোহাম্মদ আব্দুল ছালাম (২৭) — জামায়াত
৪২. মাগুরা — আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ (২৮) — জামায়াত
রংপুর বিভাগ
৪৩. রংপুর — মোহাম্মদ এনামুল আহসান (২৭) — জামায়াত (পূর্বে বিএনপি)
৪৪. দিনাজপুর — রফিকুল ইসলাম (২৭) — জামায়াত (পূর্বে বিএনপি)
৪৫. কুড়িগ্রাম — অন্নপূর্ণা দেবনাথ (২৮) — এনসিপি (পূর্বে জামায়াত)
৪৬. গাইবান্ধা — মাসুদুর রহমান মোল্লা (২৭) — এনসিপি (পূর্বে জামায়াত)
৪৭. নীলফামারী — মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান (২৫) — এনসিপি (পূর্বে জামায়াত)
৪৮. লালমনিরহাট — এইচ. এম. রকিব হায়দার (২৫) — এনসিপি (পূর্বে জামায়াত)
৪৯. ঠাকুরগাঁও — ইশরাত ফারজানা (২৫) — বিএনপি
৫০. পঞ্চগড় — কাজী মো. সায়েমুজ্জামান (২৮) — এনসিপি (পূর্বে জামায়াত)
বরিশাল বিভাগ
৫১. বরিশাল — খায়রুল আলম সুমন (২৯) — বিএনপি
৫২. পটুয়াখালী — ড. মো. শহীদ হোসেন চৌধুরী (২৫) — এনসিপি (পূর্বে বিএনপি)
৫৩. ভোলা — ডা. শামীম রহমান (২৯) — এনসিপি (পূর্বে বিএনপি)
৫৪. পিরোজপুর — আবু সাঈদ (২৮) — জামায়াত (পূর্বে বিএনপি)
৫৫. ঝালকাঠি — মো. মমিন উদ্দিন (২৭) — এনসিপি (পূর্বে জামায়াত)
৫৬. বরগুনা — তাছলিমা আক্তার (২৭) — জামায়াত
ময়মনসিংহ বিভাগ
৫৭. ময়মনসিংহ — মো. সাইফুর রহমান (২৮) — জামায়াত
৫৮. জামালপুর — মোহাম্মদ ইউসুফ আলী (২৭) — এনসিপি (পূর্বে সুশীল)
৫৯. নেত্রকোনা — মো. সাইফুর রহমান (২৮) — জামায়াত
৬০. শেরপুর — তরফদার মাহমুদুর রহমান (২৭) — জামায়াত
সিলেট বিভাগ
৬১. সিলেট — মো. সারওয়ার আলম (২৭) — জামায়াত
৬২. সুনামগঞ্জ — ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া (২৫) — এনসিপি (পূর্বে সুশীল)
৬৩. হবিগঞ্জ — আবু হাসনাত মো. আরেফীন (২৫) — জামায়াত
৬৪. মৌলভীবাজার — তৌহিদুজ্জামান পাভেল (২৮) — জামায়াত
প্রশাসনের এমন দলীয়করণ প্রসঙ্গে সাবেক এক মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ডিসিরা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, কোনো রাজনৈতিক দলের ক্যাডার নন। তাঁদের নামের পাশে দলীয় পরিচয় লেখা মানে প্রশাসনিক কাঠামোর ভাঙন। নির্বাচনের আগে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ইঙ্গিত।”
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নথি সত্য হলে তা দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের জন্য একটি স্পষ্ট অশনিসংকেত।





