শিরিন শারমিনের মুক্তি: একই কায়দায় মুক্ত হন সাবের হোসেন
তাদের নজিরবিহীন মুক্তিতে রাজনীতির মাঠে নানা কৌতূহল
শেখ হাসিনার খুবই আস্থাভাজন ভোটারবিহীন অবৈধ তিন সংসদের স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী নানা নাটকীয়তায় অবশেষে গ্রেফতার হলেও নজিরবিহীন প্রক্রিয়ায় জামিনে মুক্ত হয়েছেন। গ্রেফতারের সময় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলায় হত্যা চেষ্টার অভিযোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তার বিরুদ্ধে ৬টি মামলা ছিল। তবে লালবাগ থানার একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। আদালত তাকে কারাগারে নির্দেশ দেয়। মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় একই আদালত শিরিন শারমিন চৌধুরীকে জামিন প্রদান করে আজ রবিবার (১২ এপ্রিল) দুপুরে। বিকালেই কাশিমপুর মহিলা কারাগার থেকে মুক্ত হন সাবেক এ স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী। সকলেরই ধারনা ছিল তার বিরুদ্ধে থাকা ছয়টি মামলার অন্য গুলোতে হয়তো সেলিনা হায়াত আইডির মতই শৈন্ অ্যারেস্ট দেখানো হতে পারে। এরই মাঝে কঠোর গোপনীয়তায় তাকে কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি দেয়া হয়। সন্ধ্যার পর গণমাধ্যমকে জানানো হয় শিরিন শারমিন চৌধুরী জামিনে কারামুক্ত। ততক্ষণে গণমাধ্যম কর্মীরা কারামুক্তির কোন ফুটেজ বা কারো প্রতিক্রিয়া নিতে পারেনি। কারামুক্তির পর তিনি কোথায় গেছেন, কোন বাসায় উঠেছেন কারাই বা তারে জেল গেট থেকে রিসিভ করে- কোন খবরই পাওয়া সম্ভব হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একইভাবে রিমান্ডে থাকাকালীন নজিরবিহীন কায়দায় মাত্র দুই দিনেই জামিনে মুক্ত হন আওয়ামী লীগের সাবেক বন ও পরিবেশমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী। পাঁচ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী আলোচনায় ছিল রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ। সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদ, সাবেক স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী সাবেয়ার হোসেন চৌধুরী, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াত আইভিকে ঘিরে কথিত ডিপ স্টেট গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ছিল নানা তৎপরতা। ঘুরেফিরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা নিয়ে কখনো রিফান্ড, কখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, কখনো দেশের উন্নয়ন কখনো প্রজন্ম ৭১ নামে চেষ্টা করা হয় মূলধারা রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে সক্রিয় করা। সর্বশেষ জাতীয় সংসদে সন্ত্রাস দমন অধ্যাদেশ পাস করার সময় একই সাথে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় বিষয়টি আপাতত জনমনে ইতি ঘটেছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সাবেক স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেফতারের পুরোই আলোচনায় আছে রিফাইন্ড করার জন্যই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে গ্রেফতারের পর নজিরবিহীন কায়দায় যাবিনে মুক্ত হওয়ায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির মাঠে বিষয়টি নানাভাবে আলোচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক ময়দানের চলছে নানা কৌতুহলের আলোচনা। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে সংশোধনের নিষিদ্ধ হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীনতা আওয়ামী অনুসারীদের এক প্লাটফর্মে একত্রিত করার নানা কৌশল। আপাতত তারা অজ্ঞাত স্থানে নীরব থাকলেও বক্তৃতা বিবৃতি বা বিভিন্ন ইস্যুতে সামাজিক অনুষ্ঠানে চলাফেরা রয়েছে আইনি স্বাধীনতা। এমনকি আদালতের নির্দেশে তারা বৈধভাবে দেশ ও বিদেশে ভ্রমণের অধিকার অর্জন করতে পারে। শুরু থেকেই সাবেক স্পিকার শেখ হাসিনার খুবই আস্থাভাজন শিরিন শারমিন চৌধুরীকে নিয়েছিল নানা রহস্যজনক আলোচনা। সংসদ ভবনের বাংকার থেকে গভীর রাতে উদ্ধার করে নেয়া হয় সেনা হেফাজতে। সেখান থেকে আবার অজ্ঞাত স্থানে। অজ্ঞাতস্থান থেকে পদত্যাগ পত্র পেশ। এরপর আবার অজ্ঞাত স্থান থেকেই লাল পাসপোর্ট জমা দিয়ে সাধারণ পাসপোর্ট করার আবেদন ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রদান, সবই ছিল রহস্যময়। সর্বশেষ তার গ্রেফতার ও জামিনে মুক্তি নতুন রহস্যের তৈরি করেছে।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঘিরে দায়ের হওয়া রাজধানীর পল্টন থানার দুই মামলা এবং খিলগাঁও থানার চার মামলায় রিমান্ডের আদেশকালীন মাত্র দুই দিনেই জামিনে মুক্তি পেয়ে আলোচনায় আসেন সাবেক বন ও পরিবেশমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী। ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর বিকালে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আলাদা দুই আদালত এসব মামলায় তার জামিন মঞ্জুর করেন। এরপর সন্ধ্যা ৬টা ২৫ মিনিটে আদালতের হাজতখানা থেকে মুক্তি পান তিনি।
আরও পড়ুন: ভোজ্যতেলের দাম আপাতত বাড়ছে না: বাণিজ্যমন্ত্রী
পুলিশের অভিযানে বিএনপি কর্মী মকবুল নিহতের মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে থাকা সাবের হোসেন চৌধুরীকে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের উপ-পরিদর্শক নাজমুল হাসান আসামি সাবের হোসেনের রিমান্ড শেষ না করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন।
আবেদনে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে সাবের হোসেন চৌধুরী কোনো প্রশ্নেরই জবাব দিতে পারছেন না। কথোপকথনে জানা গেছে যে, তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ ও হৃদরোগে আক্রান্ত। তার হার্টে তিনটি রিং পরানো হয়েছে। বর্তমান শারীরিক পরিস্থিতিতে পুলিশ হেফাজতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আশানুরূপ তথ্য পাওয়া যাবে না। সে কারণে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পাঁচ দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ না করে আদালতে পাঠানো হলো। ভবিষ্যতে আসামির সুস্থতা সাপেক্ষে পুনরায় রিমান্ডের আবেদন করা হবে বলেও বলা হয়।
আরও পড়ুন: কুষ্টিয়ায় পীরের গ্রামে থমথমে পরিস্থিতি, কেউ গ্রেফতার নেই
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী তার জামিন চেয়ে শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে তার জামিনের বিরোধিতা করা হয়। শুনানি শেষে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করে আদেশ দেন।
এর আগে, খিলগাঁও থানার আলাদা চার মামলায় তার জামিন মঞ্জুর করেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান।
আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কীভাবে জামিনে মুক্তি পান, সে সময় এক সমাবেশে প্রশ্ন তুলেছিলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সাবের হোসেন চৌধুরী স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার গণহত্যার একজন সহযোগী ছিলেন। তাঁর নির্দেশে রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় ১১ জন গুম–খুনের শিকার হয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে এই এলাকার পাঁচজন শহীদ হয়েছেন। এর দায় তিনি এড়াতে পারেন না।
রাজধানীর খিলগাঁওয়ে গুম-খুন-শহীদ হওয়া পরিবারের সদস্যদের উদ্যোগে এক সমাবেশে সাবের হোসেন চৌধুরীর বিচারের দাবিতে তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
ঢাকা-৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরীকে ৬ অক্টোবর ২০২৫ রাজধানীর গুলশানের বাসা থেকে আটকের পর গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। দুইদিন পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পৃথক ছয় মামলায় জামিনে মুক্তি পান সাবের হোসেন চৌধুরী।
২৪ ঘণ্টার মধ্যে কীভাবে সাবের হোসেন চৌধুরীর মতো ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পান, সে প্রশ্ন তোলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রিজভী। তিনি বলেন, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান। এই সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন। তিনি আইন মন্ত্রণালয়ে থাকা অবস্থায় একজন হত্যা মামলার আসামি কীভাবে জামিন পান? তাহলে এই সরকার কাকে প্রোটেকশন দিচ্ছে?’
বিগত সরকারের সময় খিলগাঁও এলাকায় জুলুম-নিপীড়ন-নির্যাতনের ঘটনা তুলে ধরেন রিজভী। তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের সময় নির্যাতনে বিএনপি-ছাত্রদলের কতজন হাত-পা হারিয়েছেন। ছাত্রদল নেতা জনিকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ১৬টি গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। সাবের হোসেন চৌধুরী এর জন্য দায়ী নন কি?’
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব বলেন, শেখ হাসিনা গণহত্যা চালিয়েছেন। তাঁর সহযোগী ছিলেন সাবের হোসেন চৌধুরী। তিনি শেখ হাসিনার চেতনায় লালিত-পালিত। তাঁদের আমলে কেউ গণতন্ত্রের পক্ষে টুঁ শব্দটি করতে পারেনি। সাবের চৌধুরী বিনা ভোটে বছরের পর বছর সংসদ সদস্য থেকেছেন। বিএনপির পক্ষে, খালেদা জিয়ার পক্ষে, তারেক রহমানের পক্ষে কথা বলা যায়নি।
সাবের হোসেন চৌধুরী শেখ হাসিনার পক্ষে গুম-খুনের কর্মসূচি সফল করেছেন। এখন তিনি যদি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জামিনে মুক্তি পান, তাহলে যেসব পুলিশ ক্রসফায়ার দিয়েছে, বাসা থেকে তুলে নিয়ে আঙুলের নখ তুলে ফেলেছে, মাথায় বন্দুক রেখে গুলি করে হত্যা করেছে, তারা তো কয়েক দিনের মধ্যে ছাড়া পেয়ে যাবে। এর উত্তর কী দেবে অন্তর্বর্তী সরকার?





