রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি দিবস
ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা আর্তনাদ, আজও ন্যায়বিচারের অপেক্ষা
আজ ২৪ এপ্রিল। দেশের ইতিহাসে এক শোকাবহ দিনের নাম- রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি দিবস। ২০১৩ সালের এই দিনে সাভারের রানা প্লাজা ধসে মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় হাজারো জীবনের স্পন্দন। আটতলা ভবনের নিচে চাপা পড়ে নিভে যায় এক হাজারের বেশি প্রাণ, আহত হন দুই হাজারেরও বেশি মানুষ। সেই ভয়াবহতার স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের, আর শোক বয়ে বেড়ান নিহতদের স্বজনরা।
সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই। কাজের তাড়নায় গার্মেন্টসে ঢুকছিলেন শ্রমিকরা। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই কেঁপে ওঠে ভবনটি। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও কেউ কল্পনাও করতে পারেননি, সামনে অপেক্ষা করছে এমন এক বিপর্যয়। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ধসে পড়ে পুরো ভবন- চিৎকার, ধুলো আর মৃত্যুর বিভীষিকায় ঢেকে যায় চারপাশ।
আরও পড়ুন: বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয়করণ নয়, বহিরাগত প্রবেশে কড়াকড়ি: অর্থমন্ত্রী
একজন বেঁচে যাওয়া শ্রমিকের কণ্ঠে এখনো সেই দিনের আতঙ্ক, “হঠাৎ মনে হলো মাটি কাঁপছে। তারপর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরলে দেখি চারদিকে শুধু ধুলো আর মানুষের আর্তনাদ।”
আরেকজন জানান, “আমি দুই দিন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিলাম। পাশে মানুষ মরছিল, কেউ পানি চাইছিল, কেউ চিৎকার করছিল- কিন্তু কিছুই করার ছিল না।”
আরও পড়ুন: এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা বাতিলে মন্ত্রিসভার অনুমোদন
ধসে শুধু প্রাণই যায়নি, ভেঙে গেছে অসংখ্য পরিবার। কেউ হারিয়েছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে, কেউ আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। আহত শ্রমিক দেলোয়ার হোসেন বলেন, “আমার দুই পা ঠিকমতো কাজ করে না। আগে কাজ করে সংসার চালাতাম, এখন অন্যের সাহায্যে চলতে হয়।”
নিহতদের স্বজনদের কণ্ঠেও একই বেদনা। আবুল কালামের পরিবারের সদস্যরা বলেন, “আমাদের ভরসার মানুষটাকে হারিয়েছি। আজও পূর্ণ ক্ষতিপূরণ পাইনি, শুধু আশ্বাসই পেয়েছি।”
ধসের পরপরই শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম বড় উদ্ধার অভিযান। সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশসহ দেশি-বিদেশি উদ্ধারকারী দল দিন-রাত এক করে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ করে। অনেককে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও, অসংখ্য মানুষ আর ফিরে আসেননি।
এক উদ্ধারকর্মীর ভাষায়, “ভেতরে ঢুকলেই শুধু কান্নার শব্দ শোনা যেত। যতজনকে বাঁচানো গেছে, ততজনের জন্য লড়েছি- কিন্তু অনেকের কাছে পৌঁছাতে দেরি হয়ে গেছে।”
ঘটনার পর দেশে-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। শ্রমিক নিরাপত্তা, ভবন কাঠামো ও কারখানা পরিদর্শনে কিছু সংস্কার আনা হয়। বিভিন্ন সংস্থা ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ—এখনো অনেকেই ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাননি, বিচার প্রক্রিয়াও দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে।
ভুক্তভোগী নার্গিস আক্তারের পরিবারের সদস্যরা বলেন, “বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আমরা শুধু প্রতিশ্রুতি শুনে যাচ্ছি।”
শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাবে। তাদের ভাষায়, রানা প্লাজা ছিল অবহেলা ও দুর্নীতির নির্মম পরিণতি।
আজও ধসে পড়া সেই স্থানের দিকে তাকালে চোখে ভেসে ওঠে ভাঙা স্বপ্নের স্তূপ। অনেক শ্রমিক এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। কেউ শারীরিকভাবে অক্ষম, কেউ মানসিক ট্রমা বয়ে বেড়াচ্ছেন।
প্রতিবন্ধী শ্রমিক জাহানারা বলেন, “আমি এখন কাজ করতে পারি না। পরিবার চালানো কঠিন হয়ে গেছে। যদি স্থায়ী সহায়তা পেতাম, তাহলে হয়তো বাঁচতে পারতাম।”
প্রতিবছর এই দিনে শ্রমিক সংগঠন, মানবাধিকারকর্মী ও সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের দাবিতে একত্রিত হন। তাদের একটাই কথা- শুধু স্মরণ নয়, প্রয়োজন বাস্তব বিচার ও শ্রমিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।
এক শ্রমিক নেতার ভাষায়, “রানা প্লাজা শুধু দুর্ঘটনা নয়, এটি আমাদের ব্যর্থতার প্রতীক। দোষীদের শাস্তি না হলে এই শিক্ষা কখনো পূর্ণ হবে না।”
এক যুগ পেরিয়ে গেলেও রানা প্লাজার ক্ষত এখনো শুকায়নি। বেঁচে থাকা শ্রমিকদের কণ্ঠে আজও একই আকুতি- “আমরা সহানুভূতি চাই না, চাই ন্যায়বিচার।”





