‘সমকামিতা’ নিয়ে সমালোচনার ঝড়

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৫:১৯ অপরাহ্ন, ০৩ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৬:১২ অপরাহ্ন, ০৩ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলাবিধিতে কী আছে
  • ঢাবির দুটি ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক, ছাত্রসংগঠনগুলোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
  •  ‘নৈতিক স্থলনের’ জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে হল থেকে বহিষ্কারের ক্ষমতা প্রাধ্যক্ষের

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের একটি কক্ষে দুই বহিরাগত অতিথির বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এ ঘটনায় হল সংসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) ও ছাত্রশিবির কর্মী ইব্রাহীম খলিলের আবাসিক সিট সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়েছে এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের একটি কক্ষে দুজন অতিথির বিরুদ্ধে সমকামিতায় জড়ানোর অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এর আগে মাস্টারদা সূর্য সেন হলেও একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছিল। দুটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা, তদন্ত, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দেখা গেছে।

আরও পড়ুন: জেলা পরিষদের প্রশাসক ও চেয়ারম্যানদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করতে নতুন নির্দেশনা

প্রশ্ন উঠেছে, এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শৃঙ্খলাবিধিতে কী ধরনের শাস্তির কথা বলা আছে। ১৯৭৩ সালে প্রণীত ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ’ অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয়। এ আদেশ এবং হল-সংক্রান্ত বিধিতে সমকামিতাকে আলাদা করে কোনো ‘শৃঙ্খলাভঙ্গ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। নেই এ-সংক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট শাস্তির বিধানও।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ ধরনের সমস্যা অতীতে জোরালোভাবে সামনে আসেনি। তাই শৃঙ্খলাবিধিতে বিষয়টি উল্লেখ করার প্রয়োজন হয়নি। সমকামিতার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালায় আলাদা করে কোনো শাস্তির বিধান নেই। ভবিষ্যতে একটি নীতিমালা করা হবে।

আরও পড়ুন: বিরোধী দল শেখ হাসিনার মতো ভাষায় কথা বলছে: মির্জা ফখরুল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সাধারণত অসদাচরণ, শৃঙ্খলাভঙ্গ, ক্যাম্পাসের পরিবেশ বিনষ্ট কিংবা আবাসিক হলের নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে তদন্ত করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সতর্ক করা, হল থেকে বহিষ্কার, সাময়িক বা স্থায়ী বহিষ্কারসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সমকামিতার জন্য আলাদা করে লিখিত কোনো শাস্তির বিধান নেই।

ক্যাম্পাসে সংঘটিত কোনো ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিজস্ব বিধি ও তদন্তপ্রক্রিয়া অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সাধারণত অসদাচরণ, শৃঙ্খলাভঙ্গ, ক্যাম্পাসের পরিবেশ বিনষ্ট বা আবাসিক হলের নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে তদন্ত করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সতর্ক করা, হল থেকে বহিষ্কার, সাময়িক বা স্থায়ী বহিষ্কারসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সমকামিতার জন্য আলাদা করে লিখিত কোনো শাস্তির বিধান নেই।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় ‘প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে যেকোনো যৌন মিলনকে’ অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এর প্রয়োগ আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সমকামিতাকে ঘিরে প্রথম ঘটনাটি জানা যায় গত ৩০ জুলাই মাস্টারদা সূর্য সেন হলে। হল প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, একজন আবাসিক শিক্ষার্থী হলের একটি কক্ষে ‘সমকামিতার উদ্দেশ্যে’ বহিরাগত একজনকে নিয়ে আসেন। পরে ওই ব্যক্তিকে হলের শিক্ষার্থীরা ধরে ফেলেন। হল সংসদ ও হল কর্তৃপক্ষ দুজনকেই শাহবাগ থানায় সোপর্দ করে। এ ঘটনায় হলের ওই আবাসিক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাঁর হলের আসন তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হয়েছে। তাঁকে হল থেকে আজীবন বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

মাস্টারদা সূর্য সেন হলের প্রাধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিতে ‘নৈতিক স্থলনের’ জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে হল থেকে বহিষ্কার করার ক্ষমতা প্রাধ্যক্ষকে দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, সমকামিতার ঘটনা নৈতিক স্থলনের আওতায় পড়ে।

আরেকটি ঘটনা ঘটে গত ১ আগস্ট ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে। হল সংসদের সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) ও শিবির নেতা ইব্রাহীম খলিলের কক্ষে অবস্থান করা দুজন অতিথির বিরুদ্ধে সমকামিতায় জড়ানোর অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, ২৭ জুলাই এজিএস ইব্রাহীম খলিলের কক্ষে দুই তরুণ সমকামী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন এবং ক্ষমা চাইছেন।

পরে হল প্রশাসন এজিএস ইব্রাহীম খলিলের আবাসিক আসন সাময়িকভাবে বাতিল করে। ঘটনাটি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। হল প্রশাসন জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগের বিষয়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল সংসদের এজিএস ইব্রাহীম খলিল বলেন, ঘটনাটি তাঁর কক্ষে ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু আগে থেকে তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না।

অভিযোগের তদন্ত চলাকালে ২ আগস্ট সন্ধ্যায় শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষের কক্ষে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলেছে এবং দাবি করেছে, সংঘর্ষে তাদের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

দুই ঘটনার পর সমকামিতায় জড়িত হলে শাস্তি সুস্পষ্ট করতে নীতিমালা প্রণয়নের চিন্তা করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এবং সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেছেন, তাঁরা এ বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করছেন। বর্তমানে এ ধরনের অভিযোগ হল প্রশাসনের মাধ্যমে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উপাচার্য। তিনি বলেন, সমকামিতার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালায় আলাদা করে কোনো শাস্তির বিধান নেই। ভবিষ্যতে একটি নীতিমালা করা হবে।