বাংলাদেশে বিনিয়োগে ইতিবাচক বার্তা

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ২:০৭ পূর্বাহ্ন, ০২ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৩:০৫ পূর্বাহ্ন, ০২ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের আরও বেশি বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বিশেষ করে সয়াবিন, তুলা, গম এবং অন্যান্য কৃষিপণ্যের জন্য গুদাম বা ওয়্যারহাউস নির্মাণে মার্কিন বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এসব খাতে বিনিয়োগ হলে দেশের সরবরাহব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক হবে। গতকাল শনিবার সকালে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঢাকায় সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের গভীর আস্থা রয়েছে এবং তার নেতৃত্বে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। এর ইঙ্গিত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য বিদ্যমান ট্রাভেল অ্যাডভাইজরির ইতিবাচক সংশোধন করেছে। সার্জিও গর বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে যে, বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত। বৈঠকে আগামী মাসে ইউএস বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের একটি প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফর নিয়েও আলোচনা হয়। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন (এফডিএ)-এর সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সার্জিও গর আশ্বাস প্রদান করেন, বাংলাদেশে এফডিএ’র পরীক্ষাকার্য পুনরায় শুরু করার বিষয়ে তিনি সহায়তা করবেন। 

বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন কর্পোরেশন (ডিএফসি)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় হয়। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। এ বিষয়ে বিশেষ দূত জানান, বাংলাদেশে ডিএফসি’র বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারণে যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচকভাবে কাজ করবে। ঢাকায় মার্কিন বিনিয়োগকারীরা শিগগিরই একটি ইউএস ইনভেস্টর সামিট আয়োজন করতে আগ্রহী। তিনি এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে নিজে কাজ করছেন বলেও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতের বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশের বিশেষ আগ্রহের কথাও উল্লেখ করেন। এর প্রেক্ষিতে বিশেষ দূত গর বলেন, এ খাতে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ ভবিষ্যতে প্যাক্স সিলিকা উদ্যোগের অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। মার্কিন বিশেষ দূত বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সেমিকন্ডাক্টর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সরবরাহব্যবস্থা সুরক্ষিত করতে যুক্তরাষ্ট্র গত বছর ‘প্যাক্স সিলিকা’ নামে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তার একটি জোট গঠন করেছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশও এই উদ্যোগের একটি অংশীদার হতে পারে বলে তিনি জানান। এ বিষয়ে তিনি উদ্যোগ নেবেন বলে জানান। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তার আগের দিনের সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদান এবং মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ধন্যবাদ জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার অর্ধেকের বেশি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের অবদান থেকে আসে। এজন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সার্জিও গর বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত, টেকসই ও রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন। তিনি এ লক্ষ্যে আসিয়ান প্রতিবেশী দেশসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন ও রেহান আসিফ আসাদ, ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম এবং ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিসটেনসেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন: আগামী সপ্তাহেই বাংলাদেশে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ প্রতিষ্ঠানের ৪৫ শীর্ষ ব্যবসায়ী

বাংলাদেশ সফরে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিদলÑমাহ্দী আমিন: এদিকে, সার্জিও গরের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক শেষে এক ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন জানিয়েছেন, বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধান এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদারের লক্ষ্যে আগামী সপ্তাহের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির প্রায় ৪৫ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফরে আসবেন। এই ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবেন। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও তাদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। মাহ্দী আমিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলের সফর বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দু’দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও গভীর করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হবে। তিনি আরও বলেন, সকালে অনুষ্ঠিত আলোচনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের উপর দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। দেশটির প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরেছে এবং একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে।

গত পাঁচ মাসে সরকারের গৃহীত নীতি ও পদক্ষেপগুলোকে মার্কিন পক্ষ সাধুবাদ জানিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বহুমাত্রিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ককে একটি সুদৃঢ় অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ সরকারের উপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর (স্টেট ডিপার্টমেন্ট) থেকে যে ট্রাভেল অ্যাডভাইজারি করা হয়, তার বর্তমান অবস্থান মার্কিন বিনিয়োগকারী ও সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। এর মাধ্যমে মার্কিন উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে এসে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এক্সপ্লোর করতে পারবেন। এই সফরের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়বে এবং দেশে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থানীয় বিজনেস কমিউনিটির প্রথম সারির উদ্যোক্তা ও শিল্পপতিদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে বলেও জানান মাহদী আমিন। তিনি বলেন, বৈঠকে সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধান কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বিগত স্বৈরাচারী শাসনের কারণে রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং বাণিজ্য-বিনিয়োগ ক্ষেত্রে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, বর্তমান নির্বাচিত বিএনপি সরকার তা কাটিয়ে ওঠার নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা চালাচ্ছে। বৈঠকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি নিরসন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কর ও শুল্ক সংস্কার এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে (যেমন বেজা ও বিইপিজেডএ) বিনিয়োগের জটিলতা দূর করার তাগিদ দেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তাদের বক্তব্য মনোযোগসহকারে শোনেন এবং একটি ‘প্রো-বিজনেস’ ও ‘প্রো-ইনভেস্টমেন্ট’ পরিবেশ নিশ্চিতের আশ্বাস দেন। মাহ্দী আমিন বলেন, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য আরও দ্রুত ও সহজ করতে ব্যবসায়ী সমাজের প্রস্তাবের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দর এবং ঢাকা বিমানবন্দরসহ অন্যান্য বন্দরে কমার্শিয়াল অ্যাক্টিভিটি সচল রাখতে ২৪/৭ সেবা প্রদানের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে দ্রুত নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র পুনর্ব্যক্ত করেন যে, দেশের বিশাল ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা তরুণ সমাজকে দক্ষ ও আত্মকর্মসংস্থানে উপযোগী করে গড়ে তোলাই এই সরকারের মূল লক্ষ্য। ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’- এই নীতিকে ধারণ করে জনবান্ধব বাজেট ও নীতিমালার সফল বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি এবং সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক।

আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একগুচ্ছ বার্তা