সন্দেহের ‘বিচার’ এখন মৃত্যুদণ্ড!

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:২০ অপরাহ্ন, ১৫ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৮:২০ অপরাহ্ন, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

অপরাধের অভিযোগের বিচার আদালতে হওয়ার কথা। তদন্ত করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই করবে আদালত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হবে। কিন্তু সেই সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সন্দেহের বশে মানুষকে ধরে মারধর, নির্যাতন এমনকি হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। শনিবারই জামালপুর ও জয়পুরহাটে ‘চোর’ বা অপরাধী সন্দেহে গণপিটুনির পৃথক ঘটনায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও তিনজন।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে গণপিটুনিতে ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে ৫০, খুলনায় ১৭, রাজশাহীতে ১২, রংপুরে ৫, সিলেটে ৩১, চট্টগ্রামে ১০, বরিশালে ৯ এবং ময়মনসিংহে ০ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে সংগঠনটি। 

আরও পড়ুন: লোডশেডিংয়ের জন্য দেশবাসীর কাছে প্রধানমন্ত্রীর দুঃখপ্রকাশ

অর্থাৎ চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে গড়ে প্রতি দুই দিনে একজনের বেশি মানুষ গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন। গত বছরও পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ—আসকের হিসাবে ২০২৫ সালে গণপিটুনিতে ১৯৮ জন নিহত হন। 

এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে শনিবারের দুটি ঘটনা যোগ করে প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্রের আইন, আদালত ও বিচারব্যবস্থার বাইরে ‘জনতার আদালত’ কি ধীরে ধীরে একটি ভয়ংকর সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে?

আরও পড়ুন: নবম পে স্কেলের খসড়া প্রায় চূড়ান্ত, সর্বোচ্চ ১০০% বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব

যমুনার চরে ‘জাল চোর’ সন্দেহে প্রাণ গেল নুর মোহাম্মদের: 

জামালপুরের ইসলামপুরে যমুনা নদীতে জাল চুরির সন্দেহে তিনজনকে ধাওয়া করে মারধরের ঘটনায় নুর মোহাম্মদ (৫০) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও দুজন।

শনিবার দুপুরে উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের বরুল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত নুর মোহাম্মদ গাইবান্ধা সদর উপজেলার কুন্দেরপাড়া গ্রামের ময়েন শেখের ছেলে। আহতরা হলেন গাইবান্ধার বাটিকামারি এলাকার জাহাঙ্গীর (৪০) এবং জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের বরখাল গ্রামের রফিকুল (৩৫)।

পুলিশ জানায়, একটি ছোট নৌকায় করে তিনজন যমুনার বরুল এলাকায় গেলে স্থানীয় জেলেদের সন্দেহ হয়। এরপর তাদের ধাওয়া করা হয়। একপর্যায়ে তারা গুঠাইল এলাকায় পৌঁছালে সেখানকার জেলেরাও তাদের পিছু নেন। পরে উলিয়া এলাকায় স্থানীয় লোকজন তিনজনকে ধরে ফেলেন।

সেখানে তাদের মারধর করা হলে ঘটনাস্থলেই নুর মোহাম্মদের মৃত্যু হয় বলে পুলিশের ভাষ্য। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ এবং আহত দুজনকে উদ্ধার করে ইসলামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায়।

ইসলামপুর থানার ওসি মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, ঘটনায় একজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

তবে নুর মোহাম্মদ সত্যিই জাল চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না, তা এখনো তদন্তের বিষয়। সন্দেহ আর অপরাধ প্রমাণ—দুটিকে এক করে ফেলার সুযোগ নেই।

জয়পুরহাটে ‘চোর’ সন্দেহে দুই তরুণ, প্রাণ গেল বাদশার: 

একই দিনে জয়পুরহাটের ক্ষেতলালেও ‘চোর’ সন্দেহে দুই তরুণকে মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এতে লাল বাদশা (১৮) নামে এক তরুণ নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে তার বন্ধু মাইদুলকে (১৮)।

শনিবার সকালে উপজেলার মামুদপুর ইউনিয়নের মহব্বতপুর পদ্মপুকুর এলাকায় মাঠের পাশে দুজনকে পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বাদশাকে মৃত এবং মাইদুলকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে। মাইদুলকে ক্ষেতলাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। বাদশার মরদেহ পাঠানো হয়েছে ময়নাতদন্তের জন্য।

নিহত বাদশা আলমপুর ইউনিয়নের আদর্শ পাড়া গ্রামের জামাল হোসেনের ছেলে। মাইদুল একই এলাকার ইব্রাহিম হোসেনের ছেলে। তারা দুজন বন্ধু বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

মাইদুল পুলিশকে জানিয়েছেন, জামালগঞ্জ চারমাথা এলাকার একটি তেলের পাম্পের কাছ থেকে কয়েকজন তাদের ডেকে একটি বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তাদের মারধর ও নির্যাতন করা হয়। পরে মাঠের পাশে তাদের ফেলে রাখা হয়। অভিযুক্তদের সামনে পেলে তিনি চিনতে পারবেন বলেও পুলিশকে জানিয়েছেন তিনি।

তবে তাদের নাম-পরিচয় বা ঠিকানা জানেন না মাইদুল।

দুর্বল দুই তরুণই কি সহিংসতার সহজ শিকার?

স্থানীয় সূত্রের দাবি, নিহত লাল বাদশা শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় ভুগতেন এবং তার দৃষ্টিশক্তিও কম ছিল। মাইদুলেরও কিছুটা মানসিক সমস্যা রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

এ তথ্য সঠিক হলে প্রশ্ন আরও গুরুতর—অভিযোগের সত্যতা যাচাই তো দূরের কথা, শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল দুই তরুণকে কীভাবে একটি দল ধরে নিয়ে নির্যাতন করার সুযোগ পেল?

ক্ষেতলাল থানার ওসি (তদন্ত) মো. আব্দুল করিম জানান, ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে একজনকে মৃত ও একজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় পায়। আহত যুবক ও স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তারা একটি ফিলিং স্টেশনে চুরির চেষ্টা করছিলেন। এরপর উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে বাদশার মৃত্যু এবং মাইদুল আহত হন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

তবে চুরির অভিযোগের সত্যতা এবং গণপিটুনিতে কারা জড়িত—দুটিই তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।

বিচারের বদলে পিটিয়ে হত্যা—কেন থামছে না 

আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে গণপিটুনিতে ১৯৮ জন নিহত হন। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুলাইতেই ১৩৪ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। 

এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার পরিসংখ্যান নয়; এটি আইনের শাসনের জন্য একটি গভীর সতর্কবার্তা।

কারও বিরুদ্ধে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, জাল চুরি কিংবা অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠতেই পারে। কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আটক করে শারীরিক নির্যাতন বা হত্যা করার ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি, স্থানীয় গোষ্ঠী কিংবা জনতার নেই।

অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী নন, যতক্ষণ না আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় তার অপরাধ প্রমাণিত হচ্ছে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অপরাধ দমনের দায়িত্ব রাষ্ট্রীয়:  আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এবং বিচার করার ক্ষমতা স্বাধীন আদালতের। জনতার হাতে সেই ক্ষমতা তুলে দিলে আজ একজন কথিত চোর সন্দেহে মারা যাবেন, কাল ব্যক্তিগত শত্রুতা বা গুজবের শিকার হতে পারেন নিরপরাধ অন্য কেউ।

গণপিটুনির নামে আইনের শাসনের অবসান নয়

গণপিটুনির ঘটনাগুলোতে প্রায়ই দেখা যায়—কেউ ‘চোর’, কেউ ‘ডাকাত’, কেউ ‘অপহরণকারী’—এমন গুজব বা সন্দেহ ছড়িয়ে পড়ার পর মুহূর্তের মধ্যে একটি উত্তেজিত জনতা তৈরি হয়। এরপর তদন্তের সুযোগ না দিয়েই শুরু হয় মারধর।

এ ধরনের ঘটনায় অনেক সময় প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হওয়ার আগেই একজন মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। ফলে একই সঙ্গে দুটি অপরাধ ঘটে—একদিকে একজন মানুষের জীবন ও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়, অন্যদিকে প্রকৃত অপরাধীও তদন্ত ও বিচারের আওতার বাইরে থেকে যেতে পারে।

মানবাধিকার সংগঠন আসকও গণপিটুনিকে নিয়মিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি পৃথক শ্রেণি হিসেবে নথিভুক্ত করে আসছে। চলতি বছরের এপ্রিলেই সংগঠনটির অনুসন্ধানে গণপিটুনিতে হত্যার পাঁচটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। 

রাষ্ট্রের সামনে কঠিন প্রশ্ন

জামালপুরের নুর মোহাম্মদ এবং জয়পুরহাটের লাল বাদশার মৃত্যু তাই শুধু দুটি জেলার বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একই দিনে দুটি জেলায় একই ধরনের অভিযোগে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ ও নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে—

কেন মানুষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অভিযুক্তকে তুলে না দিয়ে নিজেরাই ‘শাস্তি’ দেওয়ার সাহস পাচ্ছে?

কেন একটি অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে?

গণপিটুনিতে হত্যার প্রতিটি ঘটনায় কি জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে?

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—একজন মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের; সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা কি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায়?

অভিযোগের বিচার আদালতে, রাস্তায় নয়

জামালপুর ও জয়পুরহাটের দুটি ঘটনায়ই এখন নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। নুর মোহাম্মদ সত্যিই জাল চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না, কারা তাকে ও অন্য দুজনকে মারধর করেছে, আর জয়পুরহাটে বাদশা ও মাইদুলকে কারা ধরে নিয়ে নির্যাতন করেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে হবে।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, আহত ব্যক্তিদের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, ঘটনাস্থলের তথ্য ও সম্ভাব্য ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শুধু সরাসরি মারধরকারীদের নয়, যারা হামলায় নেতৃত্ব, উসকানি বা সহযোগিতা করেছে তাদের ভূমিকাও তদন্তে আনতে হবে।

কারণ গণপিটুনিতে মৃত্যু কোনো ‘দুর্ঘটনা’ নয়—যদি কারও হামলায় একজন মানুষের মৃত্যু ঘটে, তবে তার দায় নির্ধারণ ও বিচার করা রাষ্ট্রের আইনি দায়িত্ব।

জনতার হাতে বিচার বন্ধে কঠোর রাষ্ট্রীয় বার্তা জরুরি

অপরাধ দমন করতে হলে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর করতে হবে, জনগণকে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার বিষয়ে সচেতন করতে হবে এবং গণপিটুনির প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার শুধু নিরপরাধ মানুষের জন্য নয়—অভিযুক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ন্যায়বিচারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো, রাষ্ট্র এমন ব্যক্তির অধিকারও রক্ষা করবে যার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

নুর মোহাম্মদ ও লাল বাদশার মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিচার তাই শুধু দুটি পরিবারের দাবি নয়; এটি আইনের শাসনের প্রশ্ন।

আজ যদি ‘সন্দেহ’ একজন মানুষের জীবন নেওয়ার বৈধ অজুহাত হয়ে যায়, তাহলে আগামীকাল কোনো নাগরিকই নিরাপদ থাকবেন না।

রাষ্ট্রের কাজ জনতার হাতে বিচার তুলে দেওয়া নয়—জনতার জীবন, অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।