যে আগুন কবিতা আর গিটারে এক হয়ে জ্বলেছিল

Sanchoy Biswas
মবিনুল ইসলাম রাশা, গবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:৫৮ অপরাহ্ন, ০৮ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১০:১৬ অপরাহ্ন, ০৮ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ষাট (১৯৬০)-এর দশকের শুরু। দেশভাগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, রিফিউজি সংকট আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে যে হতাশা জমা হয়েছিল, তার আঁচ এসে পড়েছিল বাংলা সাহিত্যেও।

১৯৬১ সাল, কলকাতার এক স্যাঁতসেঁতে গলি। কয়েকটা ফুটপাত পার হয়ে রাজপথে নেমে এলেন একদল উসকোখুসকো চেহারার তরুণ। তারা রাজপথে নেমে এলেন কোনো রাজনৈতিক মিছিলের জন্য নয়, বরং জং ধরে যাওয়া সমাজ ব্যবস্থার মুখে সশব্দে চড় মারার জন্য। মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়দের 'হাংরি জেনারেশন' তথাকথিত আভিজাত্য আর সাহিত্যিক ভণ্ডামির ওপর ছিটিয়ে দিল একবুক ক্ষোভ। রাজবাড়ির রাজকীয় ভোজ আর তথাকথিত সুশীল সমাজের ড্রয়িংরুম লক্ষ্য করে তারা ছুঁড়ে মারছেন পশুর মুখোশ, আর সস্তা ডেমি কাগজে ছাপা ইশতেহার।

আরও পড়ুন: অপু-বুবলী আমার জীবনের অংশ, তবে তাদের নিয়ে কিছু বলতে চাই না: শাকিব খান

১৯৯০-এর দশকের সূচনা। কোল্ড ওয়ার শেষ, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা তরুণদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এক ঝলমলে ভবিষ্যৎ, নান্দনিক সংস্কৃতি আর প্রযুক্তির আলো। কিন্তু বাস্তবতায় তরুণদের হাতে পৌঁছেছিল শুধুই ফাঁকা বুলি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা আর যান্ত্রিক জীবনের একাকীত্ব। 

হাংরি আন্দোলনের ঠিক ৩০ বছর পরে ,১৯৯১  সাল। আমেরিকার সিঅ্যাটল শহরের এক ঝাপসা গ্যারেজ। ছেঁড়া জিন্স আর ওভারসাইজ সোয়েটার পরা এক বিষণ্ণ ছেলে তার গিটারে একটা প্লাগ ইন করলো এমপ্লিফায়ারে ।একটু পরেই স্পিকার চুরমার করে বিকট শব্দে বেজে উঠলো ৪-কর্ডের এক মারাত্মক ডিস্টোর্শন রিফ-“Smells Like Teen Spirit'। কার্ট কোবেইন এই গানটিতে কোনো রাজনৈতিক ইশতেহার দেননি, বরং তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন অসংলগ্নতা। গানটি ছিলো সমাজ, সিস্টেম বা পারিবারিক প্রত্যাশার বিরুদ্ধে দাড়ানো তরুণদের অবাধ্যতার গল্প। তরুণদের মাথার ওপর চাপিয়ে দেওয়া 'পারফেক্ট লাইফ'-এর ধারণাকে এই গানটা এক ধাক্কায় চুরমার করে দিয়েছিল।

আরও পড়ুন: জানা গেল সালমান খানের ভাইরাল ভিডিওর আসল রহস্য

দুইটা ভিন্ন মহাদেশ, দুইটা ভিন্ন প্রজন্ম, প্রকাশের মাধ্যমটাও ভিন্ন কিম্তু দুজনের বুকের ভেতর ধিকধিক করে জ্বলছে একই আগুন।। কলকাতা আর সিঅ্যাটলকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছিল একটা অদৃশ্য সুতো: জংধরা সমাজব্যবস্থা আর তার ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের খাঁটি, অকৃত্রিম ক্ষোভ। 

মলয় রায়চৌধুরীরা যখন বলছিলো ‘ক্ষুদা’ তা ছিলো সিস্টেমের পচে যাওয়া আত্মিক ক্ষুদা। আর কার্ট যখন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলছিলো ‘ teen spirit’  তা ছিলো পুঁজিবাদ ও ফাঁদে আটকে যাওয়া লাখো তরুণের কান্নার চিৎকার । তারা দুজনেই সাজানো সৌন্দর্যের গালে সশব্দে চড় মেরেছিলেন।" আন্দোলনের কবিরা যেমন অভিজাত সাহিত্যিকদের ক্লাবে পশুর মুখোশ বা কাটা পেঁয়াজ পাঠিয়ে ঠিক তেমনি কোবেইন তাঁর ভাঙা গিটার আর নোংরা সোয়েটার পরে গানে গানে বলছিলেন, ‘তোমাদের চকচকে পপ মিউজিক একটা মিথ্যা।’ 

কার্ট কোবেইন যে ক্ষোভ ছিলো-চিৎকার করে ক্যাসেটের ফিতায় বন্দি করেছিলেন, তার ঠিক তিন দশক আগেই কলকাতার রাস্তায় সেই একই ক্ষোভ রাজপথে হাঁটিয়েছিল মলয় রায়চৌধুরী কিংবা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের হাংরি আন্দোলনকে। গিটার আর কবিতার খাতা , পার্থক্য ছিলো শুধু অনুষঙ্গে। কিন্তু তাদের রক্তে বহমান আগুন ছিলো একই। মলয় রায়চৌধুরীরা যদি ৯০-এর সিঅ্যাটলে থাকতেন, তবে কবিতা না লিখে হয়তো হাতে তুলে নিতেন ডিস্টোর্শন অ্যাম্পলিফাযার কিংবা কুবেইন কলকাতাতে থাকলে নামতেন রাজপথে, কবিতাতে আনতেন একদম

নিরেট , আনফিল্টারেড রাস্তার ভাষা সুশীলদের মুখের উপর ছুড়ে মারতেন ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিন ছুতার।’ দুইজনের সুর আলাদ হতে পারে কিন্তু লক্ষ্য ছিলো একটায়, তরুণদের বুকে চাপিয়ে দেওয়া শীতল নিস্তব্ধতাকে এক বিস্ফোরণে চুরমার করে দেওয়া। 

হাংরি আন্দোলনের কবিদের জীবন এবং কার্ট কোবেইনের জীবন—দুটোই ছিল তীব্র ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া এক আত্মঘাতী ট্র্যাজেডি। সমাজ বা বাণিজ্যিক ব্যবস্থার কাছে মাথা নোয়ানোর চেয়ে নিজেদের জ্বালিয়ে দেওয়াকেই তারা বেছে নিয়েছিলেন। কার্ট কোবেইন যে পুঁজিবাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিকে সজোরে চড় মারার জন্য হাতে গিটার তুলে করেছিলেন সুরের প্রতিবাদ, যে পুঁজিবাদকে তিনি ঘৃণা করতেন, সেই বাজারই তাঁর গান বিক্রি করে বিলিয়ন ডলার কামাতে লাগলো। এই ট্র্যাজেডি কোবেইনকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিয়েছিলো। একদিন নিজগৃহে নিজে রিভলবার ঠেকিয়ে মাত্র ২৭ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন। অন্যদিকে মলয় রায়চৌধুরীদের উন্মাদনা সমাজকে এতটায় নাড়িয়ে দিয়েছিলো যে ১৯৬৪ সালে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে কাঠগড়াতে দাঁড় করান।

‘হাংরি টিন স্পিরিট’ কোনো সময়ের ফ্রেমে বন্দি নয়, জংধরা সমাজের বিরুদ্ধে এইটা অনাদিকালের এক ইশতেহার। আজকের ট্রেন্ড আর মিমস জেনারেশনের কেউ কোথাও কোনো অসঙ্গতি দেখলে  ৪ কর্ডের ডিসটরশান কিংবা হাংরি ইশতেহার  তার মনের অবাধ্যতাকে জাগিয়ে তুলবে।