১৫ দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতির আশা প্রতিমন্ত্রী অমিতের

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ৮:১৪ অপরাহ্ন, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৯:৩১ অপরাহ্ন, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সংকট মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

বুধবার জাতীয় সংসদে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের বিরোধী দলীয় সদস্য মো. নুরুল ইসলামের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

আরও পড়ুন: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাড়ছে এলএনজি আমদানি ও সরবরাহ: প্রধানমন্ত্রী

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের মানুষ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে দুর্ভোগে রয়েছে। এই পরিস্থিতির প্রকৃত কারণ আড়াল না করে সরকার জনগণকে বাস্তব তথ্য জানাতে চায়। দীর্ঘদিনের ভুল নীতি এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবেই বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্র পুরো সক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন।

আরও পড়ুন: বিমানবন্দরের অগ্নি নিরাপত্তা জোরদারে বেবিচকের ১৫ কর্মীর বিশেষ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন

বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে দৈনিক ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। তবে পুরো গ্যাস বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করলে শিল্প ও গৃহস্থালি খাতে সরবরাহে সংকট তৈরি হবে। তাই বিদ্যুৎ, শিল্প ও গৃহস্থালি—তিন খাতের মধ্যে ভারসাম্য রেখে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, কারিগরি ত্রুটির কারণে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ইউনিট বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। একই ক্ষমতার মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ আছে।

এই দুটি ইউনিট দ্রুত পূর্ণ ক্ষমতায় চালুর জন্য সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি। ইউনিট দুটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে এবং চলমান সংকট মোকাবিলায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংসদে আদানির সঙ্গে বিগত সরকারের করা বিদ্যুৎ চুক্তির বিষয়টিও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, চুক্তি অনুযায়ী ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে দিনের বেলায় প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।

আমদানি করা এলএনজি সরবরাহে ব্যবহৃত দুটি এফএসআরইউর (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) একটিতে গত ২১ জুলাই ত্রুটি দেখা দেয়। এটি মেরামতে প্রায় ২১ থেকে ২২ দিন সময় লাগে। এর ফলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় ৮৮ শতাংশ স্বাভাবিক হয়েছে। আগামী মাসের শুরুতেই সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি শিল্প ও গৃহস্থালি গ্রাহকরাও প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাবেন। এর ফলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে।

তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর সিদ্ধান্তের কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসব কেন্দ্র থেকে ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা সম্ভব নয়। কারণ ফার্নেস অয়েলভিত্তিক অধিকাংশ কেন্দ্র পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট হিসেবে নির্মিত। এসব কেন্দ্র একটানা চালানো যায় না এবং সর্বোচ্চ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালনা করা সম্ভব।

তাই এসব কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব বলে জানান তিনি। বর্তমানে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।

ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে সরকারের প্রায় ৪৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে বলে সংসদে জানান প্রতিমন্ত্রী। বিগত সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের পুঞ্জীভূত বকেয়ার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এই অর্থ পরিশোধ করা হলে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য রাত ৮টার মধ্যে বিপণিবিতান ও দোকানপাট বন্ধ রাখার সরকারি উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তবে মাঠপর্যায়ে এই নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নির্দেশনাটি কার্যকর করতে নিজ নিজ এলাকায় সংসদ সদস্যদের সহযোগিতা চান প্রতিমন্ত্রী।

মধ্যমেয়াদে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় রুফটপ সোলারকে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। আগামী গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমকে সামনে রেখে সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় উদ্যোক্তারা এসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করবেন এবং উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবেন। উৎপাদন ব্যয় সর্বোচ্চ ৮ টাকা হতে পারে বলে সরকারের হিসাবের কথা জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা রুফটপ সোলার স্থাপন করবেন, তারা তিন বছর পর্যন্ত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করে বিনিয়োগের বড় অংশ তুলে নিতে পারবেন। পাশাপাশি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে কাস্টমস ডিউটি ও ভ্যাটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সোলার প্যানেল আমদানিকারকদের জন্যও বিশেষ সুবিধা দিতে এসআরও জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

গত দেড় যুগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভুল নীতি এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবকে বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হলেও সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায়ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হয়নি। ফলে অনেক সময় আবহাওয়াজনিত কোনো কারণ ছাড়াই গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে।

জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য না থাকা এবং নির্দিষ্ট কিছু ভৌগোলিক এলাকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণেও সংকট আরও বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এর আগে সম্পূরক প্রশ্নে সংসদ সদস্য মো. নুরুল ইসলাম বলেন, তার নির্বাচনী এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। গত ৯ আগস্ট দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ এবং ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কতদিনে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে, তা জানতে চান তিনি।

জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগস্ট মাসে জনগণ যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, অন্তত সেপ্টেম্বর মাসে যাতে তার পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট অস্বস্তিকর হলেও জনগণকে প্রকৃত তথ্য জানানো সরকারের দায়িত্ব। সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং দ্রুতই এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।