রাজনৈতিক সরকারের সময়ও মব থামছে না কেন, নেপথ্যে কী?
দেশে একের পর এক ঘটে চলেছে দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা বা মবের ঘটনা। কখনও ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রকাশ্যে করা হচ্ছে খুন, তো কখনও ব্যক্তিস্বার্থে গুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে আস্ত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র।
সবশেষ ফেসবুকে লাইভ করে দফায় দফায় মারধরের ঘটনায় সাতক্ষীরার শামীমের মৃত্যু ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে, যেখানে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে।
আরও পড়ুন: টানা পাঁচ দিনের ছুটিতে বাড়ির দিকে ছুটছে মানুষ
এর কয়েকদিন আগেই রাজধানীর এক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় সামনে আসে বিএনপি থেকে নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যের নাম।
এছাড়া ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয়, আদালতেও একের পর মবের ঘটনা হয়েছে গণমাধ্যমের শিরোনাম।
আরও পড়ুন: রংপুরের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের ১৭ই অক্টোবর পর্যন্ত ৫৩৭টি মবের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় মারা গেছেন ২৫৬ জন আর আহত হয়েছেন ৫৭৫ জন।
সংগঠনটি বলছে, গত বছর মবের এই সংখ্যা ছিল ৪২৮টি আর ২০২৪ সালে ছিল ১৬৯টি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মবের ঘটনা প্রকট হয়ে ওঠে। নির্বাচিত সরকারের সময় তা কমে আসবে মনে করা হলেও এখনও তাতে লাগাম টানা যাচ্ছে না। বরং মব একটি রাজনৈতিক চেহারা পাচ্ছে বলেই মত মানবাধিকারকর্মীদের।
তারা বলছেন, সম্পত্তি দখল থেকে শুরু করে, ধর্ম অবমাননার মতো নানা কারণে ঘটছে এসব মবের ঘটনা, যেখানে আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিযোগ উঠছে সরকার ও বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, সম্পত্তি দখলের জন্য মব তৈরির ঘটনাগুলোতে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতা দেখা যায়।
অন্যদিকে ধর্মকে কেন্দ্র করে মব সৃষ্টির ঘটনায় প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সম্পৃক্তার বিষয়টি সংগঠনটির মনিটরিং রিপোর্টে উঠে এসেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
যদিও এমন দাবি অস্বীকার করছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। তারা বলছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরকারের। একইসাথে যেকোনো ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীকে 'দায়ী করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে' বলেও বলছে দলটি।
এদিকে সরকারের দিক থেকে বারবারই মব ঠেকানোর হুঁশিয়ারি দেয়া হলেও কার্যত তার কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে, সেই প্রশ্ন রয়েছে।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, যেকোনো ঘটনায় সরকারের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়ার কারণে মবের সংখ্যা কমে আসছে।
মব সহিংসতার রাজনৈতিক রূপ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ই বাংলাদেশে মবের ঘটনা মারাত্মক রূপ নেয়। এসময় মব তৈরি করে বিভিন্ন রাজনৈতিক স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়া থেকে শুরু করে কবর থেকে লাশ তুলে পোড়ানোসহ নানা ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখা গিয়েছিল।
অনেকেই আশা করেছিলেন, নির্বাচিত সরকার আসার পর বদলাবে সেই দৃশ্যপট। পরিসংখ্যান বলছে, সেই আশায় গুঁড়ে বালি।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, এবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মব সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৭১ জন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২৮ আর গত বছর ছিল ১৯৮ জন।
অর্থাৎ মবতো বন্ধ হয়ইনি, কখনও কখনও বেড়েছে সেই প্রবণতা।
আর তার কারণ হিসেবে সামনে আসছে, মবের ঘটনায় সরকার ও বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি।
এনিয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি – এইচআরএসএস'র নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশনা বা দলের সিদ্ধান্তে মবের ঘটনা ঘটার কোনো তথ্য সংগঠনটির কাছে না থাকলেও এসব ঘটনায় কোনো না কোনো রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থক সংশ্লিষ্টতা কম বেশি দেখা গেছে।
"কোনো একটা নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠী করছে, এরকম নয়। বলা যায় সব ঘরানারই সমর্থক বা লোকজন এখানে যুক্ত আছে", বলেন তিনি।
তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কথা আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান। সম্পত্তি দখল ও ধর্ম সংক্রান্ত মবে আলাদা আলাদা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার কথা বলেন।
সম্পত্তি দখলের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি, আর ধর্ম অবমাননার অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার প্যাটার্ন দেখা গেছে উল্লেখ করেন তিনি।
"আমাদের মনিটরিং রিপোর্ট বলে তৌহিদি জনতার নামে মূলত জামায়াত এগুলো করে। জামায়াতের মদদপুষ্ট কিছু কিছু এনসিপির লোকও এতে আছে। যাদের অনেকেই মাদ্রাসায় চাকরি করে কিন্তু ব্যাকগ্রাউন্ডটা হলো শিবির অথবা জামায়াত"।
সেকারণেই মবের ঘটনায় বিরোধী দলকে যথেষ্ট প্রতিক্রিয়া দিতে দেখা যায় না বলে মন্তব্য করেন মি. সাইদুর রহমান। বলেন, "এগুলো নিয়ে জামায়াত কোনো কথা বলে না। কোনো প্রেস রিলিজও দেয় না, প্রেস কনফারেন্সও করে না। কোনো ঘৃণাও প্রকাশ করে না, থামানোর জন্য সরকারকে বলে না, নিজেরাও থামায় না"।
"জামায়াত আর মবের উত্থান একসাথে ঘটেছে" বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যদিও এমন দাবি অস্বীকার করছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ দাবি করেন, অনেক বিবৃতির মাধ্যমে দলটি মবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে।
"এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব কার? রাষ্ট্রের। পুলিশ আছে, এখানে গোয়েন্দা সংস্থা আছে, তৎপরতা রাখার অনেক এজেন্সি আছে। প্রশ্ন এখানেই, তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে মব সন্ত্রাস হচ্ছে বা বেআইনি কাজ হচ্ছে, সেটা কীভাবে হচ্ছে? সরকারের মেশিনারিজ তাহলে কাজ করছে না?", বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
এছাড়া এধরনের ঘটনাগুলোতে জামায়াতকে দায়ী করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন মি. আকন্দ। একইসাথে দলটির নেতাকর্মীদের মবের ঘটনায় বিরত না রাখতে পারলে "বহু ঘটনা বাংলাদেশে ঘটে যেত" বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
"এটা অনেকটা মাত্রায় কম আছে, কারণ জামায়াত এটাতে যুক্ত না"।
মব সহিংসতা থামানো যাচ্ছে না কেন?
সরকার গঠনর পর থেকেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীতো বটেই, সরকারের একাধিক কর্তা-ব্যক্তি প্রায় নিয়মিতই মবের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তব চিত্রে তার খুব বেশি প্রতিফলন দেখা যায়নি।
মবের ঘটনা থামাতে না পারার তিনটি কারণ রয়েছে বলে মনে করেন মি. সাইদুর রহমান। তার মতে, প্রথমত সরকার বিরোধী দলকে চটাতে চায় না, দ্বিতীয়ত পুলিশের ভয় এখনও ভাঙেনি আর তৃতীয়ত স্থানীয় প্রশাসন সক্রিয় না হওয়া।
অন্যদিকে ইজাজুল ইসলামের মতে, নেতৃস্থানীয়রা মবের ঘটনা মেনে নিচ্ছে না দাবি করলেও স্থানীয় পর্যায়ে তাদের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে খুব বেশি পদক্ষেপ নিচ্ছে, তেমনটাও দেখা যাচ্ছে না। "এখানে অবশ্যই সকল দলেরই আমার মনে হয় ঘাটতি আছে"।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, মবের ঘটনা বন্ধের একমাত্র উপায় বিচার নিশ্চিত করা।
"যারা (মব) করে তাদের নামে মামলা দিতে হবে। বিচার করতে হবে। উল্টা যার ওপর মব হয়, তাদের নামেরই মামলা দেয়। এখনও তাই হচ্ছে, আগেও হইছে", বলেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান।
একইসাথে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে প্রশাসনকে পুনরায় সক্রিয় করার মাধ্যমে মব বন্ধ করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকার কী বলছে?
বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী মবের ঘটনা বাড়লেও তার সঙ্গে একমত নন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সরকারের নথিভুক্ত মবের ঘটনার উল্লেখ করে সময়ের সঙ্গে তা কমে এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মি. আহমদ বলেন, "বিগত সময়ের তুলনায় ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কম্পেরাটিভ স্টেটমেন্ট অব ক্রাইমসে আমরা দেখেছি ৪০ শতাংশ মব কমেছে আমরা দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে"।
সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি বিএনপি সরকার করতে পেরেছে। কিন্তু আরও অনেক উন্নতি করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
একইসঙ্গে মবের ঘটনায় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে পুরোপুরি একমত নন বলেও জানান তিনি। বলেন, "অভিযোগ থাকতে পারে। আমরা সেই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করেই বলতে পারবো যে কতখানি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এখানে আছে"।
"আমাদের তদন্ত রিপোর্ট অনুসারে আমরা দেখেছি খুব কমই এখানে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকে। দেখা যায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত জমিজমা বা অন্যান্য বিষয়াদি থাকে। পলিটিক্যাল ইনভলভমেন্ট খুবই কম", দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
যদিও বিভিন্ন সময় সরকার ও বিরোধী দলের শীর্ষ স্থানীয় নেতারা মবের নানা ঘটনায় পাল্টাপাল্টি দোষারোপও করেছেন। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছিলেন, সরকারি দলের প্রশ্রয়েই মব সন্ত্রাস চলছে।
আবার কয়েকদিন আগে সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, "পাঁচ অগাস্টের পর থেকে জামায়াত-শিবির জুলাইয়ের নামে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম খুলে এসব মব ও সাম্প্রদায়িক কর্মকান্ড করাচ্ছে"।
সূত্র: বিবিসি





