আশুলিয়ায় শারমিন গ্রুপের কর্মকর্তার মৃত্যু, পরিবারের সন্দেহ হত্যা
ঢাকার আশুলিয়ায় শারমিন গ্রুপের বহুতল ভবন থেকে পড়ে সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার মো. জামাল উদ্দিন খাঁন শিহাবের (৩৯) মৃত্যুর ঘটনায় রহস্যের জট খুলছে না। সিসিটিভি ফুটেজে তাঁকে ভবন থেকে লাফ দিতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে এটি আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনো কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নিহতের পরিবারের দাবি, ঘটনাটির পেছনে কারখানার অভ্যন্তরীণ বিরোধ থাকতে পারে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকালে আশুলিয়ার নরসিংহপুরে শারমিন গ্রুপের ভবন থেকে আহত অবস্থায় জামাল উদ্দিন খাঁন শিহাবকে উদ্ধার করে নারী ও শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে তাঁর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
আরও পড়ুন: বগুড়ার দুই থানায় নতুন ওসি, বদলি আরও ৫ পুলিশ কর্মকর্তা
নিহত জামাল উদ্দিন খাঁন শিহাব গাজীপুর সদরের বুরুলিয়া ডুয়েট এলাকার মৃত সেকেন্দার আলীর ছেলে। তিনি শারমিন গ্রুপের ডিভিশন-৩-এর সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, কারখানার অভ্যন্তরীণ কোনো বিরোধের জেরে তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপন করে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা হচ্ছে বলেও দাবি তাঁদের। তাঁরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন: ‘নতুন জীবনের’ খোঁজে বাড়ি থেকে পালায় চার স্কুলছাত্রী, উদ্ধার হবিগঞ্জে
নিহতের ভাই পরিচয়ে ফখরুল হাসান নামে এক ব্যক্তি জানান, বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তাঁকে শিহাবের ভবন থেকে লাফ দেওয়ার খবর জানানো হয়। তাঁর দাবি, জামাল উদ্দিন খাঁন শিহাবের ছোট সন্তান রয়েছে এবং তিনি প্রতিষ্ঠিত কর্মকর্তা ছিলেন। এ কারণে তাঁর আত্মহত্যার বিষয়টি পরিবারের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। কারখানার ভেতরের লোকজন ঘটনাটি আড়াল করার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জামাল উদ্দিন খাঁন শিহাবের স্ত্রী নাহার আক্তার বৃষ্টি জানান, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে মুঠোফোনে তাঁর স্বামী তাঁকে কারখানায় কিছুটা ঝামেলা হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। বুধবার সকালেও তাঁদের কথা হয়। তখন শিহাব মালিকের আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
বৃষ্টি বলেন, আমি আমার স্বামীকে অফিসে যেতে নিষেধ করেছিলাম। তবে অফিসে না গেলে তাঁকে ফাঁসানো হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন আমার স্বামী। অফিসে যাওয়ার পর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। প্রায় দুই ঘণ্টা পর একজন ফোন ধরে আমার স্বামী অসুস্থ হয়েছেন এবং তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে বলে জানান। পরে তাঁরা তাঁর মৃত্যুর খবর পান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারখানার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, শিহাবের মৃত্যুর ঘটনায় কারখানার ভেতরে নানা প্রশ্ন রয়েছে। ঘটনার আগে তিনি প্রায় ৪০ মিনিট কোথায় ছিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ওই কর্মকর্তা। তাঁর দাবি, ঘটনার পর কারখানার কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
ঘটনাস্থলে প্রাথমিক সুরতহালকারী আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফাহিম বলেন, নিহতের হাত-পা ভেঙে গিয়ে থাকতে পারে। ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার কারণে তাঁর নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কর্তৃপক্ষের চাপ বা তদবিরের বিষয়ে জানতে চাইলে এ নিয়ে প্রকাশ্যে বলার মতো কোনো তথ্য বা মন্তব্য নেই বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। তবে সিসিটিভি ফুটেজে জামাল উদ্দিন খাঁন শিহাবকে লাফ দিতে দেখা গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তদন্ত শেষে মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে বলেও জানান এসআই ফাহিম।
নিহতের বড় ভাই ইস্কান্দার খাঁন বলেন, মৃত্যুর দিন সকালে শিহাব তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন এবং সন্তানের খোঁজখবর নিয়েছেন। সুস্থ অবস্থায় অফিসে যাওয়ার পরপরই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে কারখানার লোকজন যে বক্তব্য দিচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর দাবি, মৃত্যুর আগে জামাল উদ্দিন খাঁন শিহাবের আচরণে আত্মহত্যার কোনো ইঙ্গিত তাঁরা পাননি।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
এদিকে কারখানা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে নরসিংহপুরে শারমিন গ্রুপের প্রধান ফটকে গেলে নিরাপত্তা ইনচার্জ নজরুল ও নিরাপত্তাকর্মী আল আমিন প্রতিবেদককে ভেতরে প্রবেশ করতে দেননি। প্রবেশের তালিকায় নাম থাকলেই ভেতরে যাওয়ার সুযোগ মিলবে বলে জানান তাঁরা।
শিহাবের মৃত্যুকে ঘিরে পরিবারের অভিযোগ ও পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের মধ্যে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে এখন তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষা।





