সরকারি বেতন ও বকেয়া দিতে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার

Any Akter
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ৪:২৫ অপরাহ্ন, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৫:১৬ অপরাহ্ন, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অক্টোবরের বেতন এবং আগের তিন মাসের বেতন বৃদ্ধির বকেয়া পরিশোধের জন্য ব্যাংক খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে যাচ্ছে সরকার। এ অর্থ সংগ্রহে বুধবার (২৮ অক্টোবর) ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম ডেকেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নতুন এই ঋণ নেওয়া হলে চলতি অক্টোবর মাসে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের মোট ঋণ উত্তোলনের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এক মাসে এটিই হবে সর্বোচ্চ ঋণ উত্তোলন।

আরও পড়ুন: সৌদিতে ১৫৩ ফ্লাইট বাতিল-স্থগিত, ভোগান্তিতে ২২ হাজার যাত্রী

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত চলতি মাসে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। এর সঙ্গে নতুন নিলামের ৫ হাজার কোটি টাকা যুক্ত হলে মোট উত্তোলনের পরিমাণ বেড়ে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় পৌঁছাবে।

সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, আগামী রোববার (১ নভেম্বর) সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী অক্টোবরের বেতন দেওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে আগের তিন মাসের বেতন বৃদ্ধির বকেয়াও পরিশোধ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বাড়তি ব্যয় মেটাতে স্বল্পমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করছে সরকার।

আরও পড়ুন: ভবিষ্যতের সব নির্বাচন একই মানদণ্ডে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে ইসি : সিইসি

সাধারণত সরকারের সাময়িক অর্থের চাহিদা মেটাতে ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়। তবে রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের মধ্যে সাময়িক ঘাটতি দেখা দিলে ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিল ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ করা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাস—জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত—ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া হয়েছে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা। বাকি অর্থ এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে।

তবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে মোট যত টাকা তোলা হয়, তার সবটাই সরকারের নতুন ঋণ হিসেবে যুক্ত হয় না। আগের ঋণের মেয়াদ শেষ হলে তা পরিশোধ করতে হয়, আবার কখনো নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ পুনঃঅর্থায়ন করা হয়। এ কারণে মোট ঋণ উত্তোলন এবং নিট ঋণের হিসাব এক নয়।

সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে ব্যাংক খাত থেকে ৫৬ হাজার কোটি টাকা, আগস্টে ৫০ হাজার কোটি টাকা এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় ৪১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ উত্তোলন করা হয়েছিল। এসব অর্থের বড় অংশ আগের ট্রেজারি বিল ও বন্ডের দায় পরিশোধ বা পুনঃঅর্থায়নে ব্যবহৃত হয়েছে।

সরকারের ঋণের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেজারি বিলের সুদহারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড গত ৫ অক্টোবর ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। ২৬ অক্টোবর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে। অন্যদিকে, গত আগস্টের শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আয় না হওয়ায় সরকারকে ব্যাংক খাত থেকে বাড়তি ঋণ নিতে হচ্ছে। সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে অর্থের জোগান দেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব।

তিনি আরও জানান, ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের ঋণনির্ভরতা কমাতে চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার শরিয়াহভিত্তিক সুকুক ইস্যুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। গত অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।

এদিকে, চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই রাজস্ব আদায়ে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার ঘাটতি দেখা দেয়। পরবর্তী মাসগুলোতেও প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় না হলে সরকারের অর্থায়নের জন্য ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।

সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

দেশে বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এ ছাড়া পেনশনভোগীর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ২৫ হাজার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে বেতন, ভাতা ও পেনশন বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। নতুন পে-স্কেল ধাপে ধাপে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

বেতন ও বকেয়া পরিশোধে বিশেষ ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ সরকারের তাৎক্ষণিক অর্থের চাহিদার চিত্র তুলে ধরে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব নির্ভর করবে রাজস্ব আদায়, ঋণের সুদ ব্যয় এবং সরকারের সামগ্রিক অর্থায়ন ব্যবস্থাপনার ওপর।