আ’লীগ নেতা হানিফের মৃত্যুদণ্ড
গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৫, ১৭ ও ৩০ জুলাই আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে উপস্থিত থেকে কাদেরের উসকানিমূলক বক্তব্যকে সমর্থন করেন মাহবুব উল আলম হানিফ। এ ছাড়া ২৯ জুলাই জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় আন্দোলনকারীদের হত্যা ও নির্যাতনের নির্দেশ, উসকানি ও প্ররোচনা দেন মাহবুব উল আলম হানিফ।
আরও পড়ুন: যান্ত্রিক ত্রুটি কাটিয়ে ৫ ঘণ্টা পর ঢাকার পথে প্রধানমন্ত্রীর উড়োজাহাজ
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, মাহবুব উল আলম হানিফের নির্দেশে ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) কার্যালয়ে সদর উদ্দিন খান, আসগর আলী, আতাউর রহমানসহ অন্য আওয়ামী লীগের নেতারা সভা করেন। সে সভায় নিরীহ নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং সভা থেকে কুষ্টিয়া শহরে আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের জন্য আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তৃতীয় অভিযোগ হলো, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ও অঙ্গসংগঠনের সন্ত্রাসীরা এই মামলার ৪ আসামির নির্দেশে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায় এবং তাদের গুলিতে আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, বাবুল ফরাজী ও ইউসুফ শেখ মারা যান।
আরও পড়ুন: জানাজা শেষে উত্তরায় সমাহিত তাহসিফ
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে জমা দেয় প্রসিকিউশন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে গত বছরের ২ নভেম্বর এই মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়। ৮ ডিসেম্বর সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। গত ২৩ এপ্রিল এই মামলায় ১৯ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। উভয় পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রাখার পর গতকাল রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
রায়ে দণ্ডিত মাহবুব উল আলম হানিফসহ মামলার ৪ আসামি পলাতক।
এদিকে, রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের মৃত্যুদণ্ডের রায়সহ বাকি ৩ আসামির বিরুদ্ধে দেওয়া রায়কে সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার বিচার শেষে আজ ট্রাইব্যুনাল রায় দিয়েছেন। আমরা জুলাই শহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছি।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন মাহবুব উল আলম হানিফ। ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার ও নির্বিচারে গুলি চালানোর নির্দেশনা বাস্তবায়নে তাঁর সহযোগিতা ছিল। এ ছাড়া কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের বৈঠকে অধীনস্থ নেতাকর্মীদেরও বলপ্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়।
আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল এ সাজা দিয়েছেন বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর।
তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগত দায় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায়ের কারণে হানিফকে প্রথম অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বাকি দুটি অভিযোগে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একইভাবে অপর ৩ আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। পাশাপাশি তিনটি অভিযোগেই সব আসামিকে পুনরায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁদের অর্ধেক স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তেরও আদেশ দিয়েছেন আদালত।





