৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২

আন্দোলনের তীব্রতা টের পেয়ে নজরদারি বাড়ায় সরকার

Any Akter
আহমেদ শাহেদ
প্রকাশিত: ১২:৪৮ অপরাহ্ন, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৩:২৯ অপরাহ্ন, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিক কর্মসূচির মুখে ১৯৫২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সরকার প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে বুঝতে শুরু করে, এটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো ছাত্র প্রতিবাদ নয়। আগের দিন ঢাকাজুড়ে ছাত্রদের ক্লাস বর্জন, মিছিল ও সমাবেশ প্রশাসনের চোখে আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি তুলে ধরে। সেই উপলব্ধির পর থেকেই সরকার আন্দোলনের ওপর নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে রাজপথে নেমে আসে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছাড়িয়ে মিছিল ছড়িয়ে পড়ে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে। শিক্ষার্থীদের শ্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজধানী ঢাকা। এই পরিস্থিতি প্রশাসনের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা হয়ে ওঠে যে, ভাষার প্রশ্নে ছাত্রসমাজ আর পিছিয়ে নেই, বরং সংগঠিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন: ক্লাস বর্জন ও মিছিলে উত্তাল ঢাকা, রাজপথে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি

এর পরদিন ৫ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই ঢাকা শহরে প্রশাসনের তৎপরতা দৃশ্যমানভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশের এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়। ক্যাম্পাসসংলগ্ন সড়ক, হল এলাকা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। শুধু প্রকাশ্য পুলিশি উপস্থিতিই নয়, অপ্রকাশ্য নজরদারিও শুরু হয়।

একই সঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছাত্রনেতা, সংগঠক ও সক্রিয় কর্মীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে জোর দেওয়া হয়। কে কোন ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, কারা মিছিলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, কোথায় বৈঠক হচ্ছে- এসব বিষয়ে আলাদা করে নথি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে তৎকালীন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি আগেভাগে জেনে নেওয়াই ছিল এই গোয়েন্দা তৎপরতার মূল লক্ষ্য।

আরও পড়ুন: ফজলুল হক হলের বৈঠকেই চূড়ান্ত হয় ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি

৫ ফেব্রুয়ারির এই প্রশাসনিক অবস্থান স্পষ্ট করে দেয় যে, সরকার ভাষা আন্দোলনকে এখন একটি গুরুতর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করছে। শুরুর দিকে যে আন্দোলনকে সরকার কেবল কিছু ছাত্রের আবেগী প্রতিবাদ বলে মনে করেছিল, সেটি যে দ্রুতই গণআন্দোলনের দিকে যেতে পারে- এই আশঙ্কা থেকেই আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়।

এই দিন থেকেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ বাড়তে থাকে। কোথাও কোথাও মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়, ভবিষ্যতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে- এমন বার্তাও দেওয়া হয়। অনেক শিক্ষার্থী প্রকাশ্যেই টের পান যে, তাদের গতিবিধি নজরে রাখা হচ্ছে। হল, ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় অচেনা লোকের আনাগোনাও চোখে পড়ে, যা গোয়েন্দা নজরদারির ইঙ্গিত দেয়।

তবে এসব চাপ ও ভয়ভীতি আন্দোলনকারীদের মনোবল ভাঙতে পারেনি। বরং প্রশাসনের এই কঠোরতা ছাত্রসমাজের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভের জন্ম দেয়। অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন, সরকার যখন নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াচ্ছে, তখন তা প্রমাণ করে যে ভাষার দাবিতে তাদের আন্দোলন শাসকগোষ্ঠীকে সত্যিই চাপে ফেলেছে। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ৫ ফেব্রুয়ারি তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের দিন।

এই দিন থেকেই আন্দোলন ও প্রশাসনের মধ্যে একটি স্পষ্ট মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হতে শুরু করে। সরকার একদিকে নিয়ন্ত্রণ ও দমনমূলক পথে হাঁটার প্রস্তুতি নেয়, অন্যদিকে ছাত্রসমাজ আরও দৃঢ়ভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এই মুখোমুখি অবস্থানই পরবর্তী সময়ে ১৪৪ ধারা জারি এবং শেষ পর্যন্ত ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ঘটনার দিকে পরিস্থিতিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যায়।