৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২
ক্লাস বর্জন ও মিছিলে উত্তাল ঢাকা, রাজপথে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ছিল একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। আগের দিনের সিদ্ধান্তকে বাস্তব রূপ দিতে এই দিন ঢাকা শহরে ছাত্রদের নেতৃত্বে ব্যাপক ধর্মঘট ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে রাজপথে নেমে আসেন, যা আন্দোলনকে নতুন এক মাত্রায় নিয়ে যায়।
সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, জগন্নাথ কলেজসহ রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। ক্লাস কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমের পরিবর্তে ক্যাম্পাসে জড়ো হন, আলোচনা করেন আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে এবং সেখান থেকেই মিছিলের প্রস্তুতি নেন।
আরও পড়ুন: ফজলুল হক হলের বৈঠকেই চূড়ান্ত হয় ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি
পরবর্তী সময়ে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একাধিক মিছিল বের হয়ে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিলগুলোতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও দৃঢ়। তারা এক কণ্ঠে উচ্চারণ করেন-
“রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”,
আরও পড়ুন: ভাষা আন্দোলনের নীরব প্রস্তুতি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতির ঐতিহাসিক দিন
“বাংলা আমাদের মাতৃভাষা”,
“উর্দু নয়, বাংলা চাই”।
এই স্লোগানে রাজপথ মুখরিত হয়ে ওঠে। ভাষার দাবিতে ছাত্রদের এই সরব উপস্থিতি নগরবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অনেক জায়গায় পথচারী ও সাধারণ মানুষ থেমে দাঁড়িয়ে মিছিল দেখেন এবং নীরবে কিংবা প্রকাশ্যে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান।
৪ ফেব্রুয়ারির এই কর্মসূচি ছিল মূলত শান্তিপূর্ণ। কোথাও বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। আন্দোলনের নেতাকর্মীদের গতিবিধিও প্রশাসনের নজরে ছিল।
এই দিনের আন্দোলন স্পষ্ট করে দেয়, ভাষা আন্দোলন আর কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাঙ্গনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তা ছড়িয়ে পড়ছে শহরের রাজপথে, সাধারণ মানুষের মাঝে। ক্লাস বর্জনের মতো কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে ছাত্রসমাজ সরকারকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছিল- বাংলা ভাষার দাবি উপেক্ষা করা আর সম্ভব নয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, ৪ ফেব্রুয়ারির আন্দোলন ছিল ভাষা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এই দিন থেকেই আন্দোলন আরও সংগঠিত ও ধারাবাহিক রূপ নিতে শুরু করে। ছাত্রদের এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ও রাজপথকেন্দ্রিক আন্দোলনই পরবর্তী সময়ে ২১ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ সংগ্রামে ৪ ফেব্রুয়ারি তাই একটি প্রস্তুতির দিন, একটি শক্ত অবস্থানের দিন- যেখান থেকে বাঙালির ভাষার অধিকার আদায়ের আন্দোলন আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যায়।





