প্রতারণার নিত্য নতুন কৌশলে সর্বস্বান্ত হচ্ছে মানুষ
- ব্যাংকিং হ্যাকিং বা ওটিপি জালিয়াতি ব্যাপক রূপ নিয়েছে
- মৌলিক চাহিদা ও সেবামূলক খাতে প্রতারণা বাড়ছে
- শিক্ষায় প্রতারণা ও সনদ বাণিজ্য চলছে
- চাকরির বাজারে ভুয়া নিয়োগ
- আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ভূমি ও আবাসন খাতেও জালিয়াতি
- ই-কমার্স ও অনলাইন শপিংয়ে চলছে ধোঁকাবাজি
মানব সভ্যতার সূচনা লগ্ন থেকেই নৈতিকতা এবং সততা মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু এই সুন্দর সমাজের অন্ধকার পিঠের এক চরম বাস্তবতার নাম ‘প্রতারণা’। বর্তমান আধুনিক যুগে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মানুষের জীবন যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি প্রতারণার ধরন ও কৌশলেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। নিত্যনতুন কৌশলে প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত সংঘবদ্ধ চক্রের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে অনেকেই। প্রতারক চক্রে পুরুষদের পাশাপাশি নারী সদস্যও রয়েছেন। কোনো কোনো চক্রে আছেন বিদেশিরাও। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র বিস্তৃত এদের প্রতারণার জাল। প্রতারণার শিকার কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারস্থ হচ্ছেন। আবার কেউ লোকলজ্জা, কেউ বা বাড়তি ঝামেলা এড়াতে নীরব থেকে যাচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা সেজে প্রতারণা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, জমি লিজ, প্লট বিক্রি, চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণা, এমএলএল ব্যবসা, পে-অর্ডার, অনলাইন প্রতারণাসহ বিভিন্ন প্রতারণা এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিদেশ পাঠানো ও বিয়ের নামে প্রতারণা করা হচ্ছে। প্রতারণা হলো সত্যকে আড়াল করে, মিথ্যা বা ছলের আশ্রয়ে কাউকে ঠকিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করা। দেশ দ্রুতগতিতে ডিজিটাল হয়ে উঠছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে ডিজিটাল প্রতারণা। নানা ধরনের ভয়ংকর সব প্রতারণা হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমে। সময়ের সঙ্গে বাড়ছে প্রতারকের সংখ্যাও। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রতারক ও প্রতারণার অভিনব সব কৌশল। বদলে যাচ্ছে প্রতারণার ধরনেও। ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া ও মোবাইল ফোনে ওতপেতে থাকা প্রতারকরা নানা কৌশলে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা। প্রতারকরা কখনো জিনের বাদশা সেজে, কখনো ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে প্রতারণা করছে। আবার কখনো রাইড শেয়ারিংসহ নানা কৌশলে প্রতারণা করা হচ্ছে।
মৌলিক চাহিদা ও সেবামূলক খাতেও প্রতারণার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিকের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলছে। এটি কেবল একটি আর্থিক অপরাধ নয়, এটি গণস্বাস্থ্যের ওপর চরম আঘাত। খাবারে ফরমালিন, কার্বাইড বা ক্ষতিকর রং মেশানোর ফলে লিভার নষ্ট, কিডনি বিকল এবং ক্যান্সারের মতো দীর্ঘমেয়াদী মরণব্যাধি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। সুস্থ প্রজন্ম গড়ে ওঠার পথ এতে রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসা সেবায় প্রতারণা ও ভুয়া ডাক্তারের দৌরাত্ম্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ভুল ও নিম্নমানের চিকিৎসা সেবা সরাসরি মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। ভুয়া লাইসেন্সধারী হাসপাতাল, অপ্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক টেস্টের বাণিজ্য এবং ভুয়া ডিগ্রিধারী ডাক্তারদের কারণে মানুষ আর্থিক ও শারীরিকভাবে নিঃস্ব হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর থেকে মানুষের ন্যূনতম ভরসাটুকু হারিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষাকে যখন ব্যবসার হাতিয়ার বানানো হয়, তখন মেধার অবমূল্যায়ন ঘটে। ভুয়া বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট বিক্রির কারণে অযোগ্য ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হচ্ছে। এর ফলে পুরো দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ধ্বংসের মুখে পড়ে। বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে তরুণদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র। এটি একটি পরিবারের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। যখন একজন যোগ্য তরুণ প্রতারিত হন, তখন তার মধ্যে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি চরম ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়, যা অনেক সময় অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।
আরও পড়ুন: আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বেওয়ারিশ লাশ
অনলাইন লেনদেনে বাড়ছে প্রতারণার নতুন নতুন ফাঁদ, আর সে ফাঁদের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠছে মোবাইল ব্যাংকিং। সিআইডির পরিসংখ্যান বলছে, এমএফএসভিত্তিক প্রতারণার ৬০ শতাংশই বিকাশ অ্যাকাউন্টে। অভিযোগ করেও প্রতিকার মিলছে না। পাশাপাশি অভিযুক্ত মার্চেন্টের তথ্য গোপন রাখার অভিযোগে ক্রমাগত প্রশ্নের মুখে পড়েছে সেবাটির জবাবদিহি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ।
এদিকে অনলাইনে আর্থিক প্রতারণা ঠেকাতে সম্প্রতি দেশের ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের সময় বেধে দেয়া হয়েছে। সাইবার পুলিশ সেন্টারের অভিযোগনামা, ভুক্তভোগীর বিবরণ, থানার সাধারণ ডায়েরি পর্যালোচনা করে জানা গেছে, প্রতিনিয়ত নানা অভিনব কায়দায় বিকাশসহ বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সহায়তা নিয়ে অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে। অপরাধীরা লেনদেনে ব্যবহার করছে বিকাশের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট। জানা যায়, অ্যাকাউন্টের লাইসেন্স দেয়ার আগেই ট্রেড লাইসেন্সসহ ব্যবসার কাগজপত্র যাচাই করে নেয় বিকাশ। কিন্তু ভুক্তভোগী গ্রাহক বিকাশের কাছে অভিযোগ নিয়ে গেলে নানা আইন-কানুনের অযুহাত দেখিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হয় না। লেনদেনে ব্যবহার হওয়া অভিযুক্ত মার্চেন্ট বা ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভুক্তভোগীকে সহযোগিতাও করা হয় না।
আরও পড়ুন: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে রাজনীতিমুক্ত, আচরণবিধি তৈরি হচ্ছে শিক্ষকদের
সাধারণ মানুষ তাদের সারাজীবনের সঞ্চয় বা পেনশনের টাকা চড়া মুনাফার লোভে এসব জায়গায় বিনিয়োগ করে। যখন এই প্রতিষ্ঠানগুলো টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়, তখন হাজার হাজার পরিবার এক রাতেই দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। এটি দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। একটি মাথার গোঁজার ঠাঁই বা জমি কেনার জন্য মানুষ তার জীবনের সব পুঁজি ঢেলে দেয়। কিন্তু ভুয়া দলিল বা একই ফ্ল্যাট কয়েকজনের কাছে বিক্রি করার কারণে মানুষ বছরের পর বছর কোর্ট-কাছারিতে দৌড়াতে বাধ্য হয়। এটি পারিবারিক অশান্তি এবং চরম মানসিক ট্রমার সৃষ্টি করে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে ব্যাংকিং হ্যাকিং বা ওটিপি জালিয়াতি ব্যাপক রূপ নিয়েছে। এর ফলে প্রবীণ বা প্রযুক্তি-অদক্ষ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটি ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে এবং প্রযুক্তির প্রতি এক ধরণের ভীতি তৈরি করে। ছবি ও বর্ণনায় চমৎকার জিনিস দেখিয়ে বাস্তবে সস্তা ও নকল পণ্য সরবরাহ করার কারণে দেশের ই-কমার্স খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হচ্ছে। ফলে সৎ ও নতুন উদ্যোক্তারা বাজারে টিকে থাকতে সমস্যায় পড়ছেন। মানবপাচার ও বিদেশ পাঠানোর জালিয়াতি আগের চেয়ে কয়েকগুন বেড়েছে। উন্নত জীবনের আশায় মানুষ জমিজমা বিক্রি করে দালালের হাতে টাকা তুলে দেয়। কিন্তু তাদের যখন মরুভূমিতে বা সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয় কিংবা জিম্মি করে নির্যাতন করা হয়, তখন তা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে প্রকাশ পায়। অনেক পরিবার এর ফলে চিরতরে তাদের আপনজনকে হারায়। ভুয়া লাইসেন্স ও সার্টিফিকেট জালিয়াতি কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না। জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স বা ফিটনেস সার্টিফিকেটের কারণে প্রতিদিন সড়কে শত শত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। অযোগ্য চালক ও ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি রাস্তায় নামার অনুমতি পাওয়ার অর্থ হলো নাগরিকের জীবনকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। নারী-পুরুষ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত ও ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই প্রতারণার শিকার হচ্ছে। প্রতারক চক্রের বহুমুখী প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে তাই প্রয়োজন অধিকতর সতর্কতা ও সচেতনতা। আর্থিক লেনদেন, ক্রয়-বিক্রয়সহ জীবনের সব ক্ষেত্রে সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হতে হবে বলে মনে করছেন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। তথ্যপ্রযুক্তিবিদ খালেদ ফারুকী বলেন, ২০০৫ সাল থেকে বাংলাদেশে ফেসবুক বা ইন্টারনেট প্রসার শুরু হয়। ২০০৮ সাল থেকে সামাজিক যোগাযোগের এ মাধ্যম থেকে অপরাধ প্রবণতা বাড়তে থাকে। অনেক ঘটনায় থানায় মামলা নিবন্ধন হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত একটি মামলায়ও দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তি বা বিচার হয়নি। তিনি বলেন, আমাদের দেশের আইন ঠিক আছে। কিন্তু সঠিক তদন্তের দুর্বলতা আছে। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে সাইবার বিশেষজ্ঞ বা দক্ষ লোকবলের অভাব রয়েছে। এ ছাড়া ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবের অপ্রতুলতায় সঠিক তদন্ত ব্যাহত হচ্ছে। সুতরাং এ অপরাধের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হলে ভুক্তভোগীকে লোভ সংবরণ করতে হবে এবং সচেতন হতে হবে। যেকোনো লোভনীয় অফার পেলেই নেওয়া যাবে না।
ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতারণা ও আর্থিক অনিয়ম নিয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে এখন পর্যন্ত ৫৮ হাজার ৭২০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে ভুক্তভোগী গ্রাহক ও বিক্রেতাদের দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ৩০ আগস্ট কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম রাশেদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। মন্ত্রী বলেন, ই-কমার্স খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের পাওনা অর্থ উদ্ধারে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। অভিযোগের তালিকায় বহুল আলোচিত ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, কিউকম, ধামাকা শপিং ও আলেশা মার্টসহ বেশ কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহক ও মার্চেন্টদের বিপুল অঙ্কের অর্থ আটকে রাখা বা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
কক্সবাজার-চট্টগ্রাম ঘিরে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণার ভয়ংকর ফাঁদ তৈরি করেছে সংঘবদ্ধ বিদেশিরা। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম নগরের জালালাবাদ আবাসিক এলাকার একটি ভবনে অভিযান চালিয়ে চীন, পাকিস্তান, লাওস, নেপাল ও ভিয়েতনামের ৭০ নাগরিককে আটক করেছে পুলিশ। এর আগে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন রিসোর্টে অবস্থান নিয়ে চক্রটির সদস্যরা গড়ে তোলে অত্যাধুনিক ডিজিটাল ল্যাব। গত সপ্তাহে তাদের কয়েকজনকে বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল সরঞ্জামসহ আটকের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নড়েচড়ে বসে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণায় সরাসরি জড়িত অন্তত ৯৪ চীনের নাগরিকের তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও দুই শতাধিক চীনের নাগরিকের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সমাজ মাধ্যমে ভুয়া পরিচয়ে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে প্রথমে অল্প বিনিয়োগে লাভের প্রলোভন দেখানো হতো। এতে আস্থা অর্জনের পর বড় অঙ্কের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা ছিল চক্রটির মূল লক্ষ্য। হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি করা হতো আকর্ষণীয় বার্তা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য। এ ঘটনায় রামু থানায় আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণার অভিযোগে সাইবার আইনে মামলা হয়েছে। মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সূত্রটি আরও জানায়, চক্রের সদস্যরা রামুর হিমছড়ির ‘মেরিনা বিচ বিলাস’ রিসোর্টের একটি বড় হলরুমে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন করে। সেখানে বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রনিক ডিভাইসের পাশাপাশি কয়েকটি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ তৈরি করে। যাতে বাইরের শব্দ ভিতরে এবং ভিতরের আওয়াজ বাইরে না যায়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ চীনের নাগরিকদের একটি অংশ সরাসরি প্রতারণা কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত ছিল। তাঁদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছিল আরও দুই শতাধিক চীনের নাগরিক। গত ২৫ আগস্ট ও ৩ সেপ্টেম্বর পৃথক অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম জব্দ করে কক্সবাজার জেলা পুলিশ। এ সময় ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি কম্পিউটার, ৩০টি কি-বোর্ড, দুটি ল্যাপটপ ও ৪০টি মাউসসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া চীনের দুটি পতাকা, চীনা পুলিশের ব্যাজ, একটি ডায়েরিসহ অন্যান্য সামগ্রীও জব্দ করে পুলিশ। এসব অভিযানে চীনের পাঁচ নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের ধারণা, চক্রটির নজর শুধু চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের পুঁজিবাজারে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকেও সম্ভাব্য টার্গেট হিসেবে বিবেচনায় নিয়েছিল। পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে রামুর হিমছড়ির মেরিনা বিচ বিলাস এবং উখিয়ার ইনানীর ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, অর্কিড-ব্লুম রিসোর্ট ও ইলিয়াস ব্রাদার্স নামের আবাসিক ভবনে বিপুলসংখ্যক চীনের নাগরিকের অবস্থানের তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘বাবর আলী’ নাম ব্যবহার করে চীনের এক নাগরিক গত এপ্রিল থেকে এসব রিসোর্ট ও আবাসিক ভবন ভাড়া নেয়। পরে জানা যায়, তাঁর প্রকৃত নাম ঝান ইউয়ান ফান। তাঁর সহযোগী পাই লেডিং রিসোর্ট মালিকদের সঙ্গে ভাড়ার চুক্তি করেন।
অন্যদিকে উ ওয়েইপিং নামের আরেক চীনা নাগরিক নিজেকে ‘জিন শিন কনস্ট্রাকশন’ কোম্পানির মালিক হিসেবে পরিচয় দেন। বাংলাদেশে একটি নির্মাণ কোম্পানি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি দাবি করতেন। তবে এসবির অনুসন্ধানে ওই নামে কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পুলিশের অনুসন্ধানে জানা গেছে, চীনের নাগরিকদের একটি অংশ প্রথম দিকে নিজেদের নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে আসা কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল। তারা কর্মসংস্থান ভিসায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণায় জড়িত অন্তত ৯৪ চীনের নাগরিকের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও দুই শতাধিক চীনের নাগরিকের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছে পুলিশ। এ পর্যন্ত কক্সবাজার পুলিশ চক্রটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২৯৫ জন চীনের নাগরিকের পাসপোর্ট নম্বর সংগ্রহ করেছে। এসব পাসপোর্ট নম্বর ব্লক করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। রামু থানার মামলায় গ্রেপ্তার পাঁচ চীনের নাগরিকের নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি আরও অজ্ঞাত আড়াই থেকে ৩০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, চীনের নাগরিকদের কর্মকাণ্ড গত মার্চ থেকেই নজরদারিতে ছিল। প্রথম দিকে তারা নির্মাণকাজে যুক্তের কথা বললেও ডিজিটাল ল্যাব স্থাপনের পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
চক্রটি তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে বাংলাদেশে বসে একাধিক দেশের বিনিয়োগকারীদের টার্গেট করে বড় ধরনের আর্থিক প্রতারণা করতে পারত।
অনলাইন ও মোবাইল প্লাটফর্মের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার ঘটনাও বেড়ে চলেছে। প্রযুক্তি যেমন দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি তা স্ক্যামারদের জন্য একটি শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে ৬০ কোটিরও বেশি মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের স্ক্যামের ফাঁদে পড়ছে। আর প্রতিদিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রায় ১৬ লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষ। ডাটা বিশ্লেষণ প্লাটফর্ম এক্সপ্লোডিং টপিকসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বজুড়ে ঠিক কতজন মানুষ সাইবার প্রতারণার শিকার হচ্ছে তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে বিভিন্ন গবেষণা এ সমস্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, সিঙ্গাপুর, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, মেক্সিকো, পর্তুগাল ও স্পেনসহ ১৬টি দেশে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, গত তিন বছরে দেশগুলোর প্রায় ২২ কোটি মানুষ ডিজিটাল স্ক্যামের শিকার হয়েছে। এসব দেশের বাসিন্দারা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-অষ্টমাংশ হওয়ায় অনুমান করা হয়, বৈশ্বিক পরিসরে প্রতি তিন বছরে প্রায় ১৮২ কোটি মানুষ অনলাইনে প্রতারিত হচ্ছে।





