জ্বালানি তেল মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা কাঁচাবাজার ও গনপরিবহনে

Any Akter
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ২:২২ অপরাহ্ন, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৩:০২ অপরাহ্ন, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
  • চাপে চ্যাপ্টা  নিম্ন মধ্যবিত্ত জীবনযাত্রা
  • স্বল্পমেয়াদে দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের সামনে বিকল্প ছিল না: ড. মোস্তাফিজুর রহমান,সিপিডি
  • জ্বালানির দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব পড়বেই: ড. জাহিদ হোসেন 

চলতি বছর দফায় দফায় বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। সবশেষ সোমবার থেকে কার্যকর হয়েছে ডিজেল- কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের নতুন দাম। লিটারে সব ধরনের তেলের দাম বেড়েছে ২০ টাকা করে। বছরের শুরু থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের প্রধান চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৩২ থেকে ৩৬ শতাংশ। ফলে জ্বালানি তেলের ছোঁয়াচে চাপে পড়েছে নিন্মআয়ের মানুষ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতিতে দাম সমন্বয় করা ছাড়া সরকারের সামনে স্বল্পমেয়াদে খুব বেশি বিকল্প ছিল না। তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়ার মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে অন্য পণ্য ও সেবার দামেও। তৈরি হতে পারে মূল্যস্ফীতির ‘ছোঁয়াচে প্রভাব’। তাদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন নিম্ন ও স্থির আয়ের মানুষ। তাই জ্বালানির দাম বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে বাজার নজরদারি বাড়ানো, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ও সরকারি ব্যয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি।

আরও পড়ুন: প্রতারণার নিত্য নতুন কৌশলে সর্বস্বান্ত হচ্ছে মানুষ

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে জ্বালানি কিনে দেশে কম দামে বিক্রি করে যাওয়ার মতো সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নেই। আবার দেশের বাজারে জ্বালানির দাম প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম থাকলে চোরাচালান ও কালোবাজারির মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিপিসিকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়ার সক্ষমতাও সরকারের নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফলে জ্বালানির দাম সমন্বয় করা ছাড়া সরকারের সামনে খুব বেশি বিকল্প ছিল না। তবে জ্বালানির দাম বাড়ার সুযোগ নিয়ে যৌক্তিকতার চেয়ে বেশি হারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সরকারকে কঠোর নজরদারি করতে হবে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর কিছুটা প্রভাব পড়বেই। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব বেশি হতে পারে। কারণ ডিজেল বাস-ট্রাক, সেচ, উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত হয়। ফলে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লে বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তে পারে। তবে যেখানে দুই টাকা দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা রয়েছে, সেখানে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে যেন চার টাকা বা তার বেশি দাম না বাড়ানো হয়, সেদিকে সরকারকে নজর দিতে হবে বলে জানান জাহিদ হোসেন।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি দামে জ্বালানি তেল কিনতে হওয়ায় বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বল্পমেয়াদে দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের সামনে খুব একটা বিকল্প ছিল না। তবে এর ফলে মূল্যস্ফীতির মধ্যে স্থির ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে আগে যেখানে প্রায় চার বিলিয়ন ডলার দিয়ে জ্বালানি তেল কেনা হতো, এখন সেখানে প্রায় আট বিলিয়ন ডলার দিয়ে কিনতে হচ্ছে। স্পট মার্কেটেও জ্বালানি তেলের দাম বেশি। এর সঙ্গে রাজস্ব আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, জ্বালানি হলো ব্যারোমিটারের মতো। দাম বাড়লে এর প্রভাব অন্য পণ্যের ওপরও পড়ে। তবে জ্বালানি তেলের দাম যতটা বাড়বে, তার তুলনায় আনুপাতিক হারে বেশি দাম বাড়ানোর প্রবণতা ঠেকাতে সরকারের নজরদারি থাকতে হবে।

আরও পড়ুন: আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বেওয়ারিশ লাশ

অর্থনীতিবিদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, জ্বালানি তেল বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উপকরণ। ফলে তেলের দাম বাড়লে অর্থনীতিতে ‘মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট’ তৈরি হয়। এর প্রভাব পণ্য ও সেবার দামেও ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, জ্বালানির দাম কমিয়ে রাখতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে গেলে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়বে। সেই চাপ সামাল দিতে অতিরিক্ত অর্থের জোগান দেওয়া হলে বাজারে অর্থ সরবরাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি ও দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বাস্তবতা বিবেচনায় জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পেছনে সরকারের সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলেও মনে করেন সাবেক এই অর্থ সচিব।

নিম্নআয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক বাংলাদেশের মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মুসলিম চৌধুরী। তিনি বলেন, ডিজিটালাইজেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের কারণে যেসব দপ্তরের অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে গেছে, সেখানে প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে জনবল ও কাঠামোর ‘রাইট সাইজিং’ করা যেতে পারে। এতে অপ্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় কমিয়ে কিছু আর্থিক সক্ষমতা তৈরি হবে। এই অর্থ নিম্নআয়ের মানুষের কাছে সরাসরি অর্থ সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে মেগা প্রকল্পসহ সরকারি ব্যয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণের ওপর জোর দেন মুসলিম চৌধুরী। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সব উন্নয়ন ব্যয় বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং কোন প্রকল্প বেশি জরুরি, কোনটিতে ব্যয় কমানো বা পিছিয়ে দেওয়া যায় তা নির্ধারণ করতে হবে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন খরচ বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে জিনিসপত্রের দামে এবং বিদ্যমান মূল্যস্ফীতিও আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়বেন যাদের আয় কম বা কোনো আয় নেই। যারা আগে থেকেই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অবস্থায় ছিলেন, তাদের কেউ কেউ আরও গভীর সংকটে পড়তে পারেন। তাই তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোয় সামনে সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, বেতন বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বেতন বৃদ্ধিকে একই বিষয় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে এবং গেজেটও প্রকাশিত হয়েছে। এখন সিদ্ধান্তটি নেওয়া ঠিক হয়েছে কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থায়ন কীভাবে করা হবে। তবে এতে উন্নয়ন বাজেটে চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্য খাতে ব্যয় কমাতে হলে উন্নয়ন ব্যয়েও কাটছাঁটের প্রয়োজন হতে পারে। 

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা কাঁচাবাজারে: জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় কাঁচাবাজারে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা বাজারে সবজি, মাছ, ব্রয়লার মুরগিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বিক্রেতাদের দাবি, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পণ্য পরিবহনে ট্রাক ও পিকআপের ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে তাদের। ফলে সেই বাড়তি খরচ সমন্বয় করতে গিয়ে বাজারে পণ্যের দাম বাড়াতে হচ্ছে।

রাজধানীর খিলক্ষেত খুচরা বাজারে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ থেকে আসা সবজির সরবরাহে পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব পড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম বাড়ায় দূর-দূরান্ত থেকে পণ্য আনার খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। খিলক্ষেত বাজারে টাঙ্গাইল থেকে মাছ নিয়ে আসা এক পিকআপচালক জানান, টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় আসতে তার প্রায় ২০ থেকে ২৫ লিটার জ্বালানি লাগে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি খরচ এখন পরিবহন মালিকদের দিতে হচ্ছে। আর শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ের প্রভাব পড়ছে ক্রেতাদের ওপর। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, পাইকারি ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা সাধারণত পরিবহনসহ বাড়তি খরচ বাজার থেকেই সমন্বয় করেন। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর। অন্যদিকে, বাড়তি খরচের চাপে বাজারে এসে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা। আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে না পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা। একই সঙ্গে বাজার তদারকি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন ভোক্তারা।