বাণিজ্য মেলায় মাটির শিল্পের জয়যাত্রা
গ্রামবাংলার হারানো ঐতিহ্য ফিরছে বাণিজ্য মেলায়, আগ্রহের কেন্দ্রে মৃৎশিল্প
পূর্বাচলের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রে বসেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। আধুনিক নকশা ও বৈচিত্র্যময় পণ্যে সাজানো অসংখ্য স্টল ও প্যাভিলিয়নের ভিড়ে বিশেষভাবে দৃষ্টি কেড়েছে ঐতিহ্যবাহী মাটির তৈজসপত্রের প্যাভিলিয়ন ‘শাহ পড়ান মৃৎশিল্প’। দেশীয় মৃৎশিল্পের নানা গৃহস্থালি সামগ্রী নিয়ে সাজানো এই প্যাভিলিয়নটি এখন দর্শনার্থী ও ক্রেতাদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মাটির তৈরি বিভিন্ন ব্যবহার্য পণ্য কিনতে প্রতিনিয়ত ভিড় করছেন ক্রেতারা।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় শাহ পড়ান মৃৎশিল্পের প্যাভিলিয়নে গিয়ে এমনই চিত্র দেখা যায়।
আরও পড়ুন: আশুলিয়ায় সাংবাদিক পরিচয়ে শ্রমিক নেতাদের মারধর ও লুটপাটের অভিযোগ
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, প্যাভিলিয়নজুড়ে চারপাশের দেয়ালে সারি সারি করে সাজানো রয়েছে নানা ধরনের মাটির তৈরি তৈজসপত্র। এর মধ্যে রয়েছে সাধারণ ও বিরিয়ানির প্লেট, কাপ-পিরিচ, গ্লাস, গামলা, ডিনার সেটসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রী। পাশাপাশি শোভা পাচ্ছে নান্দনিক শোপিস, ফুলদানি, গিফট আইটেম ও সঞ্চয় ব্যাংকসহ শতাধিক বৈচিত্র্যময় মৃৎশিল্প পণ্য, যা দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রের মূল ভবনের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত শাহ পড়ান মৃৎশিল্প প্যাভিলিয়নটি সহজেই নজরে পড়ে দর্শনার্থীদের। আধুনিক পণ্যের ভিড়ের মধ্যেও এই প্যাভিলিয়ন যেন তুলে ধরছে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য।
আরও পড়ুন: পাচারচক্রের হাত থেকে শিশু উদ্ধার, পাচারকারী নারী গ্রেফতার
এক সময় দেশের গ্রামাঞ্চলে দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজে মাটির তৈরি সামগ্রীর ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। সময়ের পরিবর্তনে সেই ঐতিহ্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। তবুও মাটির তৈরি জিনিসপত্রের প্রতি মানুষের আবেগ ও আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বিশেষ করে শৌখিন ও রুচিশীল মানুষের কাছে এসব পণ্যের কদর এখনো রয়েছে। তবে রাজধানীতে হাতে গোনা কয়েকটি দোকান ছাড়া মাটির তৈজসপত্র সহজে পাওয়া যায় না। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় এমন মৃৎশিল্প প্যাভিলিয়ন দর্শনার্থীদের কাছে আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।
মাটির তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী কিনতে আসা নুসরাত জাহান বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, বর্তমান সময়টা খুবই আধুনিক। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিক আর মেলামাইন এমনভাবে ঢুকে গেছে যে মাটির তৈরি জিনিসপত্র প্রায় হারিয়েই যেতে বসেছে। অথচ ছোটবেলায় আমরা দেখেছি—মাটির হাঁড়ি, পাতিল, থালা-বাসন দিয়েই সংসারের সব কাজ হতো। মাটির জিনিসপত্র শুধু যে পরিবেশবান্ধব তা-ই নয়, স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও অনেক নিরাপদ। প্লাস্টিক বা মেলামাইনের মতো ক্ষতিকর কোনো উপাদান এতে নেই। এই প্যাভিলিয়নে এসে দেখলাম—মাটির তৈরি জিনিসপত্রগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি দামে তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। তাই নিজের ব্যবহারের জন্য কিছু জিনিস কিনেছি। ভবিষ্যতেও সুযোগ পেলে মাটির তৈরি পণ্যই ব্যবহার করতে চাই।
মৃৎশিল্পের বিভিন্ন শোপিস কিনতে আসা ব্যাংক কর্মকর্তা মো. নুরুল হাসনাত বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, একটি ঘর সুন্দর করে সাজাতে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো রুচিবোধ। অনেক সময় বেশি খরচ করেও ঘরকে আলাদা করে তোলা যায় না। কিন্তু মাটির তৈরি পুতুল, ফুলদানি, মোমদানি কিংবা ল্যাম্পের মতো জিনিস খুব অল্প খরচেই ঘরের পরিবেশ পুরো বদলে দিতে পারে। এই মৃৎশিল্প প্যাভিলিয়নে এসে দেখলাম—এখানকার পণ্যগুলো একেবারেই ভিন্ন ধাঁচের। এগুলো শুধু শোপিস নয়, আমাদের দেশের ঐতিহ্যও বহন করে। ঘরে এসব জিনিস রাখলে একটা দেশীয় আবহ তৈরি হয়। তাই ঘর সাজানোর জন্য কয়েকটি মাটির তৈরি শোপিস কিনলাম।
ঢাকা থেকে মেলায় আসা দর্শনার্থী ঝন্টু ঘোষ বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় প্রতি বছরই আসি। আধুনিক পণ্যের ভিড়ের মধ্যে শাহ পড়ান মৃৎশিল্পের এই প্যাভিলিয়নটি আমার নজর কেড়েছে। এখানে এসে মনে হলো—আমাদের গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য নতুন করে ফিরে এসেছে। মাটির তৈরি জিনিসপত্রের সঙ্গে আমাদের আবেগ জড়িয়ে আছে। এগুলো শুধু পণ্য নয়, আমাদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অংশ। নতুন প্রজন্ম যেন এসব ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হয়, সে জন্য এমন প্যাভিলিয়ন মেলায় থাকা খুবই জরুরি। আজ নিজের জন্য ও উপহার দেওয়ার জন্য কয়েকটি মাটির তৈরি সামগ্রী কিনেছি।
শাহ পড়ান মৃৎশিল্প প্যাভিলিয়নের বিক্রয় প্রতিনিধি শোয়েব আহমেদ বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিনি মাটির তৈরি গৃহস্থালি ও শৌখিন সামগ্রী উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো হওয়ায় এসব মাটির পণ্য কাচের তুলনায় অনেক বেশি টেকসই। প্রায় ৮৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় পোড়ানোর ফলে পণ্যগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য থাকে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এসব মৃৎশিল্প পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে বলেও জানান তিনি।
দাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মেলায় তার স্টলে কাপ-পিরিচ প্রতি পিস ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, থালা ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, ফুলদানি ১২০ থেকে ২০০ টাকা এবং সঞ্চয় ব্যাংক ৪০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া ওয়ালমেট ও মাটির হাঁড়ি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দরে পাওয়া যাচ্ছে। আগের বছরের তুলনায় এবার মেলায় বেচাকেনা ভালো হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বিভিন্ন ক্যাটাগরির মোট ৩২৭টি প্যাভিলিয়ন ও রেস্টুরেন্ট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশীয় উৎপাদক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, সাধারণ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্টল।
মেলায় দর্শনার্থীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ পরিবহন সুবিধা রাখা হয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড, ফার্মগেট, খামারবাড়ি, খেজুরবাগান ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী থেকে বিআরটিসির দুই শতাধিক বিশেষ শাটল বাস চলাচল করছে। এসব শাটল বাসের মাধ্যমে স্বল্প সময় ও স্বাচ্ছন্দ্যে মেলা প্রাঙ্গণে পৌঁছাতে পারছেন দর্শনার্থীরা।





