আশুলিয়া নেশার খোলা বাজার
পাড়া-মহল্লায় হাত বাড়ালেই ইয়াবা-গাঁজা, অদৃশ্য ছত্রচ্ছায়ায় নির্বিঘ্ন কারবার
শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় মাদক এখন আর গোপন কোনো অপরাধ নয়, এটি প্রকাশ্য বাস্তবতা। সন্ধ্যা নামলেই পাড়া-মহল্লায় শুরু হয় ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইনের কেনাবেচা। নির্দিষ্ট পয়েন্ট, নির্দিষ্ট সময় আর পরিচিত মুখ। এলাকাবাসীর ভাষায়, এখানে মাদক কিনতে পুলিশ ভয় নেই, শুধু ঠিকানা জানা থাকলেই হয়।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, আশুলিয়ার বাইপাইল, চারাল পাড়া, বসুন্ধরা সংলগ্ন এলাকা, নিরিবিলি ও কাইছা বাড়ি এলাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ মাদক সরবরাহ চক্র। দিনের আলোতে নীরব থাকলেও সন্ধ্যার পর সক্রিয় হয়ে ওঠে এই নেটওয়ার্ক।
আরও পড়ুন: জানুয়ারিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮৭ নিহত, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনাই শীর্ষে
স্থানীয় বাসিন্দা, ভুক্তভোগী পরিবার ও একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাইপাইল আমবাগান বালির মাঠ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গাঁজা বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে পারভীন নামে এক নারীর বিরুদ্ধে। গাঁজাসহ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে ফের মাদক কারবারে জড়ান বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, পারভীনের অধীনে ১০–১২ জন কিশোর ও যুবক দৈনিক হাজিরাভিত্তিতে গাঁজা বিক্রি করে।
চারাল পাড়ায় ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইন সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে কুলসুম ও তার ছেলে রিপনের বিরুদ্ধে। তারাও একাধিকবার ইয়াবাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
আরও পড়ুন: নেত্রকোনা সাফ জয়ী সেঁজুতির সংবর্ধনা ও অ্যাথলেটিকস প্রশিক্ষণের সমাপনী
অন্যদিকে বসুন্ধরা এলাকায় ইয়াবা ডিলার হিসেবে পরিচিত রাজু, নিরিবিলি এলাকায় বাবুল এবং কাইছা বাড়ি এলাকায় সেলিমের নামও এলাকাবাসীর অভিযোগে বারবার উঠে আসছে। তবে মাদক সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে তুলনামূলকভাবে বড় পরিসরের অভিযান চোখে পড়ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মাদক বিক্রি হয় মূলত সন্ধ্যা ৭টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। মোটরসাইকেলে দ্রুত লেনদেন, বাসাবাড়ির ভেতরে অস্থায়ী ডেলিভারি পয়েন্ট এবং নজরদারি এড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি বিক্রি না করে মোবাইল ফোনে অর্ডার নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে মাদক।
স্থানীয় বাসিন্দা আনিসুল ইসলাম বলেন,আজ যাকে ইয়াবা নিতে দেখি, কয়েক মাস পর তাকেই চুরি বা ছিনতাইয়ে নামতে দেখি। এটা এখানে নিয়ম হয়ে গেছে।
সোহেল স্কয়ার হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, আশুলিয়া এলাকা মাদকের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। তার হাসপাতালে নিয়মিত কিশোর ও যুবকরা চিকিৎসা নিতে আসে, যাদের অধিকাংশই মাদকাশক্ত। নেশাগ্রস্ত তরুণদের মধ্যে মানসিক অবসাদ, আগ্রাসী আচরণ ও অপরাধপ্রবণতা দেখা যায়। অনেকেই কারখানার চাকরি হারিয়ে অনিশ্চিত জীবনে জড়িয়ে পড়ছে।
হাবিবুর রহমান নামের এক অভিভাবক বলেন,ছেলে কাজে যেত, এখন দিনরাত ঘরে থাকে না। মাদক ছাড়া কিছু বোঝে না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝে মধ্যে অভিযান চালালেও স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অভিযান বেশিরভাগ সময়ই খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। মূল কারবারিরা আগেভাগেই সতর্ক হয়ে যায়। অভিযানের আগে তথ্য ফাঁস হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এলাকাবাসীর মতে, আশুলিয়াকে মাদকমুক্ত করতে হলে কেবল অভিযান নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি, মাদক কারবারিদের অর্থনৈতিক উৎস শনাক্ত, কিশোর ও তরুণদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না হলে নেশার এই নীরব আগ্রাসন থামবে না।
এ বিষয়ে আশুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ রুবেল হাওলাদার বলেন, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে পুলিশ।





