চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রপাতের মর্মান্তিক থাবা

আম কুড়াতে, গরু আনতে, ঘাস কেটে ফেরার পথে নিভল ছয়টি প্রাণ

Sanchoy Biswas
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৯:২৬ অপরাহ্ন, ০৪ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১০:৩১ অপরাহ্ন, ০৪ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কয়েকটি পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে কেউ গিয়েছিলেন আম কুড়াতে, কেউ মাঠ থেকে গরু আনতে, আবার কেউ ঘাস কেটে বাড়ি ফিরছিলেন। কিন্তু এক বিকেলের বজ্রপাত কেড়ে নিয়েছে তিন নারীসহ ছয়জনের প্রাণ। মুহূর্তেই আনন্দের প্রস্তুতি বদলে গেছে স্বজন হারানোর বেদনায়।

 বৃহস্পতিবার বিকেলে জেলার সদর, শিবগঞ্জ ও নাচোল উপজেলায় এসব মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে কিশোর, তরুণ ও গৃহিণী রয়েছেন। আকস্মিক এ দুর্ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোতে।

আরও পড়ুন: বাউফলে অসহায় তিন প্রতিবন্ধী ভাইয়ের পাশে বিএনপি, মানবিক উদ্যোগে প্রশংসায় এলাকাবাসী

সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তারা জানান, সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের আতাহার এলাকার মো. রাব্বিলের ছেলে আবদুল্লাহ (১৭) বিকেলে বৃষ্টির মধ্যে মাঠে গরু আনতে যান। এ সময় হঠাৎ বজ্রপাত হলে তিনি গুরুতর আহত হন। স্থানীয় লোকজন দ্রুত তাকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। বজ্রপাতে তার সঙ্গে থাকা গরুটিও মারা যায়।

সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একরামুল হোসাইন বলেন, পরিবারের কাজে মাঠে গিয়ে এই কিশোর বজ্রপাতের শিকার হয়। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়েছিল।

আরও পড়ুন: নিকলীতে অবৈধ বালু উত্তোলনে অভিযান, ড্রেজার জব্দ ও ২ লাখ টাকা জরিমানা

অন্যদিকে শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বজ্রপাতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন চককীর্তি ইউনিয়নের চকনরেন্দ্র গ্রামের আবদুর রবের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার, রানীবাড়ি-বাজারপাড়ার আবুল কাশেমের মেয়ে সাদিয়া খাতুন এবং মোবারকপুর ইউনিয়নের শিকারপুর দক্ষিণপাড়ার ফিটু আলীর ছেলে মো. মেসবাউল।

শিবগঞ্জ থানার ওসি মতিউর রহমান জানান, ঝড়-বৃষ্টির সময় বাড়িসংলগ্ন আমবাগানে আম কুড়াতে গিয়ে বজ্রপাতের শিকার হন ওই তিনজন। স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও তাদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

জেলার অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমচাষ ও আম সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত হাজারো মানুষ বর্ষাকালে প্রতিদিন বাগানে কাজ করেন। তবে বজ্রপাতের ঝুঁকি উপেক্ষা করে ঝড়-বৃষ্টির সময় বাগানে অবস্থান করায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

এদিকে নাচোল উপজেলায় বজ্রপাতে মারা গেছেন দুইজন। তাঁদের একজন উপজেলার লাহাবাড়ি গ্রামের সুমিয়ারা বেগম। পরিবারের জন্য মাঠ থেকে ঘাস কেটে বাড়ি ফেরার পথে বৃষ্টির মধ্যে বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

নাচোল থানার ওসি সুকোমল চন্দ্র দেবনাথ জানান, একই উপজেলার গোসাইপুর গ্রামের মো. শফিউলের ছেলে হাসান আলী (লালু) আমবাগানে অবস্থানকালে বজ্রপাতে নিহত হন। পৃথক ঘটনায় দুইজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, বিকেলের ঝড়-বৃষ্টির সময় বজ্রপাতের ঘটনাগুলো ঘটে।

এদিকে শিবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত তিন পরিবারের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিকেল থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় দমকা হাওয়া ও বৃষ্টিপাত শুরু হয়। এর মধ্যেই একের পর এক বজ্রপাতের ঘটনায় কয়েকটি পরিবার মুহূর্তের মধ্যে তাদের স্বজন হারায়। ঈদ সামনে রেখে যখন পরিবারগুলো উৎসবের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন এমন আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়েছে।

আবহাওয়াবিদরা বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, গাছের নিচে এবং আমবাগানসহ উন্মুক্ত স্থানে অবস্থান না করার পরামর্শ দিয়ে আসছেন। তবে জীবিকার তাগিদে অনেকেই সেই ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। বৃহস্পতিবারের এই মর্মান্তিক ঘটনাও সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

এই সংস্করণটি জাতীয় দৈনিকের মানবিক ফিচারধর্মী নিউজ স্টাইলে লেখা, যেখানে শুধু তথ্য নয়, স্বজন হারানোর বেদনা ও সামাজিক বাস্তবতাও তুলে ধরা হয়েছে।