তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত
সারাদেশের ন্যায় নরসিংদীতেও দেখা দিয়েছে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট। এতে করে নরসিংদীতে বসবাসকারী মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি দেখা দিয়েছে পরিবহনের তীব্র সংকট।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শহর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় চুলা জ্বলছে না। সিএনজি স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও গাড়িগুলো গ্যাস পাচ্ছে না। এছাড়াও শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।
আরও পড়ুন: পটুয়াখালীতে সিরীয় নাগরিকের রহস্যজনক মৃত্যু, মরদেহ উদ্ধার
শহরের বাসিন্দা লিজা রহমান জানান, গত তিনদিন ধরে গ্যাস পাচ্ছি না। একটু-আধটু গ্যাস আসলেও তা দিয়ে রান্নাবান্নার কাজ করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। তিনি আরও জানান, গত তিনদিন ধরে গৃহকর্তাকে সকালের নাস্তা না করে এবং দুপুরের খাবার না নিয়েই কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে। আর পরিবারের সদস্যদেরও একই অবস্থা। এভাবে চলতে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে।
পাশের এলাকার সালমা আক্তার জানান, গ্যাস নিয়ে চলছে লুকোচুরি। কখন আসে আর কখন যায় বলতে পারি না। রান্না করতে গেলে গ্যাস থাকে না। প্রতিদিন বাইরে থেকে খাবার কিনে খাওয়া আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন: বগুড়ায় দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে দুই ভাই আহত
এক সিএনজি চালক জানান, একটু গ্যাসের আশায় সকাল ৫টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এখন বাজে সকাল ৯টা। তারপরও গ্যাস মিলছে না।
ট্রাকচালক ফারুক মিয়া বলেন, গ্যাসের জন্য পাম্পে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি ভোরবেলা থেকে। গাড়িতে কাঁচামাল। পাম্পে দীর্ঘ লাইন। এখনও পর্যন্ত গ্যাস নিতে পারিনি। কখন নিতে পারব তাও জানি না। সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারলে মালামাল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
চৌয়ালা শিল্প এলাকার এক সাইজিং কারখানার কর্মকর্তা বলেন, গত কয়েকদিন ধরে শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। গ্যাস না থাকার কারণে আমরা ঠিকমতো উৎপাদন করতে পারছি না। গ্যাসের কারণে অধিকাংশ কারখানা বন্ধ রয়েছে।
গ্যাস সংকটের কারণে একদিকে যেমন আবাসিক গ্রাহকদের রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে সিএনজিচালক, শিল্প উদ্যোক্তা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন-সংশ্লিষ্টরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। দ্রুত এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা সমাধান করে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এদিকে গ্যাসের পাশাপাশি নতুন করে যোগ হয়েছে বিদ্যুতের সংকট। পুরো জেলা জুড়ে বিদ্যুৎ সংকটের ফলে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে জীবনযাত্রা। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলগুলোতে এর প্রভাব বেশি দেখা দিয়েছে। অঞ্চল বা ফিডারভিত্তিক লোডশেডিংয়ের কোনো নির্দিষ্ট সময় বা নিয়মনীতি নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যখন ইচ্ছে তখনই লোডশেডিংয়ের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। এতে করে কলকারখানা, অফিস-আদালতের কাজ স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে কলকারখানা ও আবাসিক গ্রাহকদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
চৌয়ালার এক পাওয়ারলুম শ্রমিক বলেন, আমরা প্রোডাকশনে কাজ করি। এভাবে বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করলে আমাদের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। গত দুই দিনে ৮টি মেশিন চালিয়ে মাত্র ৩২০ গজ কাপড় উৎপাদন করেছি। এভাবে চলতে থাকলে পরিবার-পরিজন নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে।
এক পাওয়ারলুম ফ্যাক্টরির মালিক বলেন, বিদ্যুতের কারসাজির কারণে আমরা মিলমালিকরা পথে বসতে যাচ্ছি। আয়ের তুলনায় দিন দিন ব্যাংকসহ অন্যান্য খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করছি।
বিদ্যুতের আবাসিক গ্রাহক সাদিকুর রহমান বলেন, বিদ্যুতের লুকোচুরি আর ভালো লাগে না। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া, ঘরের ভেতর অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা-মা রয়েছেন। লোডশেডিংয়ের কারণে কারওই ঠিকমতো ঘুম হচ্ছে না। না ঘুমানোর কারণে দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়ছি। তিনি আরও বলেন, চাহিদা মোতাবেক বিদ্যুৎ পাচ্ছি না, আবার বিলের বেলায় ভুতুড়ে বিল ঠিকই আছে। এত লোডশেডিং হচ্ছে, মাস শেষে কিন্তু তাদের ভুতুড়ে বিল ঠিকই থাকবে—এমনভাবেই বলছিলেন তিনি।
এদিকে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্টজনরা জানান, কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এ কারণে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহক গ্যাস সংকটের মুখে পড়বেন।
অপরদিকে নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার জানান, গত ২৩ জুলাই নারায়ণগঞ্জের ভুলতা গ্রিডের কাছাকাছি ভুলতা-টু-নরসিংদী ১৩২ কেভি জাতীয় সঞ্চালন লাইনের Y ফেজের তার ছিঁড়ে গেছে। বিকল্পভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নরসিংদী গ্রিড উপকেন্দ্র চালু আছে। উক্ত লাইনের সক্ষমতা কম থাকায় বর্তমানে নরসিংদী গ্রিড থেকে ১৯০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৯০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট লোড সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে নরসিংদী সদর, রায়পুরা, শিবপুর, মনোহরদী ও বেলাবো উপজেলাসমূহে প্রায় ৫০ শতাংশ লোডশেডিং করতে হচ্ছে। আগামী ২/৩ দিনের মধ্যে উক্ত সঞ্চালন লাইনের তার পরিবর্তন করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।





