নিয়োগ জালিয়াতি ও রাষ্ট্রীয় অর্থ হরিলুট: পিরোজপুরের শহীদ জিয়া কলেজে ১০ বছর ধরে ভুয়া শিক্ষকদের রাজত্ব

Shahrier Islam Pallab
পিরোজপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৮:১৯ অপরাহ্ন, ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৯:৩৫ অপরাহ্ন, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

জাল স্বাক্ষর আর ভুয়া সিল ব্যবহার করে পিরোজপুরের নাজিরপুর শহীদ জিয়া কলেজে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ বাগিয়ে নেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির তথ্য উঠে এসেছে। জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়ে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে সরকারি কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলে আসছেন রতন মন্ডল, পলাশ সাহা ও অনুপ হালদার নামের তিন তথাকথিত শিক্ষক।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই নিয়োগ জালিয়াতির মূল হোতা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও তৎকালীন কলেজ সভাপতি একেএম আউয়াল। অভিযোগ রয়েছে, তিনি মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে এই তিনজনকে ভুয়া নিয়োগ দেন এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পূর্বের নাম 'শহীদ জিয়া কলেজ' পরিবর্তন করে 'নাজিরপুর কলেজ' রাখেন। গত ৫ই আগস্টের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর থেকে প্রভাবশালী এই নেতা আত্মগোপনে রয়েছেন।

আরও পড়ুন: হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ ওয়াকফ এস্টেট নিয়ে অপপ্রচার

নিয়োগ বোর্ডের নথিপত্রে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালকের প্রতিনিধি (ডিজি নমিনি) হিসেবে দেখানো হয়েছিল সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যাপক আবদুল জলিল আকনের নাম ও স্বাক্ষর। তবে বিষয়টি সম্প‚র্ণ অস্বীকার করে অধ্যাপক জলিল আকন জানান, নথির ওই স্বাক্ষর ও সিল তাঁর নয়। পুরো নিয়োগ বোর্ডটিই ছিল ভুয়া এবং তারা জালিয়াতির মাধ্যমে সিল-সই নকল করেছে। একইভাবে বিষয় বিশেষজ্ঞ ডক্টর সফিকুল ইসলামের ভুয়া সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।

চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে কলেজের প্রশাসনিক পদেও। জালিয়াতির নথিতে ঘটনার সময়ে নারায়ণ চন্দ্র হালদারকে কলেজের সদস্য সচিব ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দেখানো হলেও, বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষকদের দাবি নারায়ণ চন্দ্র কখনো এই প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলেনই না। এ বিষয়ে জানতে নারায়ণ চন্দ্রের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘ব্যস্ত আছেন’ বলে কল কেটে ফোন বন্ধ করে দেন। এছাড়া ঘটনার বিষয়ে কলেজের বর্তমান সভাপতি মো. মিজানুর রহমান বাবুর যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আরও পড়ুন: কুলাউড়ায় সরকারি জায়গা দখলের চেষ্টা, যুবককে ১৫ দিনের কারাদণ্ড

জালিয়াতির বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকদের মুখোমুখি হলে তারা প্রথমে ক্ষোভ প্রকাশ ও হুমকি প্রদান করেন। নিয়োগের বৈধ কাগজপত্র দেখতে চাইলে তারা তা দেখাতে ব্যর্থ হন। অভিযুক্ত অনুপ হালদার শুরুতে কাগজ আছে দাবি করলেও পরে তা অস্বীকার করেন। পরবর্তীতে ঘটনা ধামাচাপা দিতে কলেজের শিক্ষক প্রতিনিধি সদরুল আলম মল্লিক শাহিন সাংবাদিকের পকেটে টাকা গুঁজে দিয়ে মীমাংসার প্রস্তাব দেন এবং সাংবাদিক টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানালে সাংবাদিককে সরাসরি হুমকি প্রদান করা হয়।

এদিকে, জালিয়াতির পাশাপাশি অভিযুক্ত শিক্ষক অনুপ হালদারের বিরুদ্ধে নারী শিক্ষার্থীদের কুপ্রস্তাব দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। পূর্বে গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশিত হলে তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও পরবর্তীতে প্রভাব খাটিয়ে তা ধামাচাপা দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

কলেজ সূত্রে জানা যায়, পূর্বে এই নিয়োগ নিয়ে গঠন করা তদন্ত কমিটি অদৃশ্য কারণে আংশিক রিপোর্ট জমা দিয়েছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই কমিটির এক সদস্য জানান, নিয়োগে গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে এবং প্রমাণিত হলে নিয়োগ বাতিলসহ গৃহীত বেতন-ভাতা ফেরত দিতে হবে। একই সঙ্গে তদন্ত কমিটির অন্য সদস্য প্রভাষক মশিউর রহমান স্পষ্ট জানান, এই বিতর্কিত নিয়োগের সাথে এনটিআরসিএ-এর কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মশিউর কবির জানান, সরকারি নিয়োগ নথিতে জাল স্বাক্ষর বা সিল ব্যবহারের অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনে ৭ বছরের কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। একই সাথে অবৈধভাবে উত্তোলিত সমুদয় অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পিরোজপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ইদ্রিস আলী আযিযী জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ সাপেক্ষে তদন্ত করে বিধি মোতাবেক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কাগজে-কলমে সব নিয়ম মানার ভান করা হলেও আদতে এটি ছিল রাষ্ট্রীয় অর্থ হরিলুটের এক নিখুঁত মঞ্চায়ন। জালিয়াতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের চোখ ফাঁকি দেওয়া এসব ভুয়া শিক্ষক ও তাদের মদদদাতাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কখন আইনি পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটাই দেখার জন্য আগ্রহী নাজিরপুরবাসী।