চিকিৎসক সংকটে ব্যাহত সেবা
রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বেহাল দশা
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পুরোনো ভবনটি দীর্ঘদিনের ব্যবহারে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ভবনের বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়ছে, দেয়াল ও ছাদ বেয়ে বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ছে। কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল। এতে হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী, তাঁদের স্বজন এবং দায়িত্ব পালনকারী স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। যেকোনো সময় ভবনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ভেঙে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
অন্যদিকে, হাসপাতালটিতে অপারেশন থিয়েটার (ওটি) থাকলেও চিকিৎসক সংকটের কারণে নিয়মিত অস্ত্রোপচার কার্যক্রম পরিচালনা করা যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। ফলে জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে রোগীদের রায়পুর থেকে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। জরাজীর্ণ অবকাঠামো, চিকিৎসক সংকট ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
আরও পড়ুন: বগুড়ার দুই থানায় নতুন ওসি, বদলি আরও ৫ পুলিশ কর্মকর্তা
সরেজমিনে হাসপাতাল পরিদর্শন এবং রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুটি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে পুরোনো ভবনটি ১৯৯২ সালে নির্মিত হয়। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে ভবনটির বিভিন্ন অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। দেয়াল ও ছাদের বিভিন্ন স্থানে ফাটল, পলেস্তারা খসে পড়া এবং বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে।
হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি রোগীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। চিকিৎসা নিতে এসে অসুস্থতার পাশাপাশি ভবনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ থেকে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকতে হচ্ছে রোগীদের। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য এমন পরিবেশ বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘নতুন জীবনের’ খোঁজে বাড়ি থেকে পালায় চার স্কুলছাত্রী, উদ্ধার হবিগঞ্জে
হাসপাতালে প্রতিদিন বিভিন্ন বয়সের রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কেউ বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন, কেউ ভর্তি থেকে সেবা গ্রহণ করেন। রোগীদের পাশাপাশি তাঁদের স্বজনদেরও দীর্ঘ সময় হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করতে হয়। ফলে ভবনের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় আগে নির্মিত পুরোনো ভবনটির বিভিন্ন অংশে এখন দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি দেখা যাচ্ছে। দেয়াল ও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়া এবং বৃষ্টির পানি প্রবেশের কারণে ভবনটির পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে বড় ফাটল দেখা দেওয়ায় রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ভবনটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে ভবনটির প্রকৃত কাঠামোগত অবস্থা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগের মাধ্যমে কারিগরি পরীক্ষা ও মূল্যায়ন প্রয়োজন। শুধু দৃশ্যমান ফাটল দেখে ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। তাই দ্রুত পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সংস্কার, মেরামত কিংবা পুনর্নির্মাণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি উঠেছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ভবনের ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। এতে হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রোগী ও কর্মীদের নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হতে পারে।
রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপারেশন থিয়েটার থাকলেও চিকিৎসকসংকটের কারণে অস্ত্রোপচার কার্যক্রম পরিচালনা করা যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারসেবা না পেয়ে রোগীদের অন্য হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
বিশেষ করে দুর্ঘটনা, প্রসূতিজনিত জটিলতা কিংবা অন্যান্য জরুরি শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রায়পুর থেকে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে স্থানান্তরিত হতে হলে রোগী ও স্বজনদের সময়, অর্থ এবং যাতায়াতসংক্রান্ত বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হয়।
জরুরি রোগীর ক্ষেত্রে সময়মতো উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই হাসপাতালটিতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নিয়োগ, অস্ত্রোপচার কার্যক্রম চালুর উপযোগী জনবল নিশ্চিত করা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা শক্তিশালী করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা চিকিৎসাসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কিন্তু ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল, পলেস্তারা খসে পড়া এবং বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ার মতো সমস্যায় রোগীদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে।
রোগীদের অভিযোগ, চিকিৎসা নিতে এসে তাঁরা এমন পরিবেশ প্রত্যাশা করেন না, যেখানে ভবনের অবস্থা নিয়েও দুশ্চিন্তা করতে হয়। হাসপাতালটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র হওয়ায় এর অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি প্রবেশের সমস্যা বাড়লে রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। এ ছাড়া ছাদ বা দেয়ালের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ থেকে পলেস্তারা খসে পড়লে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ কারণে ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সেবাপ্রত্যাশীরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসাস্থল। অনেক রোগী আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে দূরের হাসপাতালে যেতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় হাসপাতালের অবকাঠামো ও চিকিৎসাসেবার মান উন্নত করা অত্যন্ত জরুরি।
তাঁরা মনে করেন, পুরোনো ভবনের সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকলে একসময় তা বড় ধরনের সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত ভবনটির অবস্থা পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ শুরু করা এবং চিকিৎসকসংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
সচেতন মহলের মতে, একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স শুধু চিকিৎসা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই হাসপাতালের অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, প্রথমে প্রকৌশলীদের মাধ্যমে পুরোনো ভবনের কাঠামোগত অবস্থা পরীক্ষা করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে প্রয়োজনে সেসব স্থানে রোগীদের প্রবেশ সীমিত করা, বিকল্প নিরাপদ স্থানে চিকিৎসাসেবা চালু রাখা এবং দ্রুত সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার সচল করতে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, অ্যানেসথেসিয়া-সংশ্লিষ্ট জনবল, নার্স ও অন্যান্য সহায়ক কর্মীর প্রাপ্যতা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, শুধু ভবন নির্মাণ বা সংস্কার করলেই হবে না; প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করে সেবার মানও বাড়াতে হবে।
রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাঈমা নুসরাত জাবীন বলেন, “হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং চিকিৎসকস্বল্পতার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।”
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হাসপাতালের অবকাঠামোগত সমস্যা ও চিকিৎসকসংকটের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়েছে। তবে ভবনটির সংস্কার, পুনর্নির্মাণ কিংবা চিকিৎসক নিয়োগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বা পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পুরোনো ভবনের অবকাঠামোগত সমস্যা এবং চিকিৎসকসংকট স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে—পুরোনো ভবনের কারিগরি পরীক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ অংশে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ এবং অপারেশন থিয়েটার চালুর উপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ।
এবিষয়ে স্থানীয় সচেতন মহল জানিয়েছেন, হাসপাতালটির অবকাঠামো ও চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা দ্রুত দূর করা গেলে স্থানীয় মানুষের ভোগান্তি কমবে এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য দূরের হাসপাতালে ছুটে যাওয়ার প্রয়োজনও কমতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে নিরাপদ, আধুনিক ও জনবান্ধব চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দা, রোগী ও সচেতন মহলের।





