মানবসম্পদের অপচয়-প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষমতা
অপচয় হওয়া একটি জনসংখ্যাগত সম্ভাবনা বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ১৭ কোটিরও বেশি জনসংখ্যা নিয়ে,যার ৬০ শতাংশের বেশি কর্মক্ষম বয়সের,দেশটি প্রায়ই “জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ” বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড উপভোগ করছে বলে দাবি করা হয়। তাত্ত্বিকভাবে, এই জনসংখ্যাগত কাঠামো দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং সামাজিক রূপান্তরের ভিত্তি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। উন্নয়নের চালিকাশক্তি হওয়ার পরিবর্তে মানবসম্পদ আজ ক্রমেই বোঝায় পরিণত হচ্ছে,প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষমতা, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং নীতিগত স্থবিরতার কারণে।
বাংলাদেশে মানবসম্পদের অপচয় কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি কাঠামোগত। দুর্বল শাসন, বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, সামাজিক জড়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার অভাব,সবকিছু মিলেই এই সংকট সৃষ্টি করেছে। লক্ষ লক্ষ সক্ষম মানুষ বেকার বা অর্ধ-বেকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে, আর রাষ্ট্র একদিকে দক্ষতা আমদানি করছে, অন্যদিকে তার সবচেয়ে মেধাবীদের দেশ ছাড়তে দেখছে।
আরও পড়ুন: একজন শরিফ ওসমান হাদি: আজ লক্ষ হাদিতে রূপান্তর
এই প্রবন্ধে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনৈতিক বা অবকাঠামোগত নয়,বরং মানবসম্পদ চিহ্নিত, উন্নয়ন ও ব্যবহার করতে রাষ্ট্রীয় অক্ষমতাই মূল সমস্যা। এই ব্যর্থতা যদি জরুরি ভিত্তিতে ও সৎভাবে মোকাবিলা না করা হয়, তবে তথাকথিত জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ ভয়াবহ জনসংখ্যাগত বিপর্যয়ে রূপ নেবে।
মানবসম্পদ: একটি জাতীয় সম্পদ হিসেবে উপলব্ধি
আরও পড়ুন: নির্মল সেন: এক নির্মোহ বিপ্লবীর মহাকাব্য ও গণমানুষের দণ্ডায়মান বিবেক
মানবসম্পদ কেবল কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যান নয়; এটি জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, অভিযোজন ক্ষমতা এবং শ্রমশক্তির সমষ্টি। আধুনিক অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হলো মানবসম্পদ।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো দেশ,যাদের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত,মানবসম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতায় বিনিয়োগ করেই অভূতপূর্ব উন্নয়ন করেছে। অথচ বাংলাদেশ এখনো মূলত স্বল্পমূল্যের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষত পোশাক শিল্প ও প্রবাসী শ্রমের মাধ্যমে। এই উন্নয়ন মডেল কম দক্ষতা ও কম মজুরিকে স্থায়ী করেছে, উদ্ভাবন বা মেধাকে উৎসাহিত করেনি।
ফলাফল হলো এক চরম বৈপরীত্য,প্রতি বছর হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে, অথচ স্বাস্থ্য, প্রকৌশল, প্রযুক্তি, গবেষণা ও প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে।
বেকারত্ব, অর্ধ-বেকারত্ব ও লুকানো কর্মহীনতাঃ-
বাংলাদেশের সরকারি বেকারত্ব পরিসংখ্যান প্রকৃত পরিস্থিতি প্রতিফলিত করে না। অর্ধ-বেকারত্ব ও অনানুষ্ঠানিক খাত বিবেচনায় নিলে বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ।
অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ তাদের যোগ্যতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাজে নিযুক্ত। প্রকৌশলী রাইড শেয়ারিং চালান, বিজ্ঞান বিভাগের গ্র্যাজুয়েট বিক্রয়কর্মী হন, মাস্টার্স ডিগ্রিধারীরা তৃতীয় শ্রেণির চাকরির জন্য লাইনে দাঁড়ান। এটি সময়, অর্থ ও সম্ভাবনার ভয়াবহ অপচয়।
তরুণদের জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে সংকটময়। প্রতিবছর লক্ষাধিক গ্র্যাজুয়েট শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি সীমিত ও স্বল্প-দক্ষ খাতে কেন্দ্রীভূত। এর ফল হতাশা, মানসিক চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং কখনো কখনো অপরাধ বা চরমপন্থার ঝুঁকি।
শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা: মান নয়, কেবল সংখ্যাঃ-
মানবসম্পদ অপচয়ের অন্যতম মূল কারণ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। গত কয়েক দশকে শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বেড়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু গুণগত মান, প্রাসঙ্গিকতা ও কৌশলগত পরিকল্পনা বাড়েনি।
পাঠ্যক্রম ও শ্রমবাজারের অসামঞ্জস্যঃ-
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনা না করেই সনাতন বিষয়ে গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে। অন্যদিকে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষাকে অবহেলা করা হচ্ছে। নিয়োগকর্তারা অভিযোগ করেন,গ্র্যাজুয়েটদের বাস্তব দক্ষতা, সমস্যা সমাধান ক্ষমতা ও পেশাগত প্রস্তুতি নেই।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত ও সরকারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নেই। ফলে পাঠ্যক্রম পুরনো, গবেষণা জাতীয় চাহিদা থেকে বিচ্ছিন্ন, আর শিক্ষার্থীরা বাস্তবতার মুখোমুখি হতে অপ্রস্তুত।
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার অবহেলাঃ-
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাংলাদেশের কর্মসংস্থান কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত ছিল। বাস্তবে এটি সামাজিকভাবে অবমূল্যায়িত, অবকাঠামোগতভাবে দুর্বল এবং বিনিয়োগহীন। অনেক অভিভাবক এটিকে “নিম্নমানের শিক্ষা” হিসেবে দেখেন, যদিও বাস্তবে এটি বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ দেয়।
প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নতা ও শাসন ব্যর্থতাঃ-
বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা খণ্ডিত, দায়িত্বের ওভারল্যাপ ও দুর্বল জবাবদিহিতায় ভরা। শিক্ষা, শ্রম, যুব, প্রবাসী কল্যাণ ও শিল্প মন্ত্রণালয়গুলো আলাদা আলাদা পথে চলে। কোনো সমন্বিত জাতীয় মানবসম্পদ কৌশল নেই ।
কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অদক্ষতা, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতিতে জর্জরিত। প্রয়োজন নিরূপণ ছাড়াই প্রকল্প নেওয়া হয়, মূল্যায়ন ছাড়াই অর্থ ব্যয় হয়, ফলাফল পরিমাপ হয় না।
যোগ্যতার বদলে আনুগত্য প্রাধান্য পায়। দক্ষরা উপেক্ষিত হন, অযোগ্যরা রাজনৈতিক সংযোগে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেন। এতে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, মেধাবীরা হতাশ হয়।
মেধা পাচার: শ্রেষ্ঠ মস্তিষ্কের দেশত্যাগঃ-
প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সবচেয়ে দৃশ্যমান ফল হলো মেধা পাচার। প্রতিবছর হাজার হাজার ডাক্তার, প্রকৌশলী, গবেষক ও প্রযুক্তিবিদ দেশ ছাড়েন। এটি দ্বিগুণ ক্ষতি—রাষ্ট্র তার শিক্ষায় বিনিয়োগ হারায় এবং ভবিষ্যৎ অবদান থেকেও বঞ্চিত হয়।
রেমিট্যান্স স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতি চাঙ্গা করলেও দীর্ঘমেয়াদে মেধা ক্ষয়ের ক্ষতি পূরণ করতে পারে না।
লিঙ্গ বৈষম্য ও অন্তর্ভুক্তির অভাবঃ-
মানবসম্পদ অপচয় লিঙ্গভিত্তিকও। নারীদের শিক্ষায় অগ্রগতি সত্ত্বেও শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ কম। সামাজিক বাধা, নিরাপত্তাহীনতা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও শিশু যত্নের অভাব নারীদের পিছিয়ে রাখে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও অবকাঠামোগত অপ্রাপ্যতা, সামাজিক কলঙ্ক ও নীতিগত অবহেলায় বাদ পড়ে যান। এভাবে রাষ্ট্র নিজেই তার সম্ভাবনার বড় অংশ বাতিল করছে।
গ্রাম–শহর বৈষম্য ও আঞ্চলিক অসমতাঃ-
কর্মসংস্থান সুযোগ মূলত ঢাকা ও কয়েকটি শহরে কেন্দ্রীভূত। গ্রামীণ এলাকায় সুযোগ কম, অবকাঠামো দুর্বল। ফলে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন, নগর জট ও বৈষম্য বাড়ছে।
বিকেন্দ্রীভূত উন্নয়ন এ সমস্যার সমাধান হতে পারে কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা, যা অনুপস্থিত।
অযোগ্যতার রাজনৈতিক অর্থনীতিঃ-
এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে অযোগ্যতার রাজনৈতিক অর্থনীতি। যখন আনুগত্য যোগ্যতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়, তখন মানবসম্পদ অবধারিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নীতি নির্ধারণ হয় প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ নয়, রাজনৈতিক হিসাবের ভিত্তিতে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে কৌশল বদলায়। জাতীয় স্বার্থ দলীয় স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে।
আসন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক বিপর্যয়ঃ-
এই প্রবণতা চলতে থাকলে ঝুঁকি ভয়াবহ। বেকার ও হতাশ তরুণ সমাজ কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়,এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক বিস্ফোরণের ঝুঁকি।
জনসংখ্যাগত সুযোগ চিরস্থায়ী নয়। বয়স বাড়লে হারানো সুযোগের মূল্য আরও বাড়বে।
সমাধানের পথ: সক্ষমতাকে কার্যকর সক্ষমতায় রূপান্তর
এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত ও সাহসী পদক্ষেপ।
১. জাতীয় মানবসম্পদ কৌশল
দলনিরপেক্ষ, দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন।
২. শিক্ষা সংস্কার
আধুনিক পাঠ্যক্রম, কারিগরি শিক্ষার মূলধারায় অন্তর্ভুক্তি, শিল্প–বিশ্ববিদ্যালয় সংযোগ।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি
মেধাভিত্তিক নিয়োগ, জবাবদিহি ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
৪. অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান
নারী, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক নীতি।
৫. বিকেন্দ্রীভূত উন্নয়ন
গ্রামীণ শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক কর্মসংস্থান।
উপসংহার: বিলম্বের সুযোগ নেই
বাংলাদেশের মানবসম্পদ একটি টাইম বোমা—সঠিকভাবে ব্যবহার হলে এটি উন্নয়নের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে, আর অবহেলা করলে সামাজিক অস্থিরতা ডেকে আনবে।
প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষমতা নিয়তি নয়, এটি পরিবর্তনযোগ্য। তবে তার জন্য প্রয়োজন সততা, সাহস এবং দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে স্লোগানে নয়, বরং দেশের জনগণকে কতটা মূল্যায়ন, উন্নয়ন ও ব্যবহারে সক্ষমতার উপর।





