টাঙ্গুয়ার হাওর: বরাদ্দ নয়, বদলাতে হবে ব্যবস্থাপনার দর্শন
২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে টাঙ্গুয়ার হাওরের বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণের জন্য 'কমিউনিটি-বেসড ম্যানেজমেন্ট অব টাঙ্গুয়ার হাওর ওয়েটল্যান্ড ইকোসিস্টেম' প্রকল্পে প্রায় ২৫৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে জিইএফ অনুদান প্রায় ৪৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং সহ-অর্থায়ন প্রায় ২০৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ বরাদ্দ। কিন্তু টাঙ্গুয়ার হাওরের ইতিহাস আমাদের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়- কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি হাওরের মাছ কমে, পাখি হারিয়ে যায়, বন উজাড় হয় এবং স্থানীয় মানুষের জীবনমানের অবনতি ঘটতে থাকে, তাহলে নতুন বরাদ্দের সাফল্যের নিশ্চয়তা কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের শুধু বাজেটের অঙ্ক নয়, গত দুই দশকের ইতিহাসের দিকেও তাকাতে হবে।
আরও পড়ুন: 'সুশাসনের অগ্নিপরীক্ষা: কঠোর প্রশাসনিক নীতি বনাম মাঠপর্যায়ে পুলিশের নির্লিপ্ততা'
১৯৯৯ সালে প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারি বিশ্বের ১০৩১টি রামসার সাইটের মধ্যে দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট হিসেবে ঘোষিত টাঙ্গুয়ার হাওরকে
সুরক্ষার বদলে দিন দিন অরক্ষিত পর্যায়েই ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। হাওরটিকে সঙ্কটাপন্ন এলাকা ঘোষণার মাধ্যমে লুপ্ত হয় দীর্ঘ প্রায় ৭০ বছরের ইজারা প্রথার। ২০০৩ সালে এর নিয়ন্ত্রণ নেয় জেলা প্রশাসন। উদ্দেশ্য হাওর এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, সম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।
আরও পড়ুন: এ যেন স্বপ্নজয়ের আনন্দ!
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও আইনি সুরক্ষা সত্ত্বেও টাঙ্গুয়ার হাওর ক্রমাগত চাপের মুখে পড়েছে। ২০০৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে দেশি-বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোতে শতাধিক কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। গঠিত হয়েছে সমিতি, কমিটি ও সহ-ব্যবস্থাপনা কাঠামো। অসংখ্য কর্মশালা, প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- এসবের বাস্তব ফল কী?
সরকারি মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং স্থানীয় বাস্তবতা ইঙ্গিত করে যে প্রকল্পগুলো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। প্রকল্প শেষ হয়েছে, কিন্তু প্রকল্পভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো টেকেনি।
কাগজে-কলমে অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তা স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারেনি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হাওরপাড়ের মানুষের জীবিকার ওপর প্রকৃত কোনো রূপান্তরমূলক প্রভাব সৃষ্টি হয়নি।
এখানেই অতীতের সবচেয়ে বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে। পরিবেশ সংরক্ষণকে মানুষের জীবন-জীবিকা থেকে আলাদা করে দেখলে কোনো প্রকল্পই সফল হতে পারে না। একজন জেলে, কৃষক বা দিনমজুরকে যদি বিকল্প আয়ের বাস্তব সুযোগ দেওয়া না হয়, তাহলে তিনি শেষ পর্যন্ত জীবিকার তাগিদেই প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করবেন। ফলে হাওর রক্ষার ভাষণ যতই উচ্চকিত হোক, বাস্তবতা বদলাবে না।
তাই টাঙ্গুয়ার হাওরের জন্য এবারের বরাদ্দ কার্যকর করতে হলে গতানুগতিক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তে দুটি অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
১. টাঙ্গুয়ার হাওরের বিলুপ্ত বা বিপন্ন মাছ ও উদ্ভিদের জাতসমূহের পুনরোৎপাদন, পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাস সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
২. হাওরের সম্পদ পুনরুদ্ধার, সুরক্ষা ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় হাওরের সম্পদ কেন্দ্রীক নির্ভরশীল হাজারো মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থান হতে পারে।
এছাড়া পরিবেশবান্ধব কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক শিল্পায়নের মাধ্যমে হবে বিকল্প কর্মসংস্থান। ডাকারি জোন, নেসেন্ট ব্রুড হ্যাচারি, ফিশ প্রসেসিং কারখানা, মাছের রিস্টকিং কেন্দ্র, ভুট্টাসহ উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যভিত্তিক শিল্প স্থাপন এবং স্থানীয় উদ্যোক্তা বিকাশের মাধ্যমে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মতো উদ্যোগকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে। টাঙ্গুয়ার হাওরের মানুষের জন্য বিকল্প আয়ের ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে না পারলে পরিবেশ সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগই দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
লক্ষণীয় যে, দীর্ঘদিন যাবৎ হাওরটির সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসককে প্রধান করে গঠিত ব্যবস্থাপনা কমিটি কার্যত ইতিবাচক ফলাফল অর্জনে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রণীত "টাঙ্গুয়ার হাওর ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫" এ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা আগের মতোই।
তাই হাওরের ব্যবস্থাপনায় প্রচলিত প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের মাধ্যমে শক্তিশালী করতে হবে। এ ক্ষেত্রে "টাঙ্গুয়ার হাওর কর্তৃপক্ষ " গঠন করা যেতে পারে। হাওরের সার্বিক নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ, নিরাপত্তা কাঠামোকে বিস্তৃত ও বহুমূখীকরণ, আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি, জিআইএস ও রিমোট মনিটরিং ব্যবস্থার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
টাঙ্গুয়ার হাওর দেশের সবচেয়ে বড় মিঠাপানির মাছের প্রজননকেন্দ্র ও অভয়ারণ্য। এই হাওরে ১৪১ প্রজাতির মাছ ছিল। গবেষণা বলছে বর্তমানে প্রায় ৮৩ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। এই মৎস্যপ্রজাতিসমূহ পুনরুদ্ধারে যাদুকাটা-পাটলাই-বৌলাই হয়ে সুরমা নদী পর্যন্ত ঐতিহাসিক মৎস্য অভিবাসন পথ (Fish Migratory Route) পুনঃসংযোগ ও নাব্যতা পুনরুদ্ধারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিলুপ্ত ও বিপন্ন মাছের প্রজাতি কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার, হারিয়ে যাওয়া উদ্ভিদ প্রজাতির বীজ ও চারা সংগ্রহ করে সংরক্ষিত বনাঞ্চল সৃষ্টি এবং পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল ও খাদ্যভিত্তি পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
পাশাপাশি হাওরের জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের চিকিৎসা, উদ্ধার ও পুনর্বাসনের জন্য বিশেষায়িত বন্যপ্রাণী ও জলজসম্পদ সহায়তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও বিবেচনায় আনা যেতে পারে।
হাওর সংলগ্ন কৃষিজমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমিয়ে জৈব কৃষির দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য কৃষকদের ভর্তুকি, কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
উজান থেকে প্রতিবছর নেমে আসা পলি, পাথর ও বালুর বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে জলধারণ ক্ষমতা ও জলজ আবাসস্থল সংরক্ষিত থাকে। একইসঙ্গে মেঘালয়ের খনিজ উত্তোলন এলাকা থেকে আসা দূষণের প্রভাব মোকাবিলায় বৈজ্ঞানিক গবেষণা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় পরিবেশ কূটনীতি এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ ও প্রতিবেশগত বিপন্নতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যক্রম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। সকল প্রকার ইঞ্জিনচালিত নৌযানের ব্যবহার পর্যায়ক্রমে সীমিত বা পরিবেশবান্ধব বিকল্পে রূপান্তর, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, প্লাস্টিকমুক্ত অঞ্চল ঘোষণা এবং পরিবেশগতভাবে ভয়াবহ ক্ষতিকর পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ করা প্রয়োজন।
একইসঙ্গে জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে হাওরের ন্যুনতম দুই-তৃতীয়াংশ এলাকাকে দীর্ঘমেয়াদি "সংরক্ষিত পুনরুদ্ধার অঞ্চল" (Ecological Restoration Zone) হিসেবে ঘোষণা করে মাছ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।
টাঙ্গুয়ার হাওর নিয়ে আরেকটি মৌলিক প্রশ্নও নতুন করে আলোচনায় আসা প্রয়োজন। একই জলাভূমি একদিকে রামসার সাইট, অন্যদিকে ইসিএ। বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই দুই কাঠামোর মধ্যে একটি নীতিগত টানাপোড়েন বিদ্যমান।
ইসিএ মূলত নিয়ন্ত্রণ, সীমাবদ্ধতা এবং নিষেধাজ্ঞাকেন্দ্রিক একটি কাঠামো। অন্যদিকে রামসার কনভেনশনের মূল দর্শন হলো “Wise Use” বা বিচক্ষণ ব্যবহার। রামসারের নয়টি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের মধ্যে একাধিক মানদণ্ড টাঙ্গুয়ার হাওরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এটি বিরল ও অনন্য জলাভূমির উদাহরণ; বিপন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল; জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র; মাছের প্রজনন ক্ষেত্র; এবং হাজারো পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আশ্রয়।
কিন্তু রামসার কনভেনশনের প্রকৃত শক্তি শুধু এই স্বীকৃতিতে নয়, বরং এর "Wise Use" নীতিতে। এই নীতির তিনটি মৌলিক ভিত্তি রয়েছে।
১. জলাভূমির পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করতে হবে।
২. বাস্তুতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভূমি, পানি, জীবসম্পদ ও মানুষের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
অর্থাৎ রামসার দর্শন উন্নয়নকে পরিবেশের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে না; বরং পরিবেশ সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে একই মুদ্রার দুই পিঠ হিসেবে বিবেচনা করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে টাঙ্গুয়ার হাওরে বহু ক্ষেত্রে এই "Wise Use"-এর পরিবর্তে "No Use"-ধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে অংশীদার নয়, বরং অনেক সময় সমস্যার উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে নতুন কোনো প্রকল্পও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
আইইউসিএন-এর জরিপে দেখা গেছে, টাঙ্গুয়ার হাওরের তীরবর্তী ৩৭টি গ্রামের ৫ হাজার ২০৭টি পরিবার হাওরের সম্পদ নির্ভরশীল। এর শতকরা ২০ শতাংশ পেশাদার মৎসজীবি- যারা সারাবছর হাওরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। বাকীরা মৌসুমী বা খন্ডকালীন মৎস আহরণ করে থাকেন।
প্রস্তাবিত কৃষি ও মৎসভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে এসব ক্ষেত্রে এবং হাওর রক্ষণাবেক্ষণ, পুনরোদ্ধার ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় জনবল হিসেবে এসব লোকের কর্মসংস্থান সম্ভব।
তবে বর্তমানে টাঙ্গুয়ার হাওরের সবচেয়ে ভয়ংকর সংকট কোনো প্রকল্পের দুর্বলতা নয়; বরং নিয়ন্ত্রণহীন নীতিনৈতিকতাবিবর্জিত পর্যটন কার্যক্রম। পরিবেশগতভাবে স্পর্শকাতর একটি রামসার সাইটে যে ধরনের পর্যটন চলছে, তা কার্যত বাস্তুতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ আগ্রাসন।
প্রতিদিন শত শত ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও হাউসবোট হাওরে প্রবেশ করছে। উচ্চ শব্দে নাচ-গান, ডিজেল দূষণ, পর্যটকদের যত্রতত্র ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য,দেশী-বিদেশী মদের কাঁচের বোতল এবং খাদ্যবর্জ্যে বিপন্ন হয়ে পড়ছে পরিবেশ। বহু স্থানে পর্যটকদের অসচেতন আচরণে বৃক্ষ ও উদ্ভিদরাজি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষকের জমিতে ওইসব কাঁচের বোতল নিক্ষেপের কারণে আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ, যা শুধু স্থানীয়দের অভিযোগ নয়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরেও উঠে এসেছে। অতিথি পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থলও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
আরও উদ্বেগজনক হলো, পর্যটনের আড়ালে অপরাধ ও অনিয়মের বিস্তার। স্থানীয়দের অভিযোগ ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, হাওর এলাকায় মাদক বাণিজ্য, অবাধ মদ্যপান, অসামাজিক কর্মকাণ্ড এবং হাউসবোটভিত্তিক গোপন ক্যামেরায় পর্নোগ্রাফি ধারণ, অপরাধী চক্রের নিরাপদ বিচরণ, নানান প্রতারণার ঘটনা বেড়েছে। খোলা মেলা ও বেপরোয়া পর্যটন আচরণ স্থানীয় সমাজ ও সংস্কৃতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একটি সংবেদনশীল গ্রামীণ সমাজের সাংস্কৃতিক কাঠামোর ওপর এই অভিঘাত দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।
প্রশ্ন হলো, হাওরপাড়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এই পর্যটন শিল্পের দৃশ্যমান অবদান কোথায়?
বাস্তবতা হলো, পরিবেশ ধ্বংসের যে মূল্য টাঙ্গুয়ার হাওর ও স্থানীয় জনগণ দিচ্ছে, তার তুলনায় এই পর্যটনের অর্থনৈতিক সুবিধা অত্যন্ত সীমিত। অধিকাংশ মুনাফা চলে যায় একটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে, আর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যগত হাজার কোটি টাকা ক্ষতির বোঝা বহন করে পুরো অঞ্চল।
পর্যটন হয়তো অর্থনীতির অংশ হতে পারে। কিন্তু কোনো পর্যটন যদি পরিবেশ ধ্বংস করে, সামাজিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা করে, তাহলে সেটি উন্নয়ন নয়; বরং শোষণের আরেক রূপ।
তাই টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো পরিবেশগতভাবে চরম বিপন্ন জলাভূমিতে বাণিজ্যিক পর্যটন কার্যক্রম পুনর্বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি। অন্তত টাঙ্গুয়ার হাওরের বিলুপ্ত মাছ ও উদ্ভিদের জাতসমূহ এবং হারনো জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পর্যটন বন্ধ করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি রামসার সাইটের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত পরিবেশ সংরক্ষণ; বিনোদন ব্যবসা নয়।
একই সঙ্গে উপেক্ষা করা যাবে না আরেকটি বড় বাস্তবতা- ভারতের মেঘালয় অঞ্চলের অপরিকল্পিত খনন কার্যক্রম থেকে আসা রাসায়নিক বর্জ্য ও দূষণ। টাঙ্গুয়ার হাওরের পানি দূষণের পেছনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত কারণ। অথচ এ বিষয়ে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। শুধুমাত্র স্থানীয় জনগণের ওপর দায় চাপিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
টাঙ্গুয়ার হাওরের অনন্য ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য একে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির স্বীকৃতি দিয়েছে। কোটি কোটি মাছের ডিম এখান থেকে দেশের বিভিন্ন জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে। লাখ লাখ পরিযায়ী পাখির সমাবেশ এখন দেখা না গেলেও হাজারো অতিথি পাখি প্রতিবছর এখানে আশ্রয় নেয়।
এ কারণেই এবারের বাজেটকে অতীতের প্রকল্পের পুনরাবৃত্তি হওয়া চলবে না। নতুন সমিতি, নতুন কর্মশালা কিংবা নতুন ব্যানার-ফেস্টুনের চেয়ে বেশি প্রয়োজন জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং বাস্তবভিত্তিক কর্মসংস্থান কর্মসূচি। প্রতিটি টাকার ব্যবহার জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। প্রকল্পের সাফল্য কাগুজে প্রতিবেদনে নয়, হাওরের পানি, মাছ, পাখি, বন এবং মানুষের জীবনে দৃশ্যমান হতে হবে।
টাঙ্গুয়ার হাওরকে বাঁচাতে হলে বাজেটের অঙ্ক নয়, পরিবর্তন করতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি। প্রকল্পনির্ভরতা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। বিগত দিনের মতো হাওরের পরিবেশ সংরক্ষণের নামে তীরবর্তী নিরিহ জনসাধারণের উপর প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বিস্তার, হাওরের সম্পদ লুণ্ঠনে দুর্বৃত্তায়ন সৃষ্টির অপপ্রবণতা বন্ধ করতে হবে। হাওরের পরিবেশগত সংকটকে উপেক্ষা করে বাণিজ্যিক পর্যটনের বিস্তারকে উন্নয়নের চিত্র হিসেবে প্রচার থামাতে হবে।
টাঙ্গুয়ার হাওরের তীরবর্তী একটি গ্রামের বাসিন্দা হিসেবে বিগত চার দশকে এই হাওরে ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনার একজন স্বাক্ষীও বটে।
আমি প্রতিনিয়ত দেখি, ২০/৩০ টাকার বিনিময়ে আমাদের শিশুরা বৈঠা হাতে ছোট নৌকায় পর্যটক নিয়ে হাওরের জলারবনে সারাদিন ভাসে। কখনো পর্যটকদের চাওয়া পূরণ করতে সুরে বেসুরে খালি গলা ছেড়ে গান গায়, আর পর্যটকেরা তাতে বিনোদিত হয়।
সোশ্যাল মিডিয়া, কখনো বা দেশের নামীদামী টিভি চ্যানেলেও এ দৃশ্যকে হাওর পর্যটনের সৌন্দর্য হিসেবে দেখানো হয়! আমার ব্যাথিত হৃদয়ে প্রশ্নজাগে- কেউ কি একবার ভেবে দেখেছেন- এই শিশুটি নিষিদ্ধ শিশুশ্রমের শিকলে কেন আবদ্ধ? শিশুটি শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত কেন? শিশুটি কি মনের সুখেই গান গেয়ে পর্যটকদের মনের খোরাক জোগান দিচ্ছে, না কি তাকে গিনিপিগ রূপে ব্যবহার করা হচ্ছে?
শেষ কথা হচ্ছে , পরিবেশ সংরক্ষণকে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তাহলেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বরাদ্দ টাঙ্গুয়ার হাওরের জন্য আরেকটি ব্যর্থ প্রকল্পের ইতিহাস না হয়ে, টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের একটি কার্যকর মডেলে পরিণত হতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ।





