রাজনীতি ছাড়া অর্থনীতি: উন্নয়নের অসম্পূর্ণ সমীকরণ
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা সাধারণত রপ্তানি বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আমলাতান্ত্রিক সংস্কারের কথা বলি। এসবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সমস্যাটি কেবল অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক নয়; এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে দেশের রাজনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন।
সুতরাং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কেবল আমলাতন্ত্রের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে এগিয়ে নেওয়ার চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়। কোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তর শুধু প্রশাসনের মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক অভিভাবকত্ব ,তবে সেটি কোনো একক রাজনৈতিক দলের অভিভাবকত্ব নয়। প্রয়োজন দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দল, মত, শ্রেণি ও পেশাজীবী সমাজের সম্মিলিত প্রজ্ঞা ও জাতীয় স্বার্থের অভিভাবকত্ব।
আরও পড়ুন: বেসরকারিকরণ হোক, বেসরকারি আধিপত্য নয়
কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ। রাজনৈতিক দল জনগণের সেই অংশ, যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য জনগণের সামনে নিজেদের উপস্থাপন করে। তাই রাজনৈতিক দলের মূল দায়িত্ব শুধু ক্ষমতায় যাওয়া নয়; জনগণের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থ রক্ষা করা। একটি দেশের অর্থনৈতিক নীতি যদি প্রতিবার সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায়, তাহলে কোনো দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা সফল হতে পারে না।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে -কিছু মৌলিক অর্থনৈতিক বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা। সরকার পরিবর্তন হবে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তিত হবে, কিন্তু জাতীয় অর্থনৈতিক লক্ষ্য ও কৌশলের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: আপসহীন সংগ্রামের জীবন ও রাজনীতি: বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি
দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র সেই কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালনে বহু ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে। একজন আমলার মূল পরিচয় হওয়ার কথা ছিল ‘জনকর্মচারী’। তাঁর দায়িত্ব ছিল জনগণের সেবা করা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের নীতিকে দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা। কিন্তু বাস্তবে প্রশাসনের একটি বড় অংশ দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে - এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের
এর ফলে একটি অদ্ভুত প্রশাসনিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এই শ্রেণির মানুষ প্রকৃত অর্থে পুরোপুরি আমলা নন, আবার রাজনৈতিক কর্মীও নন। তারা পরিস্থিতি বুঝে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে সক্ষম এক ধরনের সুবিধাবাদী প্রশাসনিক সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করেন। এমন একটি কাঠামো দিয়ে দক্ষ, নিরপেক্ষ ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
কিন্তু সমস্যাটি শুধু আমলাতন্ত্রের নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেও একটি বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক দলের নেতারা যখন সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসীন হন, তখন অনেক সময় তারাও আমলাতান্ত্রিক মানসিকতায় রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করেন। জনগণের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক যোগাযোগ, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণের পরিবর্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কেন্দ্রীভূত হয় প্রশাসনিক কাঠামো, ফাইল এবং ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঘিরে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের সংকট হলো - রাজনীতি আমলাতন্ত্রকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ ও সংস্কার করতে পারেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতিও আমলাতান্ত্রিক হয়ে পড়েছে। এই দ্বৈত সংকটের সমাধান ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়নের কোনো রূপরেখাই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অসম্পূর্ণতা হলো বৈদেশিক বাণিজ্য। আমরা রপ্তানি বহুমুখীকরণের কথা অত্যন্ত জোর দিয়ে বলি, যা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু রপ্তানি বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি মাত্র দিক। অপর দিক হলো আমদানি। একটি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যকে বুঝতে হলে এই দুই দিককে একই সঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হবে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বাণিজ্য ঘাটতির দেশ। অর্থাৎ পণ্য আমদানিতে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়, পণ্য রপ্তানি থেকে তার তুলনায় কম আয় আসে। এই ঘাটতি পূরণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রশ্ন হলো প্রবাসীদের রেমিট্যান্স যদি না থাকত, তাহলে আমাদের বৈদেশিক লেনদেনের অবস্থান কোথায় গিয়ে দাঁড়াত?
এই বাস্তবতা আমাদের অর্থনীতির একটি মৌলিক দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসে। রপ্তানি বাড়াতে হবে, কিন্তু একই সঙ্গে আমদানির কাঠামোও পুনর্বিবেচনা করতে হবে। কোন আমদানি উৎপাদন বাড়ায়, কোন আমদানি প্রযুক্তি ও শিল্প সক্ষমতা তৈরি করে এবং কোন আমদানি শুধু ভোগ বাড়ায় কিন্তু এই পার্থক্যটি অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে থাকতে হবে।
অবশ্যই আমদানি বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়। একটি আধুনিক অর্থনীতি কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানি করবে। কিন্তু সেই আমদানি যেন ভবিষ্যতে আরও বেশি উৎপাদন, রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সক্ষমতা তৈরি করে এবং সেটিই হওয়া উচিত নীতির লক্ষ্য।
অন্যথায় আমরা এমন একটি অর্থনৈতিক চক্রে আটকে যাব, যেখানে রপ্তানি কিছুটা বাড়বে, কিন্তু তার সঙ্গে আমদানিও বাড়বে; ফলে বাণিজ্য ঘাটতি অব্যাহত থাকবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমবে না।
এই প্রশ্নটি সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিভিন্ন বন্ধু দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের শুধু বাজার সম্প্রসারণ বা শুল্কসুবিধার সম্ভাবনা দেখলে চলবে না। দেখতে হবে, চুক্তির ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি কতটা বাড়বে এবং বিপরীতে আ সকল থেকে বাংলাদেশের আমদানি কতটা বাড়তে পারে। সামগ্রিকভাবে এর প্রভাব আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, স্থানীয় শিল্প এবং কর্মসংস্থানের ওপর কী হবে -সেটিও বিবেচনা করা জরুরি।
কোনো বাণিজ্য চুক্তিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালো বা খারাপ নয়। প্রশ্ন হলো যে, চুক্তির শর্তগুলো বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা রক্ষা করছে। একটি দেশের দর-কষাকষির শক্তি শুধু তার অর্থনৈতিক আকারের ওপর নির্ভর করে না; রাজনৈতিক ঐকমত্য, জাতীয় অবস্থানের দৃঢ়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এখানেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়। যদি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থে ন্যূনতম ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তির সময় সরকারের ওপর কার্যকর রাজনৈতিক ও জনমতভিত্তিক চাপ সৃষ্টি হয় না। ফলে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নটি অনেক সময় দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে বৃহত্তর জাতীয় আলোচনায় পরিণত হতে পারে না।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি সরকার রাষ্ট্রের মালিক নয়; সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক দলও রাষ্ট্রের মালিক নয়। জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। তাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জাতীয় অর্থনীতি, শিল্পনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা কিংবা বৈদেশিক বিনিয়োগের মতো মৌলিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে তাই প্রয়োজন একটি জাতীয় অর্থনৈতিক ঐকমত্য। রাজনৈতিক দলগুলোকে একমত হতে হবে যে,রপ্তানি কীভাবে বহুমুখীকরণ করা হবে, কীভাবে উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরি হবে, কীভাবে আমদানিকে উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা হবে, কীভাবে অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিরুৎসাহিত করা হবে, কীভাবে রেমিট্যান্সকে বিনিয়োগে পরিণত করা হবে এবং কীভাবে বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য উন্নত করা হবে।
এর পাশাপাশি প্রয়োজন আমলাতন্ত্রের মৌলিক সংস্কার। আমলারা রাজনৈতিক দলের কর্মী হবেন না; তারা হবেন জনগণের পেশাদার কর্মচারী। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নীতি নির্ধারণ করবে, আর প্রশাসন সেই নীতি দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহির সঙ্গে বাস্তবায়ন করবে। এই সীমারেখা স্পষ্ট না হলে রাষ্ট্র কখনোই আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো অর্জন করতে পারবে না।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নটি তাই শুধু জিডিপি বৃদ্ধির প্রশ্ন নয়। এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্য এবং জনগণের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশ্ন।
আমরা যদি শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকি, কিন্তু বাণিজ্য ঘাটতি, আমদানি নির্ভরতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক সুবিধাবাদ এবং নীতির ধারাবাহিকতার অভাব দূর করতে না পারি, তাহলে সেই উন্নয়ন টেকসই হবে না।
বাংলাদেশকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আমরা কি শুধু একটি বড় অর্থনীতি হতে চাই, নাকি একটি শক্তিশালী, উৎপাদনশীল, ভারসাম্যপূর্ণ ও আত্মমর্যাদাশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাই?
সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমলাতন্ত্রকে তার যথাযথ জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে, রাজনীতিকে তার প্রকৃত দায়িত্বে ফিরতে হবে এবং জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একটি সম্মিলিত অভিভাবকত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
কারণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ কোনো একক দল, কোনো একক সরকার কিংবা কোনো একক আমলাতন্ত্রের হাতে নয়। এই ভবিষ্যতের মালিক জনগণ এবং আর সেই জনগণের সম্মিলিত রাজনৈতিক প্রজ্ঞাই হতে পারে বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।





