"এলজিইডি বাঁচলে বাঁচবে গ্রাম-বাংলা"

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী ভিশন ও নেতৃত্বের সামনে বড় সংস্কারের পরীক্ষা

Sanchoy Biswas
শেখ এমদাদুল হক মিলন
প্রকাশিত: ৯:৩৬ অপরাহ্ন, ২৩ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১১:৪৫ অপরাহ্ন, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশের রূপান্তর, সার্বিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার আসল হৃৎস্পন্দন নিহিত রয়েছে গ্রাম-বাংলায়। দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের কাছে বড় বড় তাত্ত্বিক অর্থনৈতিক সূচক, জিডিপির প্রবৃদ্ধি কিংবা বৈশ্বিক রিজার্ভের জটিল হিসাব কোনো প্রধান বিষয় নয়। সাধারণ মানুষ অত্যন্ত সহজ ভাষায় দেখতে চান—তাঁদের বাড়ির সামনের মাটির রাস্তাটি পাকা হয়েছে কিনা, মাঠের ফসল দ্রুত বাজারে নেওয়ার জন্য খালের ওপর শক্ত সেতু বা কালভার্টটি নির্মিত হয়েছে কিনা এবং কষ্টার্জিত কৃষি পণ্য সহজে শহরে নিয়ে উপযুক্ত মূল্যে বিক্রি করে লাভের টাকা পকেটে ঢোকানো যাচ্ছে কিনা।

গ্রামীণ অর্থনৈতিক চাকা কতটা গতিশীল, তা নির্ধারণ করে এই মৌলিক পরিকাঠামো। আর দেশের তৃণমূলের এই রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতি যখন শুধু পদ নয়, রাষ্ট্রের আস্থার প্রতীক

এলজিইডির বর্তমান অবকাঠামো ও পরিসংখ্যান

এলজিইডির প্রাতিষ্ঠানিক ডেটাবেজ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের গ্রামীণ ও নগর সংযোগের এক সুবিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে সংস্থাটির হাতে। অবকাঠামোগত মূল পরিসংখ্যানগুলো নিম্নরূপ:

আরও পড়ুন: দোতলা বিআরটিসি বাসে নারী-পুরুষের পৃথক সেকশন: নিরাপদ ও প্রযুক্তিনির্ভর গণপরিবহনের একটি সম্ভাব্য মডেল

 * সড়ক নেটওয়ার্ক: দেশে মোট ৪,১১,০৪৩ কিলোমিটারের সড়ক নেটওয়ার্ক রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে পাকা (পিচঢালা ও সিসি/আরসিসি) রাস্তার পরিমাণ প্রায় ১,৬৭,২০৮ কিলোমিটার। অন্যদিকে, এখনো প্রায় ২,৪৩,৮৩৪ কিলোমিটার কাঁচা বা মাটির রাস্তা রয়ে গেছে, যা বর্ষাকালে গ্রামীণ জীবনযাত্রাকে স্থবির করে দেয়।

 * সেতু ও কালভার্ট: সংযোগ অক্ষুণ্ণ রাখতে এলজিইডি এ পর্যন্ত প্রায় ১৬,৮৫,৬৬৭ মিটার (১৬৮৫ কিলোমিটারের বেশি) ছোট-বড় সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করেছে। তবে বিশাল নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী ও খাল পারাপারে এখনো প্রায় ৫,৪০,৭৫৯ মিটার নতুন সেতু বা কালভার্টের তীব্র ঘাটতি (Gap) রয়ে গেছে।

 * বহুমাত্রিক স্থাপনা ও ভবন: এলজিইডি শুধু রাস্তাঘাটেই সীমাবদ্ধ নয়। সংস্থাটি সারাদেশে শত শত উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, সর্বাধুনিক গ্রোথ সেন্টার (হাট-বাজার), উপকূলীয় অঞ্চলের সাইক্লোন শেল্টার, নগর এলাকার নাগরিক অবকাঠামো এবং হাজার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন ও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কাজ সফলভাবে পরিচালনা করে থাকে।

ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও অর্থায়নের সমীকরণ:

জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দল ও দলীয় প্রার্থীরা জনগণের সামনে ভোট টানতে প্রধান প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন—কাঁচা রাস্তা পাকা করা, ভাঙা পোল সংস্কার ও নতুন কালভার্ট-সেতু নির্মাণ করা। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে অন্তত আরও ১ থেকে ১.৫ লাখ কিলোমিটার রাস্তা দ্রুত পাকা করতে হবে এবং সাড়ে ৫ লাখ মিটারের সেতু-কালভার্টের ঘাটতি দ্রুত পূরণ করতে হবে।

বর্তমানে আমাদের জাতীয় অর্থনীতির স্বাস্থ্য কতটা চ্যালেঞ্জিং, তা দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব খুব ভালো করেই জানেন। নিজস্ব অর্থায়নে (জিওবি) এই বিশালাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ফলে এই অবকাঠামোগত গ্যাপ পূরণ করতে বিশ্ব ব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা)-এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ সহজ শর্তের বৈশ্বিক ঋণ ও অনুদান সংগ্রহ করতে হবে।

শীর্ষ নেতৃত্ব চয়ন ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা

এই বিশাল বৈদেশিক তহবিল আকর্ষণ, অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে সঠিক ও যোগ্য ব্যক্তিত্ব নিয়োগ দেওয়া অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়।

 অতীতে ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে কেবল রাজনৈতিক মতাদর্শ বিশেষ করে বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার অপরাধে মেধাবী ও সৎ প্রকৌশলীদের মিথ্যা মামলা, ওএসডি এবং পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্যারিয়ার হারিয়েছেন।

বর্তমানে যখন বিএনপির  চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী  তারেক রহমানের সুচিন্তিত ভিশন ও নেতৃত্বের আলোয় নতুন দেশ পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কার রূপ পাচ্ছে, তখন এলজিইডির শীর্ষ পদায়নে কয়েকটি বিষয় গভীরভাবে বিবেচনা করা জরুরি:

১. পরীক্ষিত ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি বা জাইকার সাথে প্রকল্প প্রণয়ন, দরকষাকষি ও বৈশ্বিক ফান্ড ডিল করার দীর্ঘদিন সরাসরি অভিজ্ঞতা রয়েছে—এমন অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

২. বঞ্চনার অবসান ও মর্যাদা পুনরুদ্ধার: বিগত দিনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার কিন্তু পেশাগতভাবে অত্যন্ত দক্ষ, ডায়নামিক ও দুর্নীতিমুক্ত কর্মকর্তাদের পুনর্বাসিত ও শীর্ষ নেতৃত্বের বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।

৩. আমলাতান্ত্রিক বেড়াজাল অতিক্রম: কেবল প্রথাগত বিভাগীয় জ্যৈষ্ঠতার তালিকা দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে, প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক গতিশীলতা নিশ্চিত করতে সৎ, মেধাবী ও কর্মঠ সাবেক বা বঞ্চিত অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বিশেষ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে এলজিইডিকে দুর্নীতির ঊর্ধ্বে শক্তিশালী সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ছড়ানো গুজবে কান না দিয়ে, দেশের ভাবমূর্তি ও গ্রামীণ অর্থনীতি রক্ষায় তারেক রহমানের উচিত চোখ-কান খোলা রেখে সঠিক সময়ে সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। এলজিইডির প্রধান পদের ব্যাটন যদি একজন আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ, সৎ ও পরীক্ষিত পেশাদার কর্মকর্তার হাতে তুলে দেওয়া যায়—তবেই কাঁচা রাস্তা পাকা হওয়ার প্রতিশ্রুতি সফল হবে, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হবে এবং গতিশীল হবে পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক