ফরিদপুরে একই পরিবারের ৪ জন এবং টাঙ্গাইলে তিন বন্ধু মিলে সড়কে ঝরল অন্তত ৮ প্রাণ
রোববার (২৪ মে ২০২৬) সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ফরিদপুরে রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স ও বিআরটিসি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের চার সদস্যসহ পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন। অন্যদিকে টাঙ্গাইলের বাসাইলে বেপরোয়া গতির সিএনজিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় নিহত হয়েছেন তিন কিশোর বন্ধু। দুটি ঘটনাই স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদকে সামনে রেখে মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়তে শুরু করেছে। এর মধ্যেই বেপরোয়া গতি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অনিয়ন্ত্রিত চালনা ও দুর্বল তদারকির কারণে ফের বাড়ছে প্রাণহানির ঘটনা।
আরও পড়ুন: গাজীপুরে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে যুবকের আত্মহত্যা
চিকিৎসার পথে ঝরে গেল একই পরিবারের চার প্রাণ
ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার শংকরপাশা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামের বাসিন্দা আলমগীর হোসেন সম্প্রতি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল। সঙ্গে ছিলেন তার বড় ভাই, বোন ও ভাবি।
আরও পড়ুন: এপ্রিল মাসে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৫১০ জন এবং আহত ১২৬৮ জন: যাত্রী কল্যাণ সমিতি
ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের শংকরপাশা এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা বরিশালগামী একটি বিআরটিসি বাসের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় অ্যাম্বুলেন্সটি দুমড়েমুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই পাঁচজন নিহত হন।
নিহতরা হলেন—আলমগীর হোসেন (৫৮), জাহাঙ্গীর হোসেন (৬২), খুশি বেগম (৪৫), মাজেদা বেগম (৫০) এবং অ্যাম্বুলেন্সচালক কাউছার হোসেন (২৫)।
স্থানীয়রা জানান, দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন মিলে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে মরদেহগুলো বের করেন। আহত কেউ না থাকলেও অ্যাম্বুলেন্সটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে।
নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মাদারীপুরের বালিয়া গ্রাম ভারী হয়ে ওঠে। পরিবারের সদস্যরা বলেন, “চিকিৎসা করাতে নিয়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু একসঙ্গে চারজনের লাশ বাড়ি ফিরবে—এটা কখনো কল্পনাও করিনি।”
নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানী আজাদ জানান, মরদেহগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। দুর্ঘটনাকবলিত বাস ও অ্যাম্বুলেন্স জব্দ করা হয়েছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
টাঙ্গাইলে নিভে গেল তিন কিশোর বন্ধুর জীবন
একই দিনে দুপুরে টাঙ্গাইলের বাসাইল-ভাতকুড়া আঞ্চলিক সড়কের বাংড়া কালীবাড়ি এলাকায় আরেকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় তিন বন্ধু। তারা সবাই করটিয়া এইচ এম ইনস্টিটিউশন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী এবং স্থানীয়ভাবে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত ছিল।
নিহতরা হলেন— তাকবির মিয়া (১৬), মো. লিমন (১৪) এবং সাইমন (১৪)।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, টাঙ্গাইলগামী একটি রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজিচালিত অটোরিকশা বেপরোয়া গতিতে চলছিল। বাংড়া কালীবাড়ি এলাকায় পৌঁছালে সেটি বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
ঘটনাস্থলেই তাকবির নিহত হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় লিমন ও সাইমনকে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক লিমনকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে মারা যায় সাইমন।
দুর্ঘটনার খবরে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। সহপাঠী ও স্থানীয়রা জানান, তিন বন্ধু প্রায়ই একসঙ্গে চলাফেরা করত। তাদের একসঙ্গে মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে অসহনীয় শোক।
বাসাইল থানার ওসি আলমগীর কবির জানান, মরদেহগুলোর সুরতহাল সম্পন্ন হয়েছে। অভিযোগ পেলে মামলা দায়ের করা হবে এবং দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত করা হবে।
বাড়ছে উদ্বেগ, প্রশ্নের মুখে সড়ক নিরাপত্তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সড়কব্যবস্থায় এখনো কার্যকর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। বিশেষ করে আঞ্চলিক সড়ক ও মহাসড়কে বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসে দেশে ৪৬৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০৪ জন নিহত এবং ৭০৯ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল, সিএনজি ও যাত্রীবাহী বাস জড়িত ছিল।
সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন, মামলা বা ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন খুব কমই দেখা যায়। ফলে প্রতিদিনই নতুন নতুন পরিবার হারাচ্ছে তাদের স্বজনদের।
রোববারের ফরিদপুর ও টাঙ্গাইলের ঘটনাও সেই নির্মম বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনে দিয়েছে—দেশের সড়ক কি এখনও নিরাপদ হওয়ার অপেক্ষাতেই রয়ে গেছে?





