ধানের বাম্পার ফলন, তবু কৃষকের ঘরে কান্না
লক্ষ্মীপুরে চলতি বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। মাঠ ভরা সোনালি ফসলের হাসি দেখার কথা থাকলেও এখন কৃষকের চোখে জল। হাটে বেপারী না থাকা আর ধানের দাম নিয়ে চরম হতাশায় দিন কাটছে তাদের। ঘরে হাজার হাজার টন ধানের স্তূপ পড়ে থাকলেও বিক্রি করতে না পারায় আর্থিক সংকটে দিশেহারা কৃষক। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অর্থের অভাবে আসন্ন আমন মৌসুমের চাষাবাদ নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় এবার ৩৮ হাজার ৭৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এতে মোট উৎপাদনের পরিমাণ ২ লাখ ৪২ হাজার ১৫৮ টন। অথচ সরকারিভাবে খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৯৫৯ টন, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ৬১ ভাগের এক ভাগ।
আরও পড়ুন: সাজেকে সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা, ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা
লোকসানে কৃষকের ঘরে পচন সদর উপজেলার দক্ষিণ টুমচর গ্রামের কৃষক আব্দুল হাশেম, মো. নিজাম, মো. নুরনবী, ফয়েজ আহমেদ ও দেলোয়ার হোসেন জানান, এক মণ ধান উৎপাদনে তাদের খরচ হয়েছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। অথচ বাজারে সেই ধানের দাম বলা হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। ফলে ধান বিক্রি করলেই লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ না থাকায় এবং খোলা বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় ধানের স্তূপে পচন ধরছে। বৃষ্টির পানিতে ভিজে ও রোদে শুকিয়ে ধান নষ্ট হচ্ছে, ইঁদুরে কাটছে বস্তা। ঋণ পরিশোধ ও ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতে ব্যর্থ হয়ে অনেকের পক্ষেই আমন চাষ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন: বিজিবি’র অভিযানে জুন মাসে ৩০৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকার চোরাচালান পণ্যসামগ্রী জব্দ
লক্ষ্যমাত্রার সীমাবদ্ধতা ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাসান ইমাম জানান, উপজেলায় প্রায় ১ লাখ কৃষক পরিবার থাকলেও খাদ্যগুদামে ধান দেওয়ার জন্য মাত্র ১ হাজার ৮০০ জনের তালিকা দেওয়া হয়েছে। যার বিপরীতে ধান সংগ্রহের বরাদ্দ মাত্র ১ হাজার ৫৩০ টন। অর্থাৎ মাত্র ৫১০ জন কৃষক ধান দিলেই এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়ে যাবে। ফলে বাকি হাজার হাজার কৃষক সরকারি সুবিধার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
ধান সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও কৃষি কার্ড না থাকার বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কৃষকেরা।
যদিও সদর উপজেলা খাদ্য গুদাম পরিদর্শক শাহীন মিয়া বলেন, “কোনো সিন্ডিকেট নয়, কৃষি বিভাগের দেওয়া তালিকা অনুযায়ীই ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী একজন কৃষক সর্বোচ্চ ৩ টন ধান বিক্রি করতে পারেন।”
সদর উপজেলা ধান ক্রয় কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ক্যাথোয়াইপ্রু মারমা জানান, সদরে ১ হাজার ৫৩০ টনের মধ্যে ইতিমধ্যে ১ হাজার ২৩১ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান সংগ্রহের সময় রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “কৃষকদের কষ্ট লাঘবে এবং ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধির জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করব।”
কৃষকদের দাবি, পরিস্থিতি উত্তরণে জরুরি ভিত্তিতে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি, প্রান্তিক কৃষকদের তালিকাভুক্ত করা এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান ক্রয় নিশ্চিত করা হোক।





