এক ব্যক্তিকে আটকে ঢাকা জেলা ডিবির ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি, পুলিশ বলছে ‘মাদক ব্যবসায়ী’
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী এলাকা থেকে এক ব্যক্তিকে অপহরণের কায়দায় তুলে নিয়ে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করার অভিযোগ উঠেছে ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দলের বিরুদ্ধে। রাতভর মুক্তিপণের টাকা নিয়ে দর কষাকষির পর, ভুক্তভোগীর পরিবার তাকে অপহরণকারী চক্রের কবলে পড়েছেন ভেবে পল্লবী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে।
একই সাথে নিখোঁজ ব্যক্তিকে দ্রুত উদ্ধারের আশায় পরিবারের পক্ষ থেকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করা হয়। সেখান থেকে পরিবারটিকে সাভার থানা পুলিশের সাথে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়। অভিযোগ পাওয়ার পর সাভার থানা পুলিশ তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগীর অবস্থান শনাক্ত করে সাভারের তেঁতুলঝোড়া পুলিশ ফাঁড়ি এলাকায়। সাভার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাহীন এই উদ্ধার অভিযানে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে ভুক্তভোগীর অবস্থান নিশ্চিত করেন। এরপরই পরিবার নিশ্চিত হয় যে, নিখোঁজ সিরাজুল ইসলাম ঢাকা জেলা ডিবি পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।
আরও পড়ুন: ৯৯৯-এ ফোনের দুই ঘণ্টায় ডাকাতি হওয়া ৩১টি গরুসহ ট্রাক উদ্ধার, মিনিট্রাক জব্দ
তবে ঢাকা জেলা সাভারের ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইদুল ইসলাম বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, সকালে তার অধীনস্থ ডিবি টিম মিরপুরের সিরাজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে আটকের রিপোর্ট করেছে। ডিবির হেফাজতে থাকা অবস্থায় এ ধরনের কথা বলার বা টাকা দাবি করার কোনো সুযোগ নেই। ভুক্তভোগীর পরিবারের মোবাইল ফোনে যারা কথা বলেছে, তারা ডিবির কেউ নয়। আটক সিরাজুল ইসলাম একজন ইয়াবা ব্যবসায়ী এবং এই অভিযোগেই তাকে আটক করা হয়েছে। তাকে নিয়ে পুলিশ এখনো অভিযান পরিচালনা করছে। তবে এখনো কোনো মাদক সামগ্রী উদ্ধারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভুক্তভোগী যুবক সিরাজুল ইসলাম গত সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেলে মিরপুরের বাসা থেকে বের হওয়ার পর তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওই দলটি তাকে আটক করে সাভারের তেঁতুলঝোড়া এলাকার একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। পরে আটক যুবকের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন থেকে ডিবি সদস্যরা সিরাজুলের স্ত্রীর কাছে ফোন করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ বা ঘুষ দাবি করে এবং রাতভর টাকা নিয়ে দর কষাকষি চলতে থাকে।
আরও পড়ুন: বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কের খায়রুল বাশার বাহারের ৩৩ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক
পল্লবী থানায় দায়ের করা লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, নিখোঁজ সিরাজুল ইসলাম (৩৬) গত ১৩ জুলাই বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে মিরপুরের চান্দার টেক, উত্তর কালশী এলাকার বাসা থেকে ব্যক্তিগত কাজে বের হন। এরপর থেকেই পরিবারের সাথে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, নিখোঁজের পর একই দিন রাত আনুমানিক ১২টার দিকে সিরাজুল ইসলামের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর থেকে তার স্ত্রী শিমুলীর (২৭) কাছে একটি ফোন আসে। কলকারী নিজের পরিচয় গোপন রেখে সিরাজুলকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ২০ লাখ টাকা দাবি করেন।
পরদিন ১৪ জুলাই সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে আবারও একই নম্বর থেকে ফোন করে দাবিকৃত টাকার পরিমাণ কমিয়ে ১৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। একই সাথে পরিবারের সদস্যদের সাভারে গিয়ে তাদের নির্ধারিত লোকের হাতে টাকা তুলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। টাকা পেলেই কেবল সিরাজুল ইসলামকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করা হয়।
ভুক্তভোগীর বড় ভাই পেশায় গাড়িচালক মো. মিরাজ হোসেন অভিযোগে বলেন, ঘটনার পর থেকে তাদের পুরো পরিবার চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। তার আশঙ্কা ছিল, চক্রটি তার ভাইয়ের বড় ধরনের কোনো ক্ষতি করতে পারে। এই ঘটনায় তিনি পল্লবী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন।
এদিকে, পল্লবী থানা পুলিশের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি সাইদুল ইসলাম দাবি করেন, তার টিম সিরাজুলকে মিরপুর থেকে নয়, বরং সাভারের বিরুলিয়া এলাকা থেকে আটক করেছে।
ভুক্তভোগী নারী ও ডিবি সদস্যদের ফোন আলাপ:
ডিবি সদস্য : হেলো, ওনারা ২০ চাইছে, পরে আমি ১৫ এর কথা বলছি হেগো হাতে পায়ে ধইরা। নইলে ওনারা ইজ্জত রাখবে না।
ভুক্তভোগী নারী : এখন শোনো, আমারে তো সময় দিতে হবে। এত টাকা আমার কি ঘরে আছে। আচ্ছা আমারে একটা দিন সময় দিতে কও। এত টাকা তো আমি কইলে ম্যানেজ করতে পারি না, আবার এখন রাত ১টা বাজে। আমারে কালকের দিনটা সময় দিতে বলো হেগো।
ডিবি সদস্য : পড়াশোনা করেছেন আপনি? শিক্ষিত মনে হয় কথা শুইনা আপনারে, সে?
ভুক্তভোগী নারী : কিছু করছি, বেশিদূর করি নাই ভাই।
ডিবি সদস্য : অসুবিধা নাই শুনেন, আপনার যত টাকাই কোর্টে লাগুক না কেন, আপনি কোর্ট থেকে ছাড়ায়েন আপা। এইডা সুবিধা হবে না আপনার জন্য।
ভুক্তভোগী নারী : না ভাই শুনেন, আমার কথাটা বুঝেন। আপনি আমারে একটু তো সময় দিতে হবে রে ভাই।
ডিবি সদস্য : হ্যাঁ, আমি আপনার কথা বুঝতে পেরেছি। আমার কথা একটু বুঝেন আপনি।
ভুক্তভোগী নারী : আপনার কথাও বুঝি, আমার কথাও বুঝি। আপনি কালকে আমারে দুপুর পর্যন্ত একটু সময় দেন ভাইরে আমার এটা ম্যানেজ করতে হইব। ঘরে যদি আমার একটা টাকা থাকতো তাহলে আমি এখনই যাইতাম।
ডিবি সদস্য : আমি বুঝতে পেরেছি। একটা জিনিস বুইঝেন, হ্যাঁ?
ভুক্তভোগী নারী : যে কেউ চায় না কারোর হাসবেন্ড বিপদে পড়ুক, বুঝছেন?
ডিবি সদস্য : ওনারে তো আসলে বেশিক্ষণ রাখার সুযোগ থাকে না, বুঝতে পারছেন?
ভুক্তভোগী নারী : রাখেন, তারপরও আমার কথাটা একটু রাখেন ভাই। আপনারা একটু রাখেন হেরে। আমারে একটু সময় দেন। আপনারা আমারে যদি সন্ধ্যাবেলাও বলতেন আমি একটা কিছু করতে পারতাম, কিন্তু এত রাইতে ভাইরে আমার...
ডিবি সদস্য : আপনে রিকভারি করতে থাকেন, যদি সংক্ষেপে যদি একটু সময় লাগে... হ্যাঁ? যদি একটু সময় লাগে, যদি কিছু শর্ট থাকে সেটা আমরা দেখবোনে। কিন্তু আপনি যদি সারারাত বইসা থাকেন তাহলে তো হবে না, হবে?
ভুক্তভোগী নারী : ভাইয়া আমার তো শুনেন, আমি বইসা থাকমু না ভাইরে। আমার তো একটু জোগাড় করতে হবে। আমার ঘরে যদি থাকতো আমি এখনই যাইতাম, বুঝছেন? আমার এই দুইটা বাচ্চা নিয়ে আমি কি করমু আমি নিজেও জানি না, বুঝছেন? কিন্তু আমার, আমার দুইটা বাচ্চার দিকে তাকায় অবশ্যই আমি যাইতাম ভাই। জানিনা আপনারা কি মনে করেন।
ডিবি সদস্য : দেখেন ভাই আপনার যেটা ভালো মনে হয়। ঠিক আছে।
ভুক্তভোগী নারী : না শুনেন, আমার একটু কালকে দুপুর পর্যন্ত সময় দেন ভাই।
ডিবি সদস্য : না, ওই সময়টা আমরা দিতে পারব না। যেটা পারব না সেটা বইলা লাভ নাই। টাকা দিয়ে কোনো কিছু হয় না।
ভুক্তভোগী নারী : তাহলে সকাল পর্যন্ত দেন একটু, দুপুর পর্যন্ত না গেল।
ডিবি সদস্য : না, যদি নাই থাকে টাকা... এই টাকা নিয়ে কি করবেন বলেন?
ভুক্তভোগী নারী : ভাই শুনেন আমার...
ডিবি সদস্য : আচ্ছা কোনো সুযোগ আছে?
ভুক্তভোগী নারী : না শুনেন, তাহলে একটু সকাল হইতে দেন রে ভাই।
ডিবি সদস্য : হ্যাঁ? হ্যাঁ?
ভুক্তভোগী নারী : একটু সকাল হইতে দেন ভাই। আপনে দুপুর পর্যন্ত না যান, সকাল ৮টা, ৯টা কি ১০টা পর্যন্ত সময় দেন ভাই।
ভুক্তভোগী নারী : আচ্ছা ঠিক আছে, আমি একটু দেখি আমি হ্যাঁ? আমি দেখি যদি পারি আমি জানাবো। না পারলেও আমি আপনাকে জানাচ্ছি। ১০ মিনিটের ভিতর জানাচ্ছি। পারলেও জানাবো, না পারলেও জানাবো। কেমন?
ভুক্তভোগী নারী : আচ্ছা ভাই একটু জানান। ভাই একটু তাকায়েন একটু, বোন মনে কইরা একটু কিছু কইরেন।





