কাঁচা টাকা উপার্জনে ডিএনসিসির তুঘলকি কাণ্ড

গুলশান চত্বরে গাছ কেটে রাস্তার উপর এলইডি সাইন স্থাপনে দুর্ঘটনার আশঙ্কা

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৭:৫৯ অপরাহ্ন, ১৯ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৮:২৮ অপরাহ্ন, ১৯ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে রাজধানীর অভিজাত গুলশান বনানীসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিজ্ঞাপনি এলইডি সাইন স্থাপনে নগরীর সৌন্দর্য বিনষ্টসহ দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। গুলশান-২ গোল চত্বরে ক্রাউন প্লাজা ও ল্যান্ডমার্ক ভবনের সামনে কয়েকটি গাছ কেটে রাস্তার উপরে বিরাট এলইডি স্থাপন করা হয়েছে। রাস্তার উপরে এলইডি সাইন স্থাপন করতে গিয়ে গাছ কাটায় গাছের উপর পাখির বাসা গুলো করে ফেলেছে। গুলশান-২ ক্রস রোডের বদ্বীপগুলোতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় ও পরিবেশ রক্ষায় অনেকগুলো গাছ লাগানো ছিল। গাছের মধ্যে সারাক্ষণ পাখিদের কল কাকলি ও পাখিদের আবাসস্থল ছিল। সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা গাছের ডালসহ কেটে ফেলায় পাখিগুলো বাসস্থান হারালো। কামাল আতাতুক রোডের গুলশান  সিগন্যালের উপরে মূল রাস্তায় এলইডি স্থাপন করে দেয়ায় বড় যানবাহনের চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যে কোন সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষের  সাথে একটি প্রভাবশালী মহলের যোগসাজসে বিজ্ঞাপন প্রচার কাঁচাটাকা উপার্জনে নেমেছে।  মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে নিরাপদ সড়ক যোগাযোগ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা। হঠাৎ করে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের এলইডি স্থাপন করতে গিয়ে রীতিমত তুঘলকি কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন মহল প্রতিবাদ জানিয়ে আইনি ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। 

তবে এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেন, রাজস্ব বাড়ানোর  স্বার্থে অনেক আগে থেকেই বেসরকারি কোম্পানির সাথে এলইডি প্রদর্শনের বিজ্ঞাপনের চুক্তি  আছে। সিটি কর্পোরেশনের সাথে চুক্তি অনুযায়ী সকল শর্ত মেনে বিজ্ঞাপনের সংস্থাকে কাজ করতে বলা হয়েছে। রাস্তার মোড়ের বদ্বীপের গাছ কাটা বা রাস্তার উপরে এলইডি স্থাপনে চলাচলে ক্ষতি হলে, শর্ত ভঙ্গ হলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে একশন নেয়া হবে। বিষয়টা আমাদের প্রকৌশল বিভাগ দেখার জন্য নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। এদিকে গুলশান এলাকার দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক কর্মকর্তারা বলছেন, এভাবে রাস্তার উপর এলইডি সাইন স্থাপনের বিষয়ে তারা কিছু জানেন না। যান চলাচলের কোন সমস্যা হলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। গুলশান ট্রাফিক বিভাগের  উপ পুলিশ কমিশনার আনোয়ার সাঈদ জানান, আমি নতুন যোগদান করেছি এই বিভাগে। আমি পরিদর্শন করে খোঁজ নিচ্ছি।

আরও পড়ুন: পল্লবী থানা থেকে সাজাপ্রাপ্ত আসামির পলায়ন

একাধিক আবেদন করেছে কর্পোরেশন বরাবরে।  সম্প্রতি বেঙ্গল ট্রেড ওয়েজ লিমিটেড এর পরিচালক আসিফ রহমানের আবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছ। ডিএনসিসি’র আদেশ নং-৪৬.১০.০০০০.০২৩.৯৭.২০.২৪-৭৫৭, তারিখ: ২১/১০/২০২৪-এর পত্র এবং মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা আলোকে ঢাকা মহানগরীর সকল সড়ক ব-দ্বীপ (ঞৎধভভরপ ওংষধহফ), ইন্টারসেকশন, ফুটপাত, ফুটওভার ব্রিজ, যাত্রী ছাউনি-তে স্থাপিত এলইডি সাইনবোর্ড, লাইট বক্স ও মেগা সাইনের অনুমতি অনুমোদনের শর্তাবলির পরিপন্থী হওয়ায় অনুমতি বাতিলের জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। জানা যায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের অফিস আদেশ নং-৪৬.১০.০০০০.০২৩.৯৭.২০.২৪-৭৫৭, তারিখ: ২১/১০/২০২৪।২। ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের অফিস আদেশ নং-৪৬.১০.০০০০.০২১.৯৭.২০.২৪-৩৭৮, তারিখ: ১৪/০৫/২০২৬।৩। সংশ্লিষ্ট অনুমতিপত্র সিটি কর্পোরেশন আদর্শ কর তফশীল - ২০১৬।৫। বাংলাদেশ পরিবেশ আইন ১৯৯৫ ও বিধিমালা- ২০২৩।৷৷ , ঢাকা মহানগরীর গুলশান-১, গুলশান-২, বারিধারা, বনানী, কাকলী মোড়সহ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সড়ক ব-দ্বীপ (ঞৎধভভরপ ওংষধহফ), গোলচত্বর, ইন্টারসেকশন, ফুটপাত, ফুটওভার ব্রিজ, যাত্রী ছাউনি-তে বিপুল সংখ্যক এলইডি সাইনবোর্ড, ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড, লাইট বক্স ও অনুরূপ বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন কাঠামো স্থাপন করা হয়েছে। ডিএনসিসি’র অনুমতিপত্র, আলোকচিত্র, স্থানভিত্তিক তালিকা এবং প্রাথমিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রতীয়মান হয় যে, এসব বিজ্ঞাপন কাঠামোর একটি অংশের অবস্থান, অনুমোদনের শর্ত পালন, জননিরাপত্তা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নগর নান্দনিকতার বিষয়সমূহ প্রশাসনিকভাবে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। যা উক্ত এলাকার বিদ্যমান নান্দনিক পরিবেশ, নগর সৌন্দর্য এবং পরিকল্পিত অবকাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে উক্ত এলইডি সাইনসমূহ স্থাপিত হলে গুলশান-১ ও গুলশান-২ চত্বরসংলগ্ন এলাকার নান্দনিক সৌন্দর্য ও দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে ফুটওভার ব্রীজে সাইনবোর্ড স্থাপনের অনুমতি প্রদান করায় মহামান্য হাইকোর্টের রীট নং- ৭১৩২/২০১১এর আদেশ লঙ্ঘন করায় আদালত অবমাননা হিসেবে গণ্য হইবে। উক্ত কার্যক্রমের কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভূমির বাজারমূল্য, বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনের ভাড়ামূল্য এবং সামগ্রিক সম্পত্তি মূল্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ ও হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা পরবর্তীতে সরকারের বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আয় হ্রাসের কারণ হতে পারে। এখানে আরো উল্লেখ্য যে, গুলশান-২ চৌরাস্তার মোড়ে ০৪টি ব-দ্বীপে এলইডি সাইন স্থাপন করতে গিয়ে  বর্তমানে বিদ্যমান দৃষ্টি নন্দন বৃক্ষসমূহ নিষ্ঠুরভাবে কাটা হয়েছে।  গুলশান-২ এলাকার চারটি সড়কদ্বীপে (ব-দ্বীপে) অবস্থিত বৃহৎ ও পরিণত সবুজ গাছ বেষ্টিত অরণ্য দীর্ঘদিন ধরে বিপুল সংখ্যক পাখির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। স্থানীয় পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রতিদিন দিবা ও নিশিকালে বিভিন্ন প্রজাতির বিপুল পাখি  এসব বৃক্ষে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাদের সুন্দর আবাস করে তুলেছে। ফলে উক্ত সড়কদ্বীপসমূহ কেবল নান্দনিক সবুজায়নের উপাদানই নয়, বরং নগর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত ভূমিকা পালন করছে। যাহা বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধনীসহ) এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ২০২৩ এর পরিপন্থী। গুলশান-১ ও গুলশান-২ চত্বরের চারটি সড়কদ্বীপে নতুন করে ০৭ (সাত)টি এলইডি সাইন স্থাপন করায় অতিরিক্ত কৃত্রিম আলোকরশ্মি, সম্ভাব্য বৃক্ষ ছাঁটাই বা অপসারণ এবং সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত বিঘ্নের কারণে এসব পাখির স্বাভাবিক আবাসস্থল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্মুখীন হচ্ছে। বিপুল সংখ্যক পাখি বাস্তুচ্যুত হওয়ায়  স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও নগর পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব হচ্ছে। এসব বিজ্ঞাপন কাঠামো বৃক্ষসমূহকে আড়াল করে এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সবুজায়ন এবং নান্দনিক পরিবেশকে ক্ষুণ্ণ করবে। একই সঙ্গে নগর পরিবেশের পরিবেশগত ভারসাম্য, দৃশ্যমান উন্মুক্ততা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণের লক্ষ্যও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।  ডিএনসিসির কতিপয় কর্মকর্তার বেপরোয়া উপার্জন করতে গিয়ে  বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮(ক), ২১, ২৭, ৩১, ৩২ ও ৩৬; স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯, সিটি কর্পোরেশন (আদর্শ কর তফসিল) বিধিমালা, ২০১৬, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এর পরিবেশ সংরক্ষন বিধিমালা, ২০২৩, ট্রাফিক সাইন ম্যানুয়াল, প্রশাসনিক আইন ও প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের স্বীকৃত নীতিমালা এবং মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের রিট নং- ৭১৩২/২০১১ এর জনস্বার্থসংক্রান্ত নির্দেশনার আলোকে উপস্থাপন করা হলো। এমতাবস্থায়, জনস্বার্থ, সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিতকল্পে ব্যবস্থার নেয়া প্রয়োজন।