কৃষকের কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত সুদ, লোন-অল্টারের নামে বাড়তি অর্থ আদায়
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক যেন নৈরাজ্যের আস্তানা
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকউব) যেনো এক নৈরাজ্যের আস্তানা। এই প্রতিষ্ঠানে সরকার প্রতি বছর বাজেট থেকে আর্থিক বরাদ্দ (ভর্তূকি) দিলেও যথাযথ তদারকি না করায় ওই অর্থ ব্যয় সংক্রান্ত তথ্য সচরাচর প্রকাশ হয় না। ব্যাংকটি মূলত উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার কৃষককে ঋণ প্রদান করে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে খাদ্যশস্য উৎপাদনে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা হলেও সুশাসনের অভাবে বরাবরই তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো কৃষকের কাছ থেকে ঋণের বিপরীতে বিধিবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত সুদ আদায় এবং প্রতি বছর ঋণচুক্তি নবায়নের (লোন-অল্টার) নামে পে-স্লিপ ছাড়াই বাড়তি অর্থ নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঋণগ্রহিতা কৃষকের কাছ থেকে আদায়কৃত এসব অর্থ কোথায় যায়-তাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এ ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা বছরের পর এভাবেই চলে আসছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রংপুরের পীরগঞ্জের কৃষক আফসার আলী ২০২০ সালে করোনাকালীন সরকারের ঘোষিত ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদে ‘কৃষি ও ক্ষুদ্র খামার ঋণ’ হিসেবে রাকউবের খেদমতপুর শাখা (রংপুর-দক্ষিণ) থেকে ৩ লাখ টাকা গ্রহণ করেন। প্রথম দুই বছর ওই ঋণগ্রহিতার কাছ থেকে ৪ শতাংশ হারে সুদ আদায় করা হয়। এরপর থেকে ব্যাংকটির ওই শাখার দায়িত্বপ্রাপ্তরা তার কাছ থেকে বাড়তি সুদ আদায় করতে থাকে। ২০২৩ ও ২৪ সালে ৯ শতাংশ হারে; ২০২৫ সালে ১২ শতাংশ হারে এবং সর্বশেষ ২০২৬-এ ১৫ শতাংশ হারে সুদ আদায় করে। এই প্রতিবেদককে দেয়া হিসেব অনুসারে ওই কৃষক ব্যাংকটিকে ৩ লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে ২০২১ ও ২০২২ সালে ৪ শতাংশ সুদহারে ১২ হাজার টাকা করে মোট ২৪ হাজার টাকা আদায় করে। পরবর্তী ২ বছর সুদবাবদ ৯ শতাংশ হারে ২৭ হাজার করে ৫৪ হাজার টাকা; ২০২৫ সালে ১২ শতাংশ হারে ৩৬ হাজার টাকা এবং ২০২৬ সালে ১৫ শতাংশ বা তার বেশি হারে মোট ৪৫ হাজার ১১৫ টাকা আদায় করা হয়। ওই কৃষক স্বল্পসুদে কৃষিঋণ নেয়ার পর বিগত ৬ বছরে ব্যাংকে পরিশোধ করেছেন মোট ১ লাখ ৫৯ হাজার ১১৫ টাকা। এর বাইরে ওই কৃষকের কাছ থেকে পে-স্লিপ ছাড়াই ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট শাখার দায়িত্বপ্রাপ্তরা প্রতি বছর ঋণ পুণরায় রেজিস্ট্রেশন (রি-রেজিস্ট্রেশন বা লোন-অল্টার) বাবদ ৭ হাজার ৫০০ টাকা করে ৬ বছরে আদায় করেছে ৪৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ রেয়াতি সুদহারে ৩ লাখ টাকার কৃষিঋণ নিয়ে কৃষক আফসার আলী শুধুমাত্র সুদ ও লোন-অল্টার বাবদ পরিশোধ করেছেন ২ লাখ ৪ হাজার ১১৫ টাকা। তার মুল ঋণ ৩ লাখ টাকা এখনও অপরিশোধিতই রয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ঠেকাতে ইসলামী ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকার নির্দেশ
প্রশ্ন উঠেছে, আফসার আলীর মতো উত্তরাঞ্চলের শত শত কৃষকের কাছ থেকে আদায়কৃত বিপুল পরিমাণ অর্থ কি বিধিসম্মত হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি ব্যাংকটির কোম্পানি সচিব মো. সানাউল্লাহ। গতকাল শনিবার ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, ‘ঋণ সম্পর্কিত তথ্যাদি সংশ্লিষ্ট বিভাগ ছাড়া কেউ দিতে পারবে না।’
একাধিকবার চেষ্টা করেও ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম মোর্তজা-কে ফোনে পাওয়া যায়নি। তার দপÍরের ভিজিল্যান্স সেলের প্রধান বাবুল আকতার সরদারকেও ফোনে পাওয়া যায়নি। ব্যাংকটিতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তীতে পর্ষদ চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মোহাম্মদ আলীকে গত ৩০ জুন অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ হয়নি। ব্যবস্থাপনা পরিচালকও নিয়োগ হয়নি দীর্ঘদিন। এমতাবস্থায় ব্যাংকটির প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। সর্বশেষ পর্ষদ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী পর্ষদের শেষ সভা করেছেন ২৮ জুন। একটি অর্থবছর শেষ হতে চললেও সেদিন পর্ষদ সভায় উল্লেখযোগ্য কোনও এজেন্ডা ছিল না। পর্ষদের অন্য সদস্যরা যথাক্রমে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিভাগীয় কমিশনারগণ নিয়ম রক্ষার জন্য পর্ষদ সভায় আসেন। সাধারণ ঋণগ্রহীতা কৃষকদের আর্তনাদ বা দুর্ভোগ তাদের ছুঁতে পারে না। কারণ, মফস্বলে একজন কৃষক তার অভিযোগ নিয়ে পাকা দালানের সুরক্ষিত নিরাপত্তা বেস্টনীর ভিতরে প্রবেশ করার সাহস দেখাতে পারে না। তাই বলতে গেলে অনেকটাই অভিভাবকহীন রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে কর্মরতদের খেয়ালখুশির চাকুরিজীবনে এসব সাধারণ কৃষকের দুঃখ-কষ্টের কোনও মূল্য নেই। তাদের চাই টাকা। সেটা তথ্য লুকিয়ে হোক আর তথ্য দেখিয়ে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করেই হোক।
আরও পড়ুন: রাজধানীর বাজারে স্বস্তি, কমেছে ডিম, সবজি ও পেঁয়াজের দাম
এদিকে, গত ২৯জুন বাংলাদেশ ব্যাংক অন্যান্য বৃহৎ ঋণখেলাপিদের পাশাপাশি সাধারণ কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণগ্রহিতাদের জন্যও অগ্রাধিকার দিয়ে এককালীন এক্সিট সুবিধার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। ওই সুবিধা রংপুরের পীরগঞ্জের আফসার আলী ও তার মতো আর্থিক হয়রানির শিকার কৃষকরা পাবে কি না-তা জানতে চান তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারি মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী এই প্রশ্নের জবাবে বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, কৃষিঋণের ক্ষেত্রেও সুদ মওকুফের সুবিধা প্রযোজ্য হবে। তিনি বলেন, ‘এককালীন যারা ঋণের পুরো টাকা পরিশোধ করে এক্সিট নিতে চান তাদের সকলের জন্যই এই সুবিধা প্রযোজ্য। বরং কৃষিঋণ অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে।’
ওই কৃষকের কাছ থেকে বিধিবহির্ভূতভাবে আদায়কৃত বাড়তি সুদ ও লোন-অল্টারের নামে নেয়া অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেয়া হবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে মুখপাত্র সিদ্দিকী বলেন, এটি হওয়া উচিত। কারণ, কোনভাবেই বাড়তি অর্থ নেয়ার সুযোগ নেই। তবে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকটির পর্ষদে সেটা অনুমোদন নিতে হবে। এ ব্যাপারে ব্যাংকের সদিচ্ছা ও উদ্যোগ বাধ্যতামূলক করতেই বাংলাদেশ ব্যাংক এমন নির্দেশনা দিয়েছে।
মুখপাত্র বলেন, তারপরও আমি বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারণী দপ্তরের সঙ্গে কথা বলে আপডেট দিবো।’
এদিকে, সরকার প্রতি বছরই রাকউব ও কৃষি ব্যাংকে তহবিল দিয়ে থাকে। বাজেটে বরাদ্দ রেখে ওই অর্থ ভর্তুকি দেয়া হয় প্রান্তিক কৃষকদের খেলাপি কৃষিঋণ ও ঋণের সুদ মওকুফ করতে। সরকারের দেয়া ওই তহবিলের সুবিধা প্রকৃত ভুক্তভোগী কৃষকরা পায় কি না তা নিয়েও অনেক প্রশ্ন রয়েছে।





