ঘাতক কর্মচারী হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায়; রাবিতেও মানববন্ধন, দ্রুত বিচারের দাবি
ইবি শিক্ষিকা রুনা হত্যা: মামলায় আসামি চারজন, বিচার দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল ক্যাম্পাস
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক মোছা. আসমা সাদিয়া রুনা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত কর্মচারী ফজলুর রহমানসহ চারজনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। এদিকে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সকালে সমাজকল্যাণ বিভাগের শিক্ষক–শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান নেন। একই সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষক–শিক্ষার্থীরাও মানববন্ধন করে হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত বিচার দাবি করেন।
আরও পড়ুন: ছাত্রদেরকে যৌন নির্যাতনে অভিযুক্ত ঢাবি শিক্ষককে দ্রুত শাস্তির দাবি শিক্ষার্থীদের
মামলায় চারজন আসামি
নিহত শিক্ষিকার স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় দায়ের করা মামলায় প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী ফজলুর রহমানের নাম উল্লেখ করেছেন।
আরও পড়ুন: কুবির অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে র্যাগিংয়ের অভিযোগ
এছাড়া সমাজকল্যাণ বিভাগের দুই শিক্ষক—সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার, সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান এবং বিভাগের সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাসকে মামলার আসামি করা হয়েছে।
মামলার বিষয়ে সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান বলেন,
“ম্যাডাম যেহেতু বেঁচে নেই, তাই আমার পক্ষে বা বিপক্ষে সরাসরি কিছু বলার মতো কেউ নেই। তবে এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন।”
বিক্ষোভে উত্তাল ক্যাম্পাস
হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সকালে সমাজকল্যাণ বিভাগের শিক্ষক–শিক্ষার্থীরা থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। পরে তারা প্রশাসন ভবনের সামনে গিয়ে সমাবেশ করেন।
এ সময় শিক্ষার্থীদের ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘ক্যাম্পাসে লাশ পড়ে, প্রশাসন কী করে’—এ ধরনের স্লোগান দিতে শোনা যায়।
সমাজকল্যাণ বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া সাবরিনা বলেন,
“একজন কর্মচারীর কতোটা সাহস হলে বিভাগীয় সভাপতির কক্ষে ঢুকে বিশ্ববিদ্যালয় চলাকালীন সময়ে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে! আমরা দ্রুত বিচার ও হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রতিবাদ
নিহত আসমা সাদিয়া রুনা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী হওয়ায় সেখানে শিক্ষক–শিক্ষার্থীরাও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের সামনে সমাজকর্ম সমিতি ও সমাজকর্ম বিভাগের উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
ঘটনার পটভূমি
বুধবার (৪ মার্চ) বিকেলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনে সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতির কক্ষে ঢুকে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়।
সেসময় বিভাগের শিক্ষার্থীরা ইফতার মাহফিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। শিক্ষিকার কক্ষ থেকে চিৎকার শুনে শিক্ষার্থীরা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।
হামলার পর অভিযুক্ত ফজলুর রহমান নিজের গলা কেটে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার গলার শ্বাসনালী কেটে গেছে এবং শরীরের আরও কয়েক জায়গায় ক্ষত রয়েছে। তিনি সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
বদলি ও বেতন নিয়ে বিরোধ
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ফজলুর রহমান আগে সমাজকল্যাণ বিভাগে কর্মরত ছিলেন। আচরণগত কারণে প্রায় এক মাস আগে তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়।
এছাড়া পেমেন্ট ও বেতনসংক্রান্ত বিষয় নিয়েও বিভাগের সঙ্গে তার বিরোধ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবারের দাবি, প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তিনি প্রায় নয় মাস ধরে বেতন পাচ্ছিলেন না। এতে পরিবার নিয়ে তিনি চরম আর্থিক সংকটে ছিলেন।
রুনার শেষ বিদায়:
ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার বাদ জোহর কুষ্টিয়া কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে আসমা সাদিয়া রুনার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাকে কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শোক ও ক্ষোভের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।





