‘তড়িঘড়ির প্রশ্নই আসে না, নির্ধারিত সময়েই গেজেট প্রকাশ’ দাবি ইসির

ঋণখেলাপী এমপিদের তদন্ত না করে তড়িঘড়ি গেজেট প্রকাশ: অভিযোগ সুজনের

Sanchoy Biswas
এম এম লিংকন
প্রকাশিত: ৫:৫৯ অপরাহ্ন, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৭:৪৭ অপরাহ্ন, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক ঋণগ্রহীতার উপস্থিতি এবং অযোগ্যতার অভিযোগ তদন্ত ছাড়াই গভীর রাতে গেজেট প্রকাশ—এই দুই ইস্যুকে ঘিরে নির্বাচন-পরবর্তী বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)) অভিযোগ করেছে, গুরুতর প্রশ্ন ওঠার পরও নির্বাচন কমিশন তদন্ত না করে তড়িঘড়ি গেজেট প্রকাশ করেছে। তবে নির্বাচন কমিশন বলেছে, “তড়িঘড়ির প্রশ্নই আসে না”—সবকিছু নির্ধারিত সময় ও আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ( ১৯ ফেব্রুয়ারী) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাব-এ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য, তারা যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তাহলে নির্বাচনের ফলাফলের সমীকরণই বদলে যায়। তখন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।” তার দাবি, এমন প্রশ্ন ওঠার পর নির্বাচন কমিশনের তদন্ত করার সাংবিধানিক ও আইনি সুযোগ ছিল, কিন্তু তারা তা প্রয়োগ করেনি।

আরও পড়ুন: পিতামাতার কবর জিয়ারতে তিন দিনের সফরে কক্সবাজার যাচ্ছেন সিইসি

৫০ শতাংশের কাছাকাছি ঋণগ্রহীতা বিজয়ী: 

সুজনের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে বিজয়ী ২৯৭ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৪৭ জনই ঋণগ্রহীতা—শতাংশের হিসাবে প্রায় ৫০ শতাংশ। তাঁদের মধ্যে পাঁচ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে ৩৬ জনের। ঋণগ্রহীতাদের বড় অংশই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে নির্বাচিত—সংখ্যা ১২৬।

আরও পড়ুন: ঈদের আগেই নারী আসন ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন?

সুজন আরও জানায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঋণগ্রহীতার হার ছিল ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ এবার সেই হার বেড়েছে। নির্বাচনের আগে ৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০২৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫১৯ জন (২৫.৬২%) ঋণগ্রহীতা ছিলেন; তাঁদের মধ্যে ৭৫ জনের ঋণের পরিমাণ পাঁচ কোটির বেশি। সর্বোচ্চ ঋণগ্রহীতা প্রার্থী ছিল বিএনপির—১৬৭ জন।

দ্বৈত নাগরিকত্ব ও হলফনামা বিতর্ক: 

সুজনের অভিযোগ, কেবল ঋণখেলাপিই নয়—দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্নেও একাধিক প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। অনেকে প্রয়োজনীয় নথি ছাড়া কিংবা আদালতের ‘স্টে অর্ডার’ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। এসব বিষয়ে তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর গেজেট প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছিল। এমনকি নির্বাচনের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে কি না, তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়ন করার সুপারিশও করা হয়।

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-এর ৯১ ধারা অনুযায়ী গেজেট প্রকাশের পরও তদন্তের সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনে ফলাফল বাতিল বা পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও কমিশনের আছে। “এখনো সময় আছে—ইসি চাইলে আইন প্রয়োগ করতে পারে,” মন্তব্য তাঁর।

ইসির অবস্থান: ‘স্মার্ট ও সময়োপযোগী প্রক্রিয়া’: 

এরআগে ১৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোট একই অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। সেই  অভিযোগ নাকচ করে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, গেজেট প্রকাশে “তড়িঘড়ির প্রশ্নই আসে না। আমরা প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় দ্রুত ও নির্ভুলভাবে ফলাফল প্রস্তুত করেছি।” তাঁর দাবি, কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাত-দিন পরিশ্রম করে যথাসময়ে গেজেট প্রকাশ করেছেন।

ইসির মতে, বড় ধরনের সহিংসতা বা ভোট স্থগিতের ঘটনা না ঘটায় নির্বাচন প্রত্যাশার চেয়েও ভালো হয়েছে। ফলে গেজেট প্রকাশে বিলম্বের কোনো প্রয়োজন ছিল না।

আইনি প্রশ্ন বনাম প্রশাসনিক আত্মবিশ্বাস

বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন কেবল সহিংসতামুক্ত হলেই যথেষ্ট নয়; প্রার্থীদের যোগ্যতা, হলফনামার সত্যতা ও আর্থিক স্বচ্ছতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সুজনের অভিযোগ অনুযায়ী, যদি অযোগ্য প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে থাকেন, তাহলে তা নির্বাচনের ন্যায্যতা ও ফলাফলের বৈধতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের আত্মবিশ্বাসী অবস্থান ইঙ্গিত করছে—তারা প্রক্রিয়াগত দিক থেকে নিজেদের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত বলেই মনে করছে।

বিতর্কের কেন্দ্রে এখন আরপিওর ৯১ ধারা। তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হবে, নাকি গেজেট প্রকাশের মধ্যেই সব প্রশ্নের ইতি টানা হবে—সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে নির্বাচন-পরবর্তী আইনি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সহিংসতামুক্ত হলেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা আপাতত থামছে না।