গিটার হাতে যে তরুণ ঘর ছেড়েছিলেন, আজ সেই জেমসের জন্মদিন
বাংলা রকসংগীতের ইতিহাসে ফারুক মাহফুজ আনাম—জেমস—একটি আলাদা পরিচয়। গভীর কণ্ঠ, গিটার হাতে মঞ্চে উপস্থিতি এবং নিজস্ব গায়কির কারণে কয়েক দশক ধরে সংগীতপ্রেমীদের কাছে তিনি জনপ্রিয়। প্রেম-বিরহ থেকে শুরু করে দেশ ও জীবনের নানা অনুভূতি তার গানে জায়গা পেয়েছে।
আজ ২ অক্টোবর এই জনপ্রিয় শিল্পীর জন্মদিন। ১৯৬৪ সালের এই দিনে নওগাঁয় জন্ম নেন জেমস। তবে তার বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তার ছিল গভীর আগ্রহ। সেই আগ্রহ থেকেই একসময় পরিবারের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে ঘর ছাড়েন তিনি। চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিংয়ে শুরু হয় তার জীবনের নতুন অধ্যায়।
আরও পড়ুন: ফের জুটি বাঁধছেন বিদ্যা-বাল্কি
গিটার ও সংগীতের স্বপ্নকে সঙ্গী করে সেই সময় থেকেই নিজের আলাদা সংগীতভুবন তৈরির চেষ্টা শুরু করেন জেমস। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে পরবর্তীতে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত রকশিল্পী।
‘ফিলিংস’ থেকে ‘নগর বাউল’
আরও পড়ুন: দুই সিনেমার মুক্তির ছন্দপতন
১৯৮০ সালে ‘ফিলিংস’ ব্যান্ড গঠনের মধ্য দিয়ে পেশাদার সংগীতজগতে যাত্রা শুরু করেন জেমস। ব্যান্ডটির প্রধান কণ্ঠশিল্পী ও লিড গিটারিস্ট হিসেবে দ্রুতই নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন তিনি।
১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয় ফিলিংসের প্রথম অ্যালবাম ‘স্টেশন রোড’। অ্যালবামটি ব্যান্ডসংগীতের শ্রোতাদের মধ্যে জেমসকে নতুনভাবে পরিচিত করে তোলে। পরের বছর একক অ্যালবাম ‘অনন্যা’ প্রকাশের পর তার জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে।
এরপর ফিলিংস থেকে প্রকাশিত হয় ‘জেল থেকে বলছি’ (১৯৯০), ‘নগর বাউল’ (১৯৯৬), ‘লেইস ফিতা লেইস’ (১৯৯৮) এবং ‘কালেকশন অব ফিলিংস’ (১৯৯৯)। পরে ব্যান্ডটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘নগর বাউল’। এই নামেও জেমস ও তার ব্যান্ড শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষ পরিচিতি পায়।
একক অ্যালবামেও সাফল্য
ব্যান্ডের পাশাপাশি একক শিল্পী হিসেবেও জেমসের রয়েছে দীর্ঘ সফল ক্যারিয়ার। তার উল্লেখযোগ্য একক অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে ‘পালাবি কোথায়’ (১৯৯৫), ‘দুঃখিনী দুঃখ করো না’ (১৯৯৭), ‘ঠিক আছে বন্ধু’ (১৯৯৯), ‘আমি তোমাদেরই লোক’ (২০০৩), ‘জনতা এক্সপ্রেস’ (২০০৫), ‘তুফান’ (২০০৬) ও ‘কাল যমুনা’ (২০০৯)।
তার কণ্ঠে ‘তারায় তারায় রটিয়ে দেব’, ‘মা’, ‘বাংলাদেশ’, ‘পাগলা হাওয়া’, ‘দুষ্টু ছেলের দল’, ‘গুরু ঘর বানাইলা কী দিয়া’ এবং ‘মিরাবাই’-এর মতো গান শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
বলিউডেও জেমসের কণ্ঠ
বাংলাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রেও নিজের জায়গা করে নেন জেমস। ২০০৬ সালে অনুরাগ বসু পরিচালিত ‘গ্যাংস্টার’ সিনেমার ‘ভিগি ভিগি’ গান দিয়ে বলিউডে প্লেব্যাক শুরু করেন তিনি। গানটি প্রকাশের পর ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
এরপর ‘ওহ লামহে’, ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’ ও ‘ওয়ার্নিং’-সহ বিভিন্ন সিনেমায় প্লেব্যাক করেন জেমস। হিন্দি গানেও তার স্বতন্ত্র কণ্ঠ শ্রোতাদের আলাদা করে আকৃষ্ট করে।
বলিউডে কাজের সুবাদে সেখানে স্থায়ী হওয়ার প্রস্তাবও পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। তবে নিজের দেশ ছেড়ে স্থায়ীভাবে অন্যত্র থাকতে আগ্রহী ছিলেন না তিনি। ফলে সেসব প্রস্তাব গ্রহণ করেননি এই শিল্পী।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছেন
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেও স্বীকৃতি পেয়েছেন জেমস। ‘দেশা: দ্য লিডার’ (২০১৪) এবং ‘সত্তা’ (২০১৭) সিনেমায় গান গেয়ে সেরা পুরুষ প্লেব্যাক গায়ক বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।
একসময় গিটার হাতে সংগীতের স্বপ্ন নিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন যে তরুণ, চার দশকের বেশি সময় পর সেই জেমসই বাংলা রকসংগীতের অন্যতম পরিচিত নাম। মঞ্চে গিটার হাতে উঠলেই তার কণ্ঠে আজও উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন অসংখ্য ভক্ত। নিজস্ব গায়কির ধারা ও সংগীতের প্রতি দীর্ঘদিনের নিবেদনেই প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতার কাছে তিনি পরিচিত হয়েছেন ‘গুরু’ নামে।





