সৌদির পাশে নেই মিত্ররা, হুথিদের মোকাবিলায় কঠিন পরিস্থিতিতে রিয়াদ

Sadek Ali
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ২:৩২ অপরাহ্ন, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২:৩২ অপরাহ্ন, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ইয়েমেনে হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা এবং সৌদি আরবের ভেতরে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনায় নতুন চাপে পড়েছে রিয়াদ। একই সময়ে দেশের তেল অবকাঠামোও হামলার মুখে পড়ায় সৌদি আরবকে এখন একদিকে ইয়েমেনে হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিজ ভূখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষা করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সৌদির প্রচলিত মিত্রদেরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে দেখা যাচ্ছে না।

কয়েক মাস ধরে ইরানকে ঘিরে চলা যুদ্ধের প্রভাব থেকে তুলনামূলকভাবে দূরে ছিল সৌদি আরব। দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোও এ সময় ভালো মুনাফা করেছে। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে এই পাইপলাইনের মাধ্যমে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি করা সম্ভব হয়।

আরও পড়ুন: অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থী ভিসায় পরিবার আনার সুযোগ বন্ধ, থাকছে কিছু ছাড়

তবে ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলার পর সেই ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরের জন্যও নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে। এমনকি ইসলামের পবিত্রতম শহর মক্কার আকাশে একটি হুথি ড্রোন ভূপাতিত করার কথাও জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। তবে মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুথিরা।

সব মিলিয়ে সৌদি আরব এখন কার্যত দুই দিকের চাপের মুখে রয়েছে। ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীকে হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে হচ্ছে, আর একই সঙ্গে সৌদি ভূখণ্ডে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

আরও পড়ুন: সৌদির এফ-১৫ ভূপাতিত যুদ্ধবিমানের ভিডিও প্রকাশ হুথিদের

এর মধ্যেই সৌদি আরবের বিমান প্রতিরক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশ্বিক সরবরাহ কমে আসার বিষয়টিও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

পাশে নেই নতুন মিত্ররাও

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদারত্বের পাশাপাশি সৌদি আরব সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। মক্কা চুক্তির আওতায় তুরস্ক ও পাকিস্তানও সৌদির নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা অংশীদার হয়েছে। কিন্তু হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতে এই দুই দেশ এখন পর্যন্ত সরাসরি জড়ানোর আগ্রহ দেখায়নি।

চ্যাথাম হাউসের উপসাগরীয় বিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিল কুইলিয়াম মিডল ইস্ট আইকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরব বেশ কঠিন অবস্থার মধ্যে রয়েছে। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এখন পাশে নেই এবং মক্কা চুক্তির অংশীদার দেশগুলোরও তেমন সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে না। ফলে সৌদির হাতে সামরিক ও কূটনৈতিক বিকল্প সীমিত হয়ে পড়েছে।

ইয়েমেনে সৌদির নির্ভরযোগ্য বাহিনী কতটা?

লোহিত সাগরের উপকূল ধরে হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রার ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়েছে। এ পথটি এশিয়ায় সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল পাঠানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। একই সঙ্গে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার কারণে ইউরোপে সৌদির তেল সরবরাহও ঝুঁকিতে পড়েছে।

হুথিরা এখন ইয়েমেনের কৌশলগত শহর তাইজ ও মারিবের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এসব এলাকা হুথিদের নিয়ন্ত্রণে গেলে সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

তবে ইয়েমেনে স্থলসেনা পাঠাতে আগ্রহী নয় সৌদি আরব। দেশটির মাটিতে নির্ভরযোগ্য মিত্র বাহিনীর সংখ্যাও সীমিত। একসময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থন পাওয়া ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকা ধরে রেখেছিল। কিন্তু হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রার সময় সেই বাহিনী কার্যত ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটপ্রাচ্যবিষয়ক অধ্যাপক বার্নার্ড হেইকলের মতে, বর্তমানে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে লড়াই করতে সক্ষম সৌদি-সমর্থিত বাহিনীগুলোর মধ্যে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) অন্যতম।

তবে এসটিসি দক্ষিণ ইয়েমেনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ কারণে তাদের সঙ্গে সৌদি আরবের স্বার্থের পার্থক্য রয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে এসটিসিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থন দেওয়াকে কেন্দ্র করে আবুধাবি ও রিয়াদের সম্পর্কেও বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল।

হুথিদের বিরুদ্ধে আবার বড় ধরনের বিমান অভিযান?

দেশের অভ্যন্তরে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সৌদি আরবের তেল শিল্পেও প্রভাব ফেলছে। মঙ্গলবার ইউরোপে কয়েকটি তেল চালান বাতিল করেছে সৌদি আরব। লোহিত সাগরের বন্দর ইয়ানবুতে তেল ওঠানোর কার্যক্রমও স্থগিত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের শেষ প্রান্তে রয়েছে এই বন্দর।

এ পরিস্থিতি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনাকেও চাপে ফেলতে পারে। তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডেটা সেন্টার, পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সৌদির। আগামী মাসে দেশটিতে একটি বড় বিনিয়োগ সম্মেলনও হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে এক দশক আগে ইয়েমেনে যে মাত্রায় সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল, এবার এখন পর্যন্ত সে পর্যায়ে যায়নি সৌদি আরব। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে দেশটি কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করেছে। ২০২২ সালে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে যুদ্ধবিরতিও হয়েছিল। তবে হুথি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের বন্দর ও বিমানবন্দরের ওপর সৌদির অবরোধ বহাল রয়েছে।

রিয়াদে কর্মরত এক পশ্চিমা কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, এবার সৌদি আরব আগের অভিজ্ঞতা থেকে সতর্ক। ইয়েমেনে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ফলে আন্তর্জাতিক জনমত ও অস্ত্র রপ্তানির অনুমোদনসহ নানা ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। তাই নতুন করে একই পরিস্থিতিতে যেতে চায় না সৌদি নেতৃত্ব।

হুথিদের সঙ্গে সমঝোতার পথ কতটা খোলা?

হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা এবং দেশটির জনবহুল বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করলেও দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক, আকাশ ও সমুদ্র অবরোধের মধ্যে রয়েছে। ২০২২ সালের জাতিসংঘ-সমর্থিত যুদ্ধবিরতির পরিকল্পনায় এসব বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া এবং হুথি ও সৌদি-সমর্থিত পক্ষগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক আলোচনা শুরুর কথা ছিল। কিন্তু সেই আলোচনা কার্যকর অগ্রগতি পায়নি।

আঞ্চলিক কূটনীতিকদের মতে, লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর হুথিদের চাপের পেছনে অর্থনৈতিক দাবিও রয়েছে। হুথিদের বক্তব্য, তাদের নিয়ন্ত্রিত বন্দর ও বিমানবন্দরগুলো অবাধে পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হলেই সৌদি জাহাজের ওপর অবরোধ তুলে নেওয়া হবে।

বার্নার্ড হেইকলের মতে, উত্তেজনা বাড়লে সৌদি আরবের সামনে কয়েকটি সামরিক ও কূটনৈতিক বিকল্প রয়েছে। এর মধ্যে হুথিদের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার পথও একটি সম্ভাবনা হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

তবে চ্যাথাম হাউসের নিল কুইলিয়ামের মতে, হুথিদের দাবির কাছে সরাসরি নতি স্বীকার করা রিয়াদের জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন হবে। কারণ সৌদি আরব নিজেকে মধ্যম শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে এবং হুথিদের শর্ত মেনে নেওয়াকে তারা নিজেদের অবস্থানের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখতে পারে।

‘এয়ার ক্যাম্পেইন ২.০’-এর সম্ভাবনা

সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, আগের ইয়েমেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধে জড়াবে না রিয়াদ। বরং সীমিত ও পরিকল্পিত সামরিক চাপ এবং একই সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চালানো হতে পারে।

রিয়াদের নায়েফ আরব ইউনিভার্সিটি ফর সিকিউরিটি সায়েন্সেসের কৌশলগত গবেষণা ও জাতীয় নিরাপত্তা কর্মসূচির মহাপরিচালক হিশাম আলঘান্নাম বলেন, পূর্ণমাত্রার স্থলযুদ্ধে ফিরে গেলে আগের দীর্ঘ সামরিক অভিযানের মতোই সীমিত ফল পাওয়া যেতে পারে এবং এতে সৌদির অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তার মতে, সৌদির জন্য তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত পথ হলো নিয়ন্ত্রিত সামরিক চাপের মাধ্যমে সৌদি অবকাঠামোয় হামলার খরচ বাড়ানো এবং একই সঙ্গে এমন একটি সমঝোতার পথ তৈরি করা, যাতে হুথি নেতৃত্বও মুখ রক্ষার সুযোগ পায়।

অন্যদিকে সৌদি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আবদুলআজিজ আলঘাশিয়ান ‘ডেসিসিভ স্টর্ম ২.০’-এর মতো নতুন বিমান অভিযান চালানোর সম্ভাবনার কথা বলেছেন। এক দশক আগে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন ডেসিসিভ স্টর্ম’।

তার মতে, হুথিরা ইয়েমেনে নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং নিকট ভবিষ্যতে কার্যকর ইয়েমেনি রাজনৈতিক সংলাপের সম্ভাবনাও স্পষ্ট নয়। তাই সৌদি আরব আবার বিমান অভিযানকেই একটি সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।

আলঘাশিয়ান আরও বলেন, সৌদি আরবের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তা ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশ ও আরব অংশীদারদের কাছ থেকে সম্ভাব্য সামরিক ও রাজনৈতিক সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে রিয়াদ।

সব মিলিয়ে ইয়েমেনে সৌদি আরবের পরবর্তী পদক্ষেপ অনেকটাই নির্ভর করবে দেশটির মিত্ররা হুথিদের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতে কী ধরনের ভূমিকা নেয় এবং রিয়াদ সামরিক চাপ ও কূটনৈতিক সমঝোতার মধ্যে কোন পথ বেছে নেয় তার ওপর।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই