চুলে সাবান ব্যবহার কতটা নিরাপদ? নিয়মিত ব্যবহারে হতে পারে যে ক্ষতি
শ্যাম্পুর প্রচলন হওয়ার আগে চুল পরিষ্কারে সাধারণ সাবান ব্যবহার করাই ছিল অনেকের কাছে স্বাভাবিক অভ্যাস। বর্তমানে ন্যাচারাল বিউটি রুটিন ও মিনিমালিস্ট স্কিনকেয়ারের জনপ্রিয়তার কারণে চুলে সাবান ব্যবহারের প্রবণতা কিছুটা ফিরে আসছে। তবে ত্বক পরিষ্কারে যে সাবান উপযোগী, সেটি চুল ও মাথার ত্বকের জন্যও সমান নিরাপদ—এমনটা নয়। চুলে সাবান ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর পিএইচ (pH) মাত্রা। ত্বক, মাথার ত্বক ও চুলের স্বাভাবিক পিএইচের সঙ্গে সাবানের পিএইচের পার্থক্যই দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে সমস্যার কারণ হতে পারে।
ত্বক ও চুলের জন্য সাবান আলাদা কেন?
আরও পড়ুন: শীতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে খাবেন যেসব খাবার
মানুষের ত্বকের স্বাভাবিক পিএইচ সাধারণত ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ দশমিক ৫-এর মধ্যে থাকে। অর্থাৎ ত্বক সামান্য অম্লীয়। অন্যদিকে প্রচলিত সাবানের পিএইচ সাধারণত ৯ থেকে ১০-এর মধ্যে, যা তুলনামূলকভাবে ক্ষারীয়।ত্বক এই ধরনের পরিষ্কারক ব্যবহারের সঙ্গে কিছুটা মানিয়ে নিতে পারে। কিন্তু মাথার ত্বক ও চুলের গঠন ভিন্ন। মাথার ত্বকের পিএইচও সাধারণত ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ দশমিক ৫-এর মধ্যে থাকে। চুলের বাইরের স্তর বা কিউটিকলও সামান্য অম্লীয় পরিবেশে তুলনামূলকভাবে মসৃণ ও সমতল থাকে। ক্ষারীয় সাবান ব্যবহারে কিউটিকল ফুলে ও উঁচু হয়ে যেতে পারে। এতে চুলের স্বাভাবিক মসৃণতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সাবান কি চুলের ক্ষতি করে?
আরও পড়ুন: র্যাশ ছাড়াই টানা চুলকানি? যে ৪ পরীক্ষা করানোর পরামর্শ
মাঝেমধ্যে চুলে সাবান ব্যবহার করলেই বড় ধরনের ক্ষতি হবে—এমনটা বলা যায় না। তবে নিয়মিত ও দীর্ঘদিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। শুষ্কতা ও রুক্ষতা: সাবান মাথার ত্বক ও চুলের প্রাকৃতিক তেল অনেকটা দূর করে দিতে পারে। ফলে চুল শুষ্ক ও রুক্ষ হয়ে যেতে পারে। চুল জট বাঁধা ও ভেঙে যাওয়া: ক্ষারীয় সাবানের কারণে কিউটিকল উঁচু হয়ে গেলে চুলের গোছা পরস্পরের সঙ্গে বেশি জড়িয়ে যেতে পারে। পরে জট ছাড়াতে গিয়ে চুল ছিঁড়ে বা ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। মাথার ত্বকের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া: মাথার ত্বকের স্বাভাবিক পিএইচের ভারসাম্য পরিবর্তিত হলে এর মাইক্রোবায়োমেও প্রভাব পড়তে পারে। এর সঙ্গে চুলকানি বা খুশকির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
চুলের উজ্জ্বলতা কমে যাওয়া: মসৃণ কিউটিকল আলো তুলনামূলকভাবে সমানভাবে প্রতিফলিত করে। কিন্তু কিউটিকল রুক্ষ ও উঁচু হয়ে গেলে চুল আগের তুলনায় নিষ্প্রভ দেখাতে পারে। রঙ করা চুলে দ্রুত রং ফিকে হওয়া: রঙ করা বা রাসায়নিকভাবে ট্রিট করা চুলে উঁচু কিউটিকলের কারণে রঙের অণু দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে চুলের রং তুলনামূলক দ্রুত ফিকে হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
প্রতিদিন চুল ধুলেই কি চুল বেশি তৈলাক্ত হয়?
চুলে সাবান ব্যবহারের পাশাপাশি চুল কত ঘন ঘন ধোয়া উচিত, তা নিয়েও অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে। ২০২১ সালে Journal of Skin Appendage Disorders-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় শ্যাম্পু করার হার এবং মাথার ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করা হয়। এতে বিশেষ করে এশীয় ধরনের চুলের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।
গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিদিন শ্যাম্পু করা মাথার ত্বকের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। খুশকি প্রতিরোধী শ্যাম্পু ব্যবহারের ক্ষেত্রেও মাথার ত্বকে তেল উৎপাদন বাড়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, ঘন ঘন চুল ধুলেই মাথার ত্বক অতিরিক্ত তৈলাক্ত হয়ে যায়—এই প্রচলিত ধারণা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়।
তাহলে চুল পরিষ্কারে কী করবেন?
চুল ও মাথার ত্বকের জন্য পরিষ্কারক বেছে নেওয়ার সময় শুধু ‘প্রাকৃতিক’ বা ‘পুরোনো পদ্ধতি’ কি না, সেটি বিবেচনা না করে পণ্যের উপাদান ও পিএইচের বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে যাদের চুল রঙ করা, রাসায়নিকভাবে ট্রিট করা বা স্বাভাবিকভাবেই শুষ্ক, তাদের ক্ষেত্রে সাধারণ ক্ষারীয় সাবান নিয়মিত ব্যবহার না করাই ভালো। চুল ও মাথার ত্বকের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত শ্যাম্পু বা ক্লিনজার বেছে নেওয়া বেশি নিরাপদ।
সবশেষে, চুলে সাবান ব্যবহারকে একেবারে নিষিদ্ধ বলা না গেলেও নিয়মিত ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ পরিষ্কার করার পাশাপাশি চুলের স্বাভাবিক আর্দ্রতা, কিউটিকল এবং মাথার ত্বকের পিএইচের ভারসাম্যও ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।





