‘আগেই ভালো ছিলাম’ ন্যারেটিভে সাধারণকে উস্কানির চেষ্টা

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১০:১৫ অপরাহ্ন, ১১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১১:২১ অপরাহ্ন, ১১ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি ও অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলে ধরে দেশের নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী সাধারণ মানুষকে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ করে তুলতে পাড়া মহল্লায় এমএলএম পদ্ধতিতে অসংখ্য এজেন্ট নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। 

'আগেই ভালো ছিলাম'  ন্যারেটিভ তৈরি করতে পার্শ্ববর্তী দেশসহ বিদেশে পলাতক নেতা ব্যবসায়ী ও আমলারা সরাসরি ফোন করে তাদের নিজস্ব লোকজনের মাধ্যমে এজেন্টদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে দৈনিক ভিত্তিতে টাকা বিতরণ করছে। এই ন্যারেটিভ তৈরিতে একাধিক কর্মী এজেন্ট ও বিদেশে অবস্থানরত দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে দেশে সরকার বিরোধী উস্কানি এবং পলাতক ফ্যাসিস্ট এর পক্ষে জনমত তৈরির অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। 

আরও পড়ুন: শেখ হাসিনা আর কখনো দেশে ফিরতে পারবেন না: রাশেদ খাঁন

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তার সাথে কথা বলেও এই ধরনের তৎপরতার সত্যতা বিদ্যমান আছে। এই প্রতিবেদক সম্প্রতি রাজধানীর নতুন বাজার, মহাখালী, তেজগাঁও, আগারগাঁও নদ্দা কাঁচা বাজার এলাকায় খুচরা পণ্য কিনতে গিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এই ন্যারেটিভের সন্ধান পায়। পরবর্তীতে পরিচিত কয়েকজন আওয়ামী লীগ সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তি ও বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজনের সাথে কথা বলে এই কর্মসূচির বিস্তারিত সন্ধান পায়। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, রিক্সাচালক, সিএনজি চালক, গার্মেন্ট বা জনবহুল এলাকায়  চায়ের স্টলের আড্ডা, ফুটপাতে ব্যবসায়ী, বস্তিবাসী হিজড়া ভবঘুরেসহ নিম্নআয়ের মানুষকে টার্গেট করে মোটিভেশন শুরু করেছেন। প্রশিক্ষিত একজন কর্মীর সাথে কথা বলে জানা যায়, ৫ আগস্ট পরবর্তী তার নামে মামলা না থাকায় বাসা বদলে স্বাভাবিক বসবাস করছে। এই সুযোগে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে উচ্চতর ডিগ্রি লাভসহ পুরনো পলাতক দলীয় নেতার সাথেও যোগাযোগ রক্ষা করছে। আগস্ট মাসের শুরুতেই হঠাৎ করে কলকাতা থেকে ফোন আসে নতুন দায়িত্ব দিয়ে। ওপার থেকে বলা হয় তুমি কিছু দায়িত্ব পালন কর তোমাকে সরাসরি পুতুল আপার সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হবে। প্রতিদিন সপ্তাহে মাসিক এসাইনমেন্ট রিপোর্ট পাঠাবা। এসব সমাজের শ্রমজীবী মানুষের সাথে কৌশলে মিশে গিয়ে তাদের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগির খোঁজখবর নিয়ে আস্তে আস্তে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ  প্রকাশ করতে হবে। ফুটপাতে বা  শ্রমজীবী  এলাকায় চায়ের স্টলে বসে আলোচনায় অংশ নিতে হবে চা খাওয়ার ছলে। চায়ের আড্ডায় দেশের পরিস্থিতি বিশেষ করে লাগামহীন দ্রব্যমূল্য, নিয়ন্ত্রণহীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিশেষ করে সরকারি দলের নামের চাঁদাবাজি, দখলবাজি তুলে ধরে জনগণকে মোটিভেট করতে হবে। এরই সুযোগে কৌশলগতভাবে বলতে হবে ‘আগেই ভালো ছিলাম'। চায়ের একাধিকবার বসে আড্ডা জমিয়ে দোকানিকে ম্যানেজ করতে হবে। প্রয়োজনে দোকানিকে চায়ের পুরো বিল অথবা ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা বকশিশ দিয়ে তাকেও এজেন্ট নিয়োগ করতে হবে। দোকানির মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পক্ষে ‘আগেই ভালো ছিলাম’ জনমত তৈরির কাজে সহায়তা নিতে হবে। চা স্টল মালিক ও মেসিয়ার, বয়কে মাসিক ভিত্তিতে প্রণোদনা দিয়ে বয়ান তৈরিতে কাজে লাগানো হচ্ছে। একই কায়দায় রিক্সাঅটো-সিএনজি চালকদেরও নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। 

আরও পড়ুন: সড়কে মাফিয়াতন্ত্র ও চাঁদাবাজির অবসান ঘটাতে হবে: রিজভী

প্রতিদিন এক বা একাধিক রিকশায় উঠে গল্পের ছলে দ্রব্যমূল্য যানজট চাঁদাবাজি নিয়ে আলোচনা শুরু করে নিজেকে বিএনপির লোক বা জুলাই যোদ্ধা দাবি করে সরকারের কর্মকাণ্ডের কথা প্রকাশ করে বলা হয় এর চেয়ে আগেই ভালো ছিল। হাসিনা শাসনের কিছু সমালোচনা করে ভালো কাজগুলো বর্তমান সরকারের ব্যর্থতাগুলো তুলে ধরে একইভাবে তাকে মোটিভেটেড করে তোলে। 

গন্তব্যে গিয়ে নির্ধারিত ভাড়ার বেশি টাকা দিয়ে তাকে ভালো লেগেছে বলে মোবাইল নাম্বারটি নিয়ে নেয়। পরবর্তীতে আবার তার সাথে যোগাযোগ করে তাকে এজেন্ট কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেয়। বলা হয় যত প্যাসেঞ্জার তার রিক্সায় উঠবে তাদের কেউ যেন সরকারের অপকর্মগুলো তুলে ধরে বলে ‘আগেই ভালো ছিলাম’। একই ভাবে কাঁচা বাজার ও ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও চাঁদাবাজি দেখিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে দেয়া হচ্ছে। 

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নিয়োজিত এজেন্টরা সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে বিভিন্ন নির্ধারিত পয়েন্টে আলোচনা করে সরকার বিরোধী ও হাসিনার পক্ষে বয়ান তৈরি করে এগুলোর অডিও-ভিডিও রেকর্ড করে প্রতিদিনই নির্ধারিত গ্রুপে মেসেজ পাঠাচ্ছে। 

এমএলএম -এর পদ্ধতিতে এজেন্ট নিয়োগ মহল্লা ভিত্তিকভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। রিকশাচালক, চা স্টল দোকানি ও ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রতিদিন প্রতিজনকে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা করে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। সারা দেশের এবং রাজধানীর অডিও, ভিডিও প্রতিবেদনগুলো নির্ধারিত ডেস্ক থেকে কম্পাইল করে তাদের কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেলে পাঠানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। এগুলোর অগ্রগতি দেখে প্রতিদিনের বিভিন্ন সুপারিশমালা প্রেরণ করছে নির্ধারিত এলাকা ভিত্তিক কর্মীদের।