ফের বিক্ষোভে উত্তাল ভারত, ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ

Sanchoy Biswas
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ৮:৩৮ অপরাহ্ন, ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৯:৪০ অপরাহ্ন, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ভারতে ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধনকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় ১০০ কোটি ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দলগুলো। তাদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপিকে নির্বাচনে সুবিধা দিতে পরিকল্পিতভাবে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন বিজেপি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার ঘটনায় দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিও জোরালো হচ্ছে।

আরও পড়ুন: ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে স্মরণ করা হলো ‘৩৬ জুলাই’

বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি তরুণদের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) শনিবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে বড় ধরনের বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। সিজেপির দাবি, বিক্ষোভের কয়েকজন নেতাকে আগেই আটক করা হয়েছে।

ভোটার তালিকা থেকে বাদ ১৩ কোটি নাম

আরও পড়ুন: সাবেক মার্কিন সেনা কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার হবে: পেন্টাগন

নির্বাচন কমিশনের তথ্যের বরাত দিয়ে বিজেপি জানিয়েছে, ভোটার তালিকা যাচাইয়ের সময় প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। সংখ্যাটি জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।

বাদ পড়া নামগুলোর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত ভোটারের, ৬ কোটি ৩০ লাখ অন্যত্র চলে যাওয়া ব্যক্তির। এ ছাড়া প্রায় ১ কোটি ভোটারের নাম একাধিকবার তালিকাভুক্ত ছিল এবং প্রায় ৩ কোটি ভোটারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে।

তবে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের এ প্রক্রিয়ায় মুসলিমসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তাদের দাবি, বিজেপিকে সমর্থন করার সম্ভাবনা কম—এমন ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।

নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধী নেতারা বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেছেন। তাদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে নাগরিকদের ভোটাধিকার সংকুচিত করা হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক

ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে কমিশনের দুই সদস্য ভোটার নিবন্ধন, তালিকা সংশোধন ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রায় ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে এসব বিষয়ে আপত্তি জানানো হলেও তা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন বিরোধী নেতারা।

তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মতপার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। কমিশনের সব সিদ্ধান্ত আইন অনুযায়ী নেওয়া হয়েছে দাবি করে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে সংস্থাটি।

অন্যদিকে বিজেপির অভিযোগ, বিরোধীরা বৈধ নির্বাচনি প্রক্রিয়া নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল করার চেষ্টা করছে।

রাজ্য নির্বাচন সামনে রেখে বাড়ছে উদ্বেগ

ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক এমন সময়ে তীব্র হয়েছে, যখন আগামী বছরের শুরুতে ভারতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী বছর অন্তত সাতটি রাজ্যে ভোট হতে পারে। এর মধ্যে বিজেপিশাসিত উত্তর প্রদেশও রয়েছে, যা ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য এবং জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে উত্তর প্রদেশে ভোটার তালিকা যাচাই শুরু হওয়ার পর প্রায় ১৩ শতাংশ নাম বাদ পড়েছে। তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের পুনরায় অন্তর্ভুক্ত হতে নিজেদের পরিচয় ও ভোটার হওয়ার যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হচ্ছে। এ প্রক্রিয়া নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগ করেছেন অনেক ভোটার।

বিরোধী দলগুলোর দাবি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার ঘটনা ইতোমধ্যে কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনি ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের লাখ লাখ মানুষ ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে অভিযোগ তাদের।

তাদের আশঙ্কা, নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম এবং আপিল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা ভবিষ্যতের নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন বিরোধী নেতারা।

তবে বিজেপির বক্তব্য, নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা, সরকারের উন্নয়নমূলক উদ্যোগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নির্বাচনে দলটির সাফল্যের প্রধান কারণ।

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে করণীয় কী?

ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ভোটারের মৃত্যু হলে, একই ব্যক্তির নাম একাধিকবার তালিকাভুক্ত থাকলে, তিনি অন্য এলাকায় স্থায়ীভাবে চলে গেলে কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া না গেলে ভোটার তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়া যেতে পারে। তবে নাম বাদ দেওয়ার কারণ নথিভুক্ত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে কর্মকর্তাদের।

খসড়া ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করতে পারেন। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আপিলের সুযোগও রয়েছে। এমনকি চূড়ান্ত তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লেও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে ভোটার তালিকায় নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ ও জটিল হওয়ায় অনেক ভোটারের পক্ষে নিজেদের নাম পুনরায় তালিকাভুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ কার্যত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন বলে আশঙ্কা তাদের।

মোদির শাসনামলে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রায় ১২ বছরের শাসনামলে ভোটার তালিকা যাচাই নিয়ে চলমান বিতর্ক অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আগামী বছরের রাজ্য নির্বাচন সামনে রেখে বিষয়টি ক্ষমতাসীন বিজেপি ও বিরোধীদের মধ্যে সংঘাত আরও বাড়িয়ে তুলছে।

গত বছর এক বিরল সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার বিরোধী দলগুলোকে তাদের অভিযোগ হলফনামার মাধ্যমে জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে তাতেও বিতর্কের অবসান হয়নি।

এরই মধ্যে তরুণদের নেতৃত্বাধীন সিজেপি নতুন করে আন্দোলনে নেমেছে। গত জুলাইয়ে কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভের মুখে দেশটির শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করার দাবি করেছিল দলটি। এবার ভোটার তালিকা ইস্যুতে তাদের আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হয়, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে এ বিতর্ক নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা, নাগরিকদের ভোটাধিকার এবং নির্বাচনি ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আগামী নির্বাচনগুলোতে এর রাজনৈতিক প্রভাব কতটা পড়ে, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।