ফ্যাসিবাদের দোসর সিন্ডিকেট কর্মকর্তারা এখনো দাপটে
পানির নিচে প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট পাউবো ও হাওর বোর্ডের
ফ্যাসিবাদী সরকার পতনের দীর্ঘ সময় পার হলেও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) চিত্র এখনও বদলায়নি। একই অবস্থা হাওর ও জল উন্নয়ন বোর্ডের। বিগত ১৭ বছরে নদীর ড্রেজিং, বাঁধ রাস্তা ও হাওরের উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করলেও পানির নিচে এর হিসাব কেউ নিতে পারছে না। দেশের পূর্বাঞ্চলে হাওর বেষ্টিত ৩৫ উন্নয়ন এখন কৃষকের কান্নায় পরিণত হয়েছে। অতিবৃষ্টি, অকাল বন্যা ও জলাবদ্ধতায় কৃষকের বছরের একমাত্র ফসল পানিতে তলিয়ে গেলেও পানি নিষ্কাশনে পাশে নেই পানি উন্নয়ন বোর্ড ও হাওর উন্নয়ন বোর্ড। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর গুরুতর অভিযোগ।
বরং অভিযোগ রয়েছে, বোর্ডের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গেড়ে বসা ‘ফ্যাসিবাদের দোসররা’ নিজেদের খোলস বদলে নতুন সরকারের সাথেও সখ্যতা তৈরি করে দাপটের সাথে টিকে আছে। বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ সব পদ এখনো ওই সিন্ডিকেটের দখলে থাকায় স্থবির হয়ে পড়েছে প্রশাসনিক সংস্কার প্রক্রিয়া।
আরও পড়ুন: চীন সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
পরিকল্পনা দপ্তরে সিন্ডিকেটের ‘লক-ইন’: বাপাউবোর পরিকল্পনা দপ্তর এখন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ‘কব্জাখানায়’ পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বোর্ডের মহাপরিচালকসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে আঁতাত করে এই দপ্তরটি নিয়ন্ত্রণ করছেন একটি শক্তিশালী চক্র।
ড. রবিন কুমার বিশ্বাস দীর্ঘ সময় ধরে পাউবোর পরিকল্পনা দপ্তরে থাকা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দেশের স্বার্থবিরোধী প্রকল্প প্রণয়ন এবং ভারতের স্বার্থরক্ষার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। চাকরির শুরু থেকেই পরিকল্পনা দপ্তরে বহাল থাকা রবিন ১৫-১৬ বার বিদেশ ভ্রমণ করলেও নথিতে তার সঠিক হিসাব নেই। অভিযোগ রয়েছে, তার সিন্ডিকেটের ‘গ্রিন সিগনালে’ গুরুত্বপূর্ণ জনবান্ধব প্রকল্পগুলো বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নেওয়া হয়। পাউবোতে প্রকল্প প্রণয়ন নিয়ে নানা ধরনের বিতর্কিত কাজের সাথে জড়িত ড. শ্যামল চন্দ্র দাসের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন ড. রবিন কুমার বিশ্বাস। পাউবোর প্রধান প্রকৌশলী (পুর) পরিকল্পনা অধিদপ্তরের দায়িত্ব থেকে অবসর নেওয়ার পর শ্যামল চন্দ্রের স্থলাভিষিক্ত করা হয় ড. রবিনকে। গুরু-শিষ্য এই দুজনে মিলেমিশেই ভারতের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করতেন। অভিযোগ রয়েছে, ভারতের স্বার্থহানি হয় এমন কোনো প্রকল্প তাদের হাত দিয়ে আলোর মুখ দেখেনি।
আরও পড়ুন: শিল্প পুনরুজ্জীবন, বাজার স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত মজুদ বাড়াবে সরকার: বাণিজ্যমন্ত্রী
অন্ধকারে ‘নর্থ-সাউথ ইরিগেশন প্রজেক্ট’: কুড়িগ্রামে নর্থ ও সাউথ ইরিগেশন প্রজেক্ট ৩ বার স্টাডি করা হয়। এই প্রজেক্টের পিডি ছিলেন রবিন কুমার বিশ্বাস। ২০০৭-২০০৮, ২০১২-২০১৩ এবং ২০২১-২০২২ সালে তিন দফা স্টাডির নামে সরকারের ১৫ কোটি টাকার উপরে ব্যয় হয়েছে। কিন্তু সুফল আসেনি। কানাঘুষা রয়েছে, সার্ফেস ওয়াটার (নদীর পানি) ব্যবহার করে এই ইরিগেশন প্রজেক্টটি এই কারণে আলোর মুখ দেখেনি যে, এটি বাস্তবায়ন হলে ভারতের অসুবিধা হবে।
নর্থ রাজশাহী ইরিগেশন প্রকল্প: একইভাবে আলোর মুখ দেখেনি নর্থ রাজশাহী ইরিগেশন প্রকল্প। ২০০৮-২০০৯ এবং ২০১৩-২০১৪ সালে এই প্রকল্পের সমীক্ষা কাজ সম্পন্ন করা হয়। এই প্রকল্পেরও পিডি ছিলেন রবিন কুমার বিশ্বাস। তিনি প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ২০ হাজার কোটি টাকা দেখিয়ে এটি সরকারের জন্য অলাভজনক বলে জানিয়ে দেন। এতে করে প্রকল্পটি হিসাবের খাতায় চলে যায়। ফাইলবন্দি হয়ে যাওয়া এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে দেশের কৃষি নির্ভর অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখতে পারতো।
যেভাবে অন্তরালে থেকে সামনের সারিতে ঠাঁই নেয় ‘রবিন’: ড. রবিন কুমার বিশ্বাস একজন ‘ইসকন’ অনুসারী। মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড—সর্বক্ষেত্রে তার প্রভাব রয়েছে। তদুপরি ড. শ্যামল চন্দ্র দাস নিজেই চাচ্ছেন তার স্থলে ড. রবিন কুমার বিশ্বাসকে নিয়োগ দেওয়া হোক। এজন্য শ্রী শ্যামলের পক্ষ থেকে সব ধরনের তদবিরই করা হয়।
জানা যায়, পাউবো (পুর) পরিকল্পনা অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী কে হবেন তা নিয়ে প্রথম দফায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে যে তিনজনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল সেখানে ড. রবিন কুমারের নাম ছিল না। সেখানে নাম ছিল—মি. অভিজিত, ফারজানা আহমেদ ও রাশেদুল কবির। ২০২৪ সালে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় মি. অভিজিতকে এই দপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দেয়। এই নিয়োগ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন ড. শ্যামল চন্দ্র দাস। পাউবোর এই দপ্তরের উপর তার যথেষ্ট প্রভাবও রয়েছে। তিনি ১৮ বছর বিভিন্ন পদে এই পরিকল্পনা দপ্তরে দায়িত্বে ছিলেন।
তার প্রভাবের কারণেই অভিজিতের অর্ডার বাতিল করে পরবর্তীতে ড. রবিনকে পাউবো (পুর) পরিকল্পনা অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
‘ম্যানেজ মাস্টার’দের দৌরাত্ম্য ও প্রমোশন বাণিজ্য: বাপাউবোতে যারা বিগত সরকারের আমলে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের আস্থাভাজন ছিলেন, তারাই এখন নতুন সরকারের প্রিয়ভাজন হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। এদের মধ্যে সবিবুর রহমানের মতো বিতর্কিত কর্মকর্তারাও রয়েছেন।
টিএম রাশেদুল কবির রানা বিশ্বব্যাংক ফান্ডের প্রকল্পে অনিয়মের দায়ে অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ হয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন।
অন্যান্য বিতর্কিত কর্মকর্তা প্রবীর কুমার গোস্বামী, পার্থ প্রতিম সাহার মতো বিতর্কিত কর্মকর্তারাও বিভিন্ন কৌশলে নিজেদের পদ রক্ষা করে চলেছেন।
মোঃ সবিবুর রহমান পাউবো’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তিনি পটুয়াখালী সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় এবং সাতক্ষীরা, সুনামগঞ্জ ও বাগেরহাটে প্রকল্প পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকাকালীন ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিলেন। যার মধ্যে রয়েছে—সাতক্ষীরায় প্রকল্পের অনিয়ম। সাতক্ষীরার কুলতিয়া খালে স্লুইচগেট নির্মাণ প্রকল্পের পিডি থাকাকালীন তিনি কাজের অনিয়ম ও নকশাবহির্ভূত কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ঠিকাদারদের অনিয়ম জেনেও তিনি ব্যবস্থা নেননি।
সাইট পরিদর্শন না করা: ৪৭৫ কোটি টাকার প্রকল্পের পিডি থাকা সত্ত্বেও সবিবুর রহমান ও নির্বাহী প্রকৌশলী আশিকুর রহমান প্রকল্প পরিদর্শনে যাননি এবং কাজের তদারকি করেননি। ওই সময় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছিল— ‘সাইট অর্ডার বুক অথবা অন্য কোনো ডকুমেন্ট থেকে ১৩ মে ২০২৪ তারিখের পূর্বে বর্ণিত সাইটে জনাব মোঃ সবিবুর রহমান, প্রকল্প পরিচালক এর পরিদর্শনের কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য যে, তিনি ২১ ডিসেম্বর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। এটি তার বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতিবাজদের সাথে যোগসাজশ আছে বলে প্রতীয়মান হয়।’
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ: দক্ষিণাঞ্চলের পাউবো’র বিভিন্ন কার্যক্রমে দুর্নীতির মাধ্যমে শত কোটি টাকা আত্মসাতের যে গুঞ্জন রয়েছে, তাতে সবিবুর রহমানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও প্রকল্প কাজের প্যাকেজ ঘুষ হিসেবে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সুনামগঞ্জে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম: অতীতে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালীন হাওরের বাঁধ নির্মাণে পিআইসি গঠন ও কাজের বিলম্বের অভিযোগ ছিল। জরিপের নথিপত্রে দেখা যায়, ‘মাটির কাজে যেখানে খরচ হওয়ার কথা ২ লাখ ৯ হাজার টাকা, সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।’ ওই ঘটনায় তাকে শাস্তি না দিয়ে তৎকালীন পানি সম্পদ মন্ত্রী তাকে রক্ষা করেন।
মূলত সবিবুর রহমান ছিলেন আওয়ামী সরকারের পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুকের অঘোষিত ক্যাশিয়ার। এই দুর্নীতিবাজ পাউবো নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পুরোটা কাজে লাগান। আওয়ামী লীগের শেষ ৫ বছরে সবিবুর শতকোটি টাকা কামিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে পদোন্নতি পেয়ে হন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী।
জাতীয়তাবাদী কর্মীদের হতাশা ও উদ্বেগের কারণ: বাপাউবোতে এখন একটি অদ্ভুত বাস্তবতায় দিন কাটাচ্ছেন বিএনপিপন্থী বা জাতীয়তাবাদী আদর্শের কর্মীরা। ১৭ বছর ধরে বঞ্চিত এই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, সিবিএ’র একাংশ এবং বর্তমান প্রশাসনের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে বিতর্কিত প্রকৌশলীদের আর্থিক লেনদেনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এতে একদিকে যেমন যোগ্য ও বঞ্চিতরা পদোন্নতি পাচ্ছেন না, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের আমলে লুটপাটকারীরাই এখন সরকারের নীতিনির্ধারণী সভায় উপস্থিত থেকে সরকারের ক্ষতি করার সুযোগ পাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোঃ এনায়েত উল্লাহ বলেন, দীর্ঘদিন পাউবোতে কোনো রদবদল হয়নি। তবে আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর বড় ধরনের রদবদল করেছি। পদোন্নতি দিয়েছি। যতটুকু সমস্যা আছে—আশা করি সেটুকুও শেষ করতে পারবো।
এদিকে হাওর জেলা ভূমি উন্নয়ন বোর্ডের বেহাল দশা। খোঁজ নিয়ে জানা যায় রাজধানীর পান্থপথে সুরম্য অফিস ব্যবস্থাপনা, গাড়ি-বাড়ি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রকল্পের টাকা ভোগ করে চললেও মাঠ পর্যায়ে কাজের গতি একেবারেই শূন্য।





